চট্টগ্রাম সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ১০:১৮ অপরাহ্ণ

কাউখালী সংবাদদাতা

সাফ বিজয়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচ বীর কন্যার রাজকীয় সংবর্ধনা

চট্টগ্রামের সংবর্ধনা শেষে বীরের বেশে গত বুধবার রাতে বাড়ি ফিরেছেন সাফ বিজয়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচ বীর কন্যা। রাত গভীর হওয়ায় খাগড়াছড়ি জেলার বীর কন্যারা তাদের নিজ বাড়িতে ফিরতে না পারলেও বুধবার গভীর রাতে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়ার মঘাছড়ি এলাকায় ঋতু পর্না চাকমার বাড়িতে সংবর্ধনা জানিয়েছেন স্থানীয় সর্বস্তরের জনসাধারণ। বিদ্যুতের আলো না থাকায় স্থানীয়রা মশাল জ্বালিয়ে রাতে তাদের বরণ করেছেন। সাফ বিজয়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচ বীর কন্যার আগমণকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় উৎসবের নগরিতে পরিণত হয়।

 

বুধবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে মঘাছড়ি এলাকায় এসে পৌঁছলে সেখানে পূর্বে থেকে অপেক্ষায় থাকা স্থানীয় সর্বস্তরের জনসাধারণ তাদেরকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে। পরে রাতে সকল খেলোয়ারদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে ঋতু পর্নার বাড়িতে। রাতে মেটো পথে কেউ বাঁশ কেটে মশাল বানিয়েছে, কেউ মেঠো পথের দুই পাশে আড়াই হাত পর পর মশাল পুঁতেছে। এভাবে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অতিথিদের জন্য প্যান্ডেল বানানো, চেয়ার-টেবিল নিয়ে আসা, খাবারের আয়োজনের দায়িত্বে ছিল আরেক দল। আর এত সব আয়োজন দেশ মাতিয়ে তোলা সাফজয়ী ফুটবলকন্যাদের মধ্যে পাহাড়ের পাঁচ মেয়ে ও তাঁদের দুই কৃতী শিক্ষককে ঘিরে।

 

কাউখালী উপজেলার ঘাগড়ার মঘাছড়ি এলাকা থেকে জাতীয় দলের ফুটবলার ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়ি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। সেখানে যেতে পাকা রাস্তা দূরের কথা, ভালোভাবে চলাচলের মতো কাঁচা রাস্তা ও নেই। ফসলি জমির মাঝে হাতখানেক চওড়া আইলই ভরসা। দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথজুড়েই ছিল আলোর মশাল। এ জন্য ৩০ লিটার কেরোসিন ও পাটের দড়ি কেনা হয়েছিল। বীর সেন চাকমা সবই করেছেন গাঁটের পয়সা খরচ করে। শিষ্যরা এত বড় সাফল্য নিয়ে বাড়ি ফিরছে বলে কথা!

 

সাফজয়ী পাঁচ পাহাড়ি কন্যার গাড়িটি মঘাছড়িতে পৌঁছামাত্রই করতালিতে তাঁদের স্বাগত জানায় এলাকাবাসী। রুপনা, ঋতুপর্ণা, মনিকা, আনাই, আনুচিংকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান তাঁদের শিক্ষাগুরু বীর সেন চাকমা। পরে সেই মেঠো পথ ধরে এই ফুটবলকন্যারা গেছেন সতীর্থ ঋতুপর্ণার বাড়িতে। ফুটবলাররা গুটি গুটি পায়ে এগিয়েছেন, আর সামনে থেকে একের পর এক মশাল জ্বলে উঠেছে! সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরার পর অনেকেই সংবর্ধনা দিয়েছে ফুটবলার মেয়েদের। কিন্তু ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখে চমকেই গেছেন সাফ বিজয়ী পাচ বীর কন্যারা।

ঋতুপর্ণা চাকমার কথায়ই তা স্পষ্ট, তিনি বলেছেন, ‘আমাদের আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। ভাবতেই পারিনি এলাকায় এভাবে বরণ করে নেয়া হবে আমাদের। সত্যিই ভীষণ চমকে গেছি। বীর সেন স্যার ও শান্তি মণি স্যারদের জন্যই আমরা এত দূর আসতে পেরেছি। ’

 

এই আয়োজনের উদ্যোক্তা বীর সেন চাকমা বললেন, ‘আজ আমাদের শূন্য ঘরে সুন্দর এলো। মেয়েদের ফুটবল খেলাকে অনেকে বাঁকা চোখে দেখত। সবাইকে বোঝাতে চেয়েছি, মেয়েরা বোঝা নয়। বরং ঠিকঠাক পরিচর্যা করতে পারলে ওরা ফুল হয়ে ফুটবে। এ রকম আলোকিত মানুষ যেদিকে যাবে আশপাশ আলোকিত হবে। তাই এমন উদ্যোগ। ’

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে মোটর শোভাযাত্রা করে রাঙ্গামাটি শহরে মারী স্টেডিয়ামে নেয়া হয় পাঁচ ফুটবলারকে। তাদের সাথে খোলা গাড়িতে ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও কাউখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অংসুই প্রু চৌধুরী। এখানে এই পাঁচজন এবং শিক্ষক বীর সেন চাকমা আর স্কুলের কোচ শান্তি মণি চাকমাকে সংবর্ধনা দেয় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন।

 

রাঙ্গামাটির মারি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সংবর্ধণা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। সংবর্ধণা সভায় বক্তব্য রাখেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান।

এসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমাসহ জেলা বিভিন্ন সেক্টরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সামাজিক, ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।

 

সংবর্ধনা সভায় রাঙ্গামাটি পার্বদ্য জেলা পরিষদ থেকে প্রতি খেলোয়ারকে ২ লক্ষ টাকা ও কোচদের ১ লক্ষ টাকা, সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদারের ব্যক্তিগত তহবীল থেকে প্রত্যেককে ৫০ হাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা ব্যক্তিগত তহবিল থেকে খেলোয়ারদেরকে ৫০ হাজার ও কোচদের ২৫ হাজার টাকা ক্রেস্টসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদান করা হয়।

এছাড়া রাঙ্গামাটি সদর জোন, বিজিবি সেক্টর, রাঙ্গামাটি পৌরসভা, ঘাগড়া সাব-জোন, ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে ক্রেস্ট আর্থিক সহায়তা, বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়।

 

এরআগে সাফ বিজয়ের পরের দিন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান রাঙ্গামাটি জেলার দু’জন খেলোয়ার ঋতুপর্না চাকমা ও রুপনা চাকমাকে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেড় লক্ষ টাকার চেক প্রদান করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত রুপনা চাকমার ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন।

এদিকে আজ বিকেলে রাঙ্গামাটির মারি স্টেডিয়ামে এ সংবর্ধণা সভায় কয়েক হাজার নারীর পুরুষের সমাগম ঘটে।

 

পূর্বকোণ/জসিম/মামুন/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট