চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২২

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ | ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

আগামী ৮ বছরে কর্ণফুলীতে দূষণ ছড়াবে দ্বিগুণ

কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে কর্ণফুলী নদীতে দূষণ ছড়াবে দ্বিগুণ। নগরীতে প্রতিদিন পয়ঃবর্জ্য প্রায় ৩০ কোটি লিটার। যা ২০৩০ সাল নাগাদ বেড়ে হবে ৫১ কোটি লিটার। এসব পয়ঃবর্জ্য, শিল্প বর্জ্য ও হাসপাতাল বর্জ্য মূলত খাল ও নালা হয়ে কর্ণফুলীসহ অন্যান্য নদীতে পড়ছে। এদিকে ভয়াবহ দূষণের শিকার কর্ণফুলী নদীর পানি ও মাছ। কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় এটি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। তাতে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের যৌথ গবেষণায় দূষণের এ চিত্র ফুটে ওঠেছে।

গবেষণায় কর্ণফুলী নদীর পানি ও মাছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের নির্ধারিত স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব দেখা গেছে। বিশেষ করে নদীর কর্ণফুলী সেতু, কালুরঘাট সেতু ও নেভাল এরিয়ার মাছের তুলনামূলক বেশি জীবাণু পাওয়া গেছে। এসব এলাকার পোপা, ফাইস্যা, বাটা, চিরিং, গলদা চিংড়ি, লাল পোপা, তেলি ফাইস্যা, বাইলা, চেওয়াসহ বিভিন্ন মাছের উপর পরীক্ষায় মাত্রাতিরিক্ত ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও জিঙ্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকার মাছের মধ্যে ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে ০.৬১৫ মিলিগ্রাম পার কেজি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.৫০০ মিলিগ্রাম পার কেজি। গবেষণায় ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে ৩.৮২৪ মিলিগ্রাম পার কেজি। অথচ এটির মানবদেহে সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ১.০০০ মিলিগ্রাম পার কেজি।

একই সাথে আয়রন পাওয়া গেছে ৪৩৮.০০৭ মিলিগ্রাম পার কেজি। যা মানুষের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৪৩.০০০ মিলিগ্রাম পার কেজি। ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া গেছে ২৭.৪০২ মিলিগ্রাম পার কেজি, এটির সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ২০.০০০ মিলিগ্রাম পার কেজি। জিঙ্ক পাওয়া গেছে ৭২.৪৯৩ মিলিগ্রাম পার কেজি। এটির সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৪০.০০০ মিলিগ্রাম পার কেজি। গবেষণায় চিরিং, বাটা, ফাইস্যা ও চিংড়িতে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া গেছে।

একই গবেষণায় কর্ণফুলীর পানিতেও ভয়াবহ দূষণের চিত্র ফুটে ওঠেছে। এ নদীর পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে ০.০৫০ মিলিগ্রাম পার লিটার। অথচ এটি মানুষের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.০১০ মিলিগ্রাম পার লিটার। পানিতে ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে সহনীয় মাত্রার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি ০.০০৫ মিলিগ্রাম পার লিটার। অথচ এটির সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.০০৩ মিলিগ্রাম পার লিটার। লেড পাওয়া গেছে ০.০৫০ মিলিগ্রাম পার লিটার। এটির সহনীয় মাত্রা ০.০১০ মিলিগ্রাম পার লিটার। আয়রন পাওয়া গেছে ১.০০০ মিলিগ্রাম পার লিটার, সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ০.৩০০ মিলিগ্রাম পার লিটার।

জানতে চাইলে গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘শহর ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলী নদীর দু’পাশে কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। গবেষণায় বর্জ্যে ক্ষতিকর প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেছে।’

নদী সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও ভাবনা তৈরি করতে আজ বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার দিবসটি উদযাপন করা হয়। এবারে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘আমাদের জনজীবনে নৌপথ’।

এদিকে ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজের ওপর চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রণীত মাস্টার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য নিঃসৃত হচ্ছে। এসব বর্জ্য সরাসরি নালা ও খাল হয়ে কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন নদীতে পড়ছে। দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। অথচ এ নদী ওয়াসার সুপেয় পানির প্রধান উৎস।

এছাড়া নগরীতে দৈনিক প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য হয়। এসব বর্জ্যরে একটি অংশও নদীতে গিয়ে পড়ছে। নগরীর তরল ও কঠিন বর্জ্য ছাড়াও নদীর দুই ধারের শিল্পকারখানার দূষিত কেমিক্যালও কর্ণফুলী গিয়ে পড়ে। এ কারণে ক্রমাগত দূষণের শিকার হচ্ছে এ নদী।

ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য নিঃসৃত হচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ বেড়ে হবে ৫১ কোটি লিটার। এসব পয়ঃবর্জ্য, শিল্প বর্জ্য ও হাসপাতাল বর্জ্য মূলত খাল ও নালা হয়ে কর্ণফুলীসহ অন্যান্য নদীতে পড়ছে। নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা না হলে নগরীর সুপেয় পানির উৎস কর্ণফুলী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার হবে। এতে চট্টগ্রামের পরিবেশ দূষণসহ নগরীর সুপেয় পানি সরবরাহে সংকট সৃষ্টি হবে। তবে এ সংকট নিরসনে ওয়াসা স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।’

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট