চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

২৭ আগস্ট, ২০২২ | ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

৬৮ হাজার একর জমি অনাবাদি

রাউজানের পূর্ব গুজরার আঁধারমানিক গ্রামের দক্ষিণের বিল। এক সময় ধান ও নানা ধরনের শস্য আবাদ হতো প্রায় ১৫ কানি আয়তনের এ বিলে। কিন্তু ৬-৭ বছর ধরে এ বিলে আর চাষাবাদ হচ্ছে না। আবাদ না হওয়ায় ধীরে ধীরে এ বিলের জমি এখন কচুরিপানা ও ঘাসে ভরে গেছে। চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শুধু রাউজানের গুজরার এ জমিটি নয়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় শত শত একর জমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেচের সংকট, সেচ-চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়া, বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, কৃষিজীবী মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়ে পড়া, কৃষিকাজে নতুন প্রজন্মদের অনাগ্রহ ও একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ায় চাষাবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলে শিল্পায়নে ছোঁয়ার বড় প্রভাব পড়েছে কৃষিজমিতে। স্থায়ী পতিত ও অনাবাদি জমিসহ বিপুল পরিমাণ জমি কমে যাচ্ছে শিল্প-কারখানা স্থাপনে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় ফসলি জমির পরিমাণ তিন লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৭ হেক্টর। একমধ্যে চাষযোগ্য জমি দুই লাখ ৭ হাজার ২৯ হেক্টর। আর চাষযোগ্য পতিত জমি (অনাবাদি) ১৫ হাজার ২১৩ হেক্টর। স্থায়ী পতিত জমি ১৮ হাজার ১৩৩ হেক্টর। জমি ব্যবহারের ঘনত্ব ৪০ শতাংশ। কৃষি বিভাগের হিসাবে চাষযোগ্য ৬৮ হাজার দুই একর জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে না।

কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, প্রতিবছর ১ শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। ইটভাটা, কলকারখানা, ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ স্থাপন ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান পূর্বকোণকে বলেন, ‘চাষযোগ্য পতিত জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। তারা এক মৌসুমে চাষ করলে আরেক মৌসুমে করে না। আর আইন প্রয়োগ করে কৃষকদের বাধ্য করতে পারে না কৃষি বিভাগ। তাই, এ জন্য কঠোর আইন করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। জমিতে দীর্ঘদিন চাষ না করলে তা সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত করা উচিত বলে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি’।

সরেজমিন দেখা যায়, বোয়ালখালী উপজেলার কালুরঘাট সেতু, কর্ণফুলী নদী ও আরাকান সড়ক ঘিরে কৃষি জমিতে গড়ে ওঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প-কারকাখানা। একই অবস্থা দেখা যায়, কর্ণফুলী ও পটিয়া উপজেলায়ও। শাহ আমানত সেতু নির্মাণের পর থেকে এসব এলাকায় কৃষি জমিতে গড়ে ওঠেছে মিলকারখানা। একই দৃশ্য দেখা যায়, শস্যভাণ্ডারখ্যাত নগরীর সঙ্গে লাগোয়া উপজেলা সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী আর মিরসরাই উপজেলায়। এসব এলাকা দ্রুত কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই দশক থেকে গ্রামাঞ্চলে শিল্প-কারখানার দ্রুত প্রসার ঘটেছে। নদী-খাল ও বড় সড়কের আশপাশের আবাদি জমির ওপর গড়ে ওঠেছে এসব কারকানা। এছাড়াও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে কৃষি জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে বাড়ি-ঘর। শিল্পায়ন ও বাড়িঘর নির্মাণে খাল-বিল হারিয়ে যাচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। পরে এসব জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য ফেলা হয় নদী ও খাল-বিলে। এতে আশপাশের জমির উর্বরাশক্তি হ্রাস পায়। ফসল উৎপাদন কমে যায়। অপর দিকে চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এরফলে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কৃষকেরা। প্রায় ৪০ বছর চাষাবাদ ও সেচ পাম্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বোয়ালখালীর কুমকুম দাশ।

তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ-কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। খরচ পোষায় না। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে কৃষিজীবী মানুষ জীবন-জীবিকার খোঁজে শহরমুখী হয়ে পড়েছেন। এছাড়াও শিক্ষিত ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে কৃষিকাজে অনাগ্রহ রয়েছে। এসব কারণে কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে’। সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে উন্নতজাতের বীজ, কৃষি ভর্তুকি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা দিয়ে কৃষিজমির ক্ষেত্র বাড়ানো যাচ্ছে না।

রাউজান সংবাদদাতা জাহেদুল আলম জানান, রাউজানে ১৪ ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় চাষাবাদযোগ্য জমির বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি পড়ে রয়েছে। অথচ একসময়ে এসব জমিতে দু-তিন ফসলি ধান বা নানা ধরনের সবজির চাষাবাদ হতো।

চাষিরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাব, বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদে অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি অফিসের তথ্য, রাউজানে জমির পরিমাণ ১৩ হাজার ৮ হেক্টর। অনাবাদি জমির পরিমাণ ৭শ ৭৮ হেক্টর। বেশি জমি পতিত থাকে আউশ মৌসুমে। আউশ মৌসুমে এখানে তিন মাস কোন ধান চাষ হয় না ১১ হাজার ৮ শ ৮৭ হেক্টর জমিতে। বোরো মৌসুমে পতিত থাকে ৬ হাজার ৮৮ হেক্টর।

সরেজমিনে দেখা যায়, বছরজুড়ে সবচেয়ে বেশি অনাবাদি থাকে উপজেলার বিনাজুরী, পূর্বগুজরা, নোয়পাড়া, উরকিরচর, পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নে। এছাড়াও পৌরসভার ৯ ওয়ার্ড ও অন্যান্য ইউনিয়নেও জমি পতিত থাকে কমবেশি।

৩শ কানি জমিতে চাষ করেন পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের পিযুষ চৌধুরী বিশু। তিনি বলেন, ‘বোরো মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। উভলং ও লাম্বুর হাটে-দুটি স্লুইস গেট দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমেও বৃষ্টির পানি ও খালের পানির অভাবে অনেক কৃষক এবার আমন চাষ করতে পারেনি’।

কৃষক স্বপন চৌধুরী, জগদিশ বড়ুয়া, মানিক মল্লিক, মৃদুল চৌধুরী, বাবুল মল্লিক, শ্রীমতি বিশ্বাস, সুমন দে, শম্ভু মল্লিক, সুজন, জাহাঙ্গীর আলম, পিয়ু লাল দে’সহ বহু কৃষক বলেন, ‘কৃষি উপকরণ ও কৃষি মজুরিসহ চাষাবাদের খরচের সঙ্গে উৎপাদন হিসাব পোষাচ্ছে না। এসব কারণে বছর বছর ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক।’

কৃষি অফিসার ইমরান হোসেন বলেন, ‘কোথাও পানির অভাব, কোথাও পানি নিষ্কাশন না যাওয়ায় স্থায়ী পতিত জমি সৃষ্টি হচ্ছে’। তবে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়ানোর জন্য কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

পটিয়া সংবাদাদাতা মো. রবিউল আলম ছোটন জানান, পটিয়ার ছনহরা, আশিয়া, কাশিয়াইশ, জিরি, শোভনদণ্ডী, ধলঘাট, জঙ্গলখাইন ও কোলগাঁও ইউনিয়নে অনাবাদি পড়ে রয়েছে ৬শ হেক্টর জমি। জলাবদ্ধতা, সেচের পানির অভাব ও চাষের অনুপযোগী জমি হওয়ার কারণে প্রায় ৬শ হেক্টর জমি স্থায়ীভাবে অনাবাদি পড়ে রয়েছে।

পটিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, আবাদি জমির পরিমাণ ১৪ হাজার ১১৫ হেক্টর। এরমধ্যে ১০২১ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের পরিকল্পিত উদ্যোগে দুই বছর ধরে ৪৫০ হেক্টর জমি চাষাবাদ হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে কচু চাষ ও অন্যান্য জমিতে সবজি চাষ করা হচ্ছে।

পটিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কল্পনা রহমান পূর্বকোণকে জানান, ‘জলাবদ্ধতা, সেচের পানির অভাব ও চাষের অনুপযোগী ৬শ হেক্টর জমি স্থায়ীভাবে অনাবাদি পড়ে রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনতে আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ, মাঠ সমাবেশ, বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণ, এছাড়া প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি, অনাবাদি জমি চাষাবাদের আওতায় চলে আসবে।’

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট