চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৬ আগস্ট, ২০২২ | ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

এক বছরের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরলেন করোনাক্রান্ত পিংকি

রোজিনা আক্তার পিংকি। গেল বছরের আগস্টে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩০ বছর বয়সী এ নারী নগরী একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন । কিন্তু তার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তার পরিবার। ব্যয় সাশ্রয়ে একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর মুমূর্ষু পিংকিকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় পিংকির বেঁচে থাকার লড়াই।

সুসংবাদ হচ্ছে, বাঁচার আশা ছেড়ে দেওয়া পিংকি প্রায় এক বছর আইসিইউ-এইচডিইউতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চিকিৎসকরা বলেছেন, পিংকি হচ্ছে একমাত্র করোনা রোগী, যিনি এতো দীর্ঘসময় স্বাস্থ্যগত নানান জটিলতা মোকাবেলা করে সেরে ওঠেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে পিংকিকে বিদায় জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এসময় তাকে উপহারের পাশাপাশি একদিনের বেতনও প্রদান করে হাসপাতালের নার্সরা। আর অশ্রুসজল নয়নে পিংকিকে বিদায় জানায় সেবাদানকারী চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিদায়বেলায় এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের এইচডিইউ ওয়ার্ড।

চিকিসকরা জানিয়েছেন, হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ পর করোনা নেগেটিভ হয় পিংকি। কিন্তু তার ফুসফুসসহ শারীরিক নানান জটিলতা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে অক্সিজেনের মাত্রাও কমতে শুরু করে তার। যার কারণে তাকে আইসিইউ-এইচডিইউর মধ্যে রেখেই চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তার অক্সিজেনের মাত্রা এমনভাবে কমে যেত, কখনো কখনো বাইপেপ আবার কখনো সিপেপ কিংবা হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা মেশিন দিয়ে ৭০ লিটারের বেশি অক্সিজেন দিতে হয়েছে। এসবের মধ্যেই দেখা দেয় নিউমোনিয়া আর সেপটিসেমিয়া সমস্যা (ফুসফুস, কিডনি, খাদ্যনালী বা অন্য যে কোন অঙ্গের সংক্রমণ যখন রক্তে প্রবেশ করে)।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সাবেক সিনিয়র কনসালটেন্ট ও চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বর্তমান সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুর রব মাসুম বলেন, যেদিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, সেই দিনেই আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। যদিও সকল চিকিৎসক স্বাস্থ্য কর্মীদের চেষ্টার কমতি ছিল না। প্রায় এক বছর করোনার সঙ্গে লড়ে বেঁচে ফেরাটা অবশ্যই আমাদের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। কেননা আমরা যে দীর্ঘ সময় ধরে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করেছি, তারও এক অনন্য দৃষ্টান্ত এটি। জানামতে পিংকি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কোভিড আইসিইউ থেকে চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগী।

ডা. আবদুর রব মাসুম বলেন, দীর্ঘদিন রোগের সাথে যুদ্ধে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সে হারায় হাঁটা চলার ক্ষমতাও। অক্সিজেনের ওপর নির্ভর হয়ে যেতে হয়। দীর্ঘদিন তাকে প্রতি মিনিটে ৩০ লিটার, ২৫ লিটার করে অক্সিজেন নিতে হয়। এরমধ্যে কোভিড জটিলতায় তার ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে ব্রঞ্চিইকটাসিস (শ্বাসতন্ত্র রোগ) ও আইএলডি ( ফুসফুস রোগ) নামক একটি স্থায়ী জটিলতায় রূপ নিতে থাকে। ফুসফুস এবং চেস্টের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাকে দীর্ঘদিন ফিজিওথেরাপি দেওয়া শুরু করা হয়। পরবর্তীতে অক্সিজেনের চাহিদা কমতে শুরু করে। যা সর্বশেষ ৫ লিটারে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু পাঁচ লিটারের আসলেও তাকে অক্সিজেন বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছিল না। তাতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন পিংকি। এরপর শুরু হয় কাউন্সেলিং। আর তাতে ফিরে আসে আত্মবিশ্বাস ও সাহস।

জানা যায়, রোজিনা আক্তার পিংকির গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। তিনি তার পরিবার নিয়ে থাকেন নগরীর আগ্রাবাদের হাজী পাড়ায়। দীর্ঘ এক বছর হাসপাতালে থাকা মায়ের সেবায় ডাক্তার নার্সদের মতো সঙ্গী ছিলেন রোজিনার একমাত্র সন্তান ফাজুহা। ছোট্ট সন্তানটিও মাকে জুগিয়েছেন সাহস।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ওয়ার্ডের প্রধান ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, এখানে মূল ফাইটার ছিলেন পিংকি। তার ইচ্ছে শক্তি ও আকাক্সক্ষার কোন কমতি ছিল না। ধৈয্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, তাকে পুরোপুরি অক্সিজেন নির্ভর হয়ে যেতে হয়েছে। তবুও তিনি সবসময় বলতেন- আমার মেয়ে এবং পরিবারের জন্য আমাকের বাঁচতে হবে। তার এই ইচ্ছে শক্তিই তাকে সুস্থ করে তুলেছেন।

পরবর্তী করণীয় কী হবে জানতে চাইলে ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস আরও বলেন, পিংকির শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো। তবে মাঝেমধ্যে অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে। আমরা বলেছি, তাকে অবশ্যই নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকতে হবে। একই সঙ্গে যদি কোন ধরনের সমস্যা অনুভব করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই যেন চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা হয়। আশা করছি, তিনি সুস্থ থাকবেন।

এদিকে, দীর্ঘ প্রায় এক বছর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদানের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মানসিক ও আর্থিক সহস জুগিয়েছিলেন বাড়ি ফেরার সময় সেই চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলেননি পিংকি। আর পিংকিকে দীর্ঘ এক বছর নিজেদের হাসপাতালে পরিবারের সদস্যদের মতো করে চিকিৎসা প্রদান করা চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও তাকে বিদায় জানান আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। সঙ্গে প্রদান করেন উপহারও। নার্সরা পিংকি ও তার সন্তানের নিকট তুলে দেন তাদের একদিনের বেতনও। যা দেখে পুরোই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন পিংকি।

কান্না কণ্ঠে রোজিনা আক্তার পিংকি বলেন, ‘আলহামদুল্লিাহ, আমি অনেক সৌভাগ্যবান। আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দান করেছেন। তাছাড়া হাসপাতালে সকল চিকিৎসক-নার্স থেকে শুরু করে সবার অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। আমি বেঁচে ফিরবো, তা কখনই কল্পনা করিনি। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদার করছি। ’

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালেরর তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, পরিবারটি অস্বচ্ছল জানার পর হাসপাতালের পক্ষ থেকে ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচের বিষয়ে সহায়তা করা হয়। বিশেষ করে চিকিৎসক-নার্স ও রোগী কল্যাণ সমিতিও পিংকির পাশে এগিয়ে এসেছেন। তাকে কখনই আর্থিক কষ্টের বিষয়টি বুঝতে দেওয়া হয়নি। তবে সবচেয়ে ভালো লাগছে- পিংকি এক বছর লড়াই করে বেঁচে ফিরেছেন। অবশ্যই হাসপাতালের সকল চিকিৎসক ও নার্সদের কৃতজ্ঞতাও জানাতে হয়।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট