চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২২

২৬ অক্টোবর, ২০২২ | ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

জঙ্গি ‘আতুড়ঘর’ নাইক্ষ্যংছড়ি!

দেশের সীমান্ত উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি। পাহাড়ি এ জনপদকে নিরাপদ হিসাবে বেছে নিয়েছে জঙ্গিরা। জঙ্গি ইস্যুতে নয় বছরের মাথায় ফের আলোচনায় নাইক্ষ্যংছড়ি। ২০১৩ সালে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীতে জমি কিনে ‘আত্মঘাতী’ জঙ্গি সংগ্রহে আস্তানা গড়ে তোলেছিল জামায়াতুল মোজাহেদীন বাংলাদেশ ( জেএমবি)।

 

সপরিবারে ‘আত্মঘাতী’ হয়ে ঘর ছেড়েছিল তিন বন্ধু। নতুন জঙ্গি গ্রুপ জামায়াতুল আনসারও নিরাপদ এলাকা হিসাবে বেছে নিয়েছে নাইক্ষ্যংছড়িকে। জঙ্গিদের আতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ি। ২০১৬ সালের শেষের দিকে ‘আত্মঘাতী’ তিন দম্পতি ঘর ছেড়েছিল নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী থেকে। যাদের অনেকে ২০১৭ সালে সীতাকুণ্ড এবং সিলেটে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিল। তাদের তৈরি বোমা বিস্ফোরণে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ সিলেট আতিয়া মহলে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ও দুই পুলিশসহ সাতজন নিহত হয়েছিল।

র‌্যাবের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক খন্দকার আল মঈন জানান, জামায়াতুল আনসারের উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষণের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক শামীম মাহফুজ ও কুমিল্লার হাবিবুল্লার যাতায়াত ছিল নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়িতে। জঙ্গি সম্পৃক্ততায় জড়িত থাকার অভিযোগ ইয়াছিন নামে একযুবককেও খুঁজছেন বলে জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

 

যেভাবে শেকড় গাড়ে জেএমবি : ২০১৩ সালে নাইক্ষংছড়ির বাইশারীতে জমি কিনে ঘর তৈরি করে জঙ্গি আস্তানা গড়েন মাহবুব খোকন। বর্তমানে কারাবন্দী মাহবুব সেখানে বসেই ‘আত্মঘাতী’ সদস্য সংগ্রহের কাজ করতেন। কাপড় বিক্রেতার ছদ্মবেশে থাকা খোকনের হাত ধরে জঙ্গি গ্রুপে যোগ দেয় বাইশারীর জহিরুল ও তার স্ত্রী রাজিয়া, জহিরের বোন জোবাইদা ও তার স্বামী কামাল, ছোট বোন মনজিআরা ও একই গ্রামের হাসান। তারা প্রত্যেকে নিজেদের ‘আত্মঘাতী’ রূপে গড়ে তোলেন। মাহবুব বাইশারীর লোকজনের কাছে সেলিম নামেই পরিচিত ছিল।

 

২০১৭ সালের সিলেটের মৌলভীবাজারে জঙ্গি অভিযানে নিহত দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা মোশাররফ হোসেন ওরফে সোহেল রানা ছাড়াও জেএমবির কমান্ডার ফারদিনের (বগুড়ায় বোমা তৈরি করতে গিয়ে নিহত) নিয়মিত যাতায়াত ছিল বাইশারীর এই আস্তানায়। ২০১৪ সালে অপহরণকারীদের হাত থেকে জঙ্গি নেতা ফারদিনও মাহবুবকে উদ্ধার করেছিলো রামু থানা পুলিশ। জঙ্গি গ্রুপের মাস্টারমাইন্ড মাহবুব মাঝিরঘাটের খুনসহ ডাকাতির ঘটনায় ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর গ্রেপ্তার হলেও তাকে চিনতে পারেনি পুলিশ। পরবর্তীতে দেড় বছরের মাথায় মাহবুবের সহযোগী জঙ্গি সদস্যরাই সীতাকুণ্ড ও সিলেটে বিপুল পরিমাণ বোমা মজুদ করেছিলো ভয়ঙ্কার নাশকতার ঘটাতে। ‘আত্মঘাতী’ জঙ্গি সদস্য সংগ্রহকারী মাহবুবুর রহমান খোকন কর্ণফুলী থানার ইছানগর গ্রামের আবদুল গণির ছেলে।

 

২০১৫ সালে নগরীর মাঝিরঘাট সাহা কর্পোরেশনের ম্যানেজার সাহা বাবুকে গুলি করে হত্যা করে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যাবার সময় শরীরে থাকা হাত বোমা বিস্ফোরণে মারা যায় খোকনের ছোটভাই রফিক। একই ঘটনায় রবিউল নামে একজন জেএমবি সদস্যও মারা যায়।
আত্মঘাতী জঙ্গি দম্পতি ছিল ওরা : হাসান-জহির-কামাল ওরা তিনজনই দীর্ঘদিনের বন্ধু। কারো বয়স পঁচিশ বছরের বেশি নয়। তিনজনেই সপরিবারে ‘আত্মঘাতী’ ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনের সদস্য ছিলো। বাইশারী বাজারে পানের দোকানের আড়ালে চলতো ওদের জঙ্গি কার্যক্রমের শলাপরার্শ।

 

বাইশারী শাহনুর দাখিল মাদ্রাসায় কেউ তৃতীয় আবার কেউবা চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর আর লেখাপড়া করেনি। ২০১৭ সালে এদের কেউ দেড় বছর আবার কেউ সাত আটমাস ধরে সপরিবারের নিখোঁজ ছিল। কিন্তু ওরা সপরিবারে ‘আত্মঘাতী’ ভয়ংকর জঙ্গি দম্পতি ছিলো তা জানা ছিলোনা কারো। এদের মধ্যে জঙ্গি কামাল ও হাসান বিয়ে করেছে একই পরিবারের দুই বোন জোবাইরা ও মনজি আরাকে। ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ সীতাকুণ্ডে গ্রেপ্তার হবার পর জহির নিজেকে ‘জসিম’ এবং স্ত্রী রাজিয়া সুলতানাকে ‘আরজিনা বেগম’ বলে পরিচয় দেন।

 

সীতাকুণ্ডের ‘সাধন কুটির’ থেকে সেই সময় গ্রেপ্তার হন জহিরুল হক ওরফে জসিম (২৪) ও তার স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা ও আরজিনা বেগম। সীতাকুণ্ডের ছায়ানীড় নামের ভবনে ‘আত্মঘাতী’ বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় জহিরের বোন জোবাইরা ইয়াসমিন (১৯) বোনের স্বামী কামাল হোসেন (২৫) ও তাদের ছয়/সাতমাস বয়সী শিশু সন্তান। একই আস্তানায় কামালের দ্ইু সহযোগীও ‘আত্মঘাতী’ বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়। যারা ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ হয়েছিলো ২০১৬ সালে। কুমিল্লায় চান্দিনায় পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় জহিরের বন্ধু ছোট বোন মনজি আরা বেগমের স্বামী হাসান ও সহযোগী আজওয়াদ ইমতিয়াজ তালুকদার ওরফে অমি। একই এলাকার প্রেমতলা বাজারের আস্তানায় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে কামাল ও জোবাইরা দম্পতি। এদের মধ্যে অমি ছাড়া বাকী সকলের বাড়ি বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের উত্তর বাইশারী যৌথখামার পুনর্বাসন পাড়ায়।

 

২০১৭ সালের ২৩ মার্চ সিলেটের শিববাড়ির আতিয়ামহলে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নামে জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালিয়েছিল সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আতিয়া মহলের অদূরে মাদ্রাসার সামনে প্রথমে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। পরবর্তী সময়ে তাদের রেখে যাওয়া হলুদ রঙের একটি ব্যাগ জব্দ করতে গেলে ফের গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। এতে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, দুই পুলিশ পরিদর্শকসহ সাতজন নিহত হয়। আহত হন আরও অন্তত ৫০ জন। ২০১৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। প্রতিবেদনে জহিরুল হক, তার স্ত্রী আরজিনা ও প্রতিবেশী হাসানকে অভিযুক্ত করা হয়। মোশাররফ ওরফে সোহেল রানা ২০১৭ সালের সিলেটের মৌলভীবাজারে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে মারা যায়।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট