চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

১ অক্টোবর, ২০২২ | ১২:৪২ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুরক্ষা-সম্মান ‘পাচ্ছেন না’ প্রবীণরা

স্বামী আব্দুল লতিফ যখন মৃত্যুবরণ করেন- কিশোরী লায়লা বেগমের কোলে তখন দুই সন্তান। স্বজনরা নতুন সংসার করার তাগিদ দিলেও সেদিকে মন দেননি তিনি। সন্তানদের আঁকড়ে ধরে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েন। সংগ্রামের অনেক পথ পাড়ি দেওয়া লায়লার দুই সন্তানই এখন প্রতিষ্ঠিত। বিয়ে করে সংসারও করছেন তারা। তবে সেখানে ‘ঠাঁই হয়নি’ বৃদ্ধা লায়লা বেগমের। গ্রামে নিঃসঙ্গ জীবনই কাটাচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধা।

 

অক্সিজেন থেকে দুই নম্বর গেট সড়কে রিকশা চালান বদরুদ্দিন। অভাব-অনটনের সংসারে সন্তানদের বোঝা হয়ে থাকার পক্ষে নন সত্তরোর্ধ্ব এই প্রবীণ। তাই যতদিন শরীরে কুলায়, কাজ করেই চলছেন তিনি। দুই সন্তানের বাবা বদরুদ্দিনের ভাষ্য- ছেলেরা যে আয়-রোজগার করে তা দিয়ে ওদেরই চলতে কষ্ট হয়। আমরা বুড়ো-বুড়ি তাদের ওপর ভর করতে চাই না। এখনও তো পারছি। তাই শুধু শুধু ঘরে বসে না থেকে কাজ করছি।

 

শুধু লায়লা বা বদরুদ্দিন নন- তাদের মতো অনেক প্রবীণের যে সময়ে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে খোশ গল্পে মেতে থাকার কথা, সন্তানদের যত্ন আর পরিচর্যায় থাকার কথা- সেই সময় তারা অতিবাহিত করছেন নিঃসঙ্গতায়, সংসারের ঘানি টেনে। কেউ কেউ জীবনের ‘শেষ সময়গুলো’ কাটাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে। আনাদর আর অবহেলা সহ্য করতে না পেরে অভিমানে অত্মাহত্যা করছেন এমন প্রবীণের সংখ্যাও একেবারে কম নয়।

 

শিক্ষাবিদ হাসিনা জাকারিয়া প্রবীণদের এই দুরবস্থার জন্য যৌথ পরিবারের ভাঙন, নারী কর্মজীবীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধের অভাবকে দায়ী মনে করছেন। তিনি মনে করেন, সবার আগে পরিবার। কাজ এবং পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। আজ যারা নবীন, তাদেরও কিন্তু একদিন প্রবীণ হতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক কাজকে প্রাধান্য না দিয়ে পরিবারকেও প্রাধান্য দিতে হবে।

 

প্রবীণদের সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন মনে করেন হাসিনা জাকারিয়া। তার পরামর্শ- দেশে গড় আয়ু বাড়ছে। সামনে প্রবীণদের সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রবীণদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার চালু করা যেতে পারে। তাদের অর্থনৈতিক এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া দরকার। তবেই প্রবীণরা ভালো থাকবে।

 

পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করা পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ মহিউদ্দিন আহমেদের ভাষ্য- বাংলাদেশে এখনও প্রবীণদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা নেই। উন্নত বিশ্বে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বাসে-ট্রেনে বিশেষ ছাড় আছে। তারা সব জায়গায় বিশেষ সম্মান পান। কিন্তু আমাদের দেশে এসব নেই। কিছু অর্থনৈতিক সহায়তা মিললেও সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। প্রবীণদের সুরক্ষায় কেবল নীতিমালা নয়, তার প্রয়োগও জরুরি।

 

দেশে এখন প্রবীণদের সংখ্যা দেড় কোটি। যা মোট জনসংখ্যার ৯.২৫ শতাংশ। প্রবীণদের সুরক্ষায় ২০১৪ এর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ এর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এতে প্রবীণদের সম্মান প্রদানের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ১১টি করণীয় নির্ধারণ করা হয়। তবে এর মধ্যে প্রবীণ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান ছাড়া আর কোনো উদ্যোগই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি।

 

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. ফরিদুল আলম জানান, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় যেসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে- তা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। বাসে, ট্রেনে প্রবীণদের জন্য আলাদা কোটা এবং সুবিধা দিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। প্রবীণদের আনন্দময় জীবন নিশ্চিতে ‘সুখনিবাস’ পরিচালনা করা হচ্ছে। সবাই এগিয়ে এলে আমাদের অগ্রজরা আরও ভালো থাকবেন।

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট