চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৪ আগস্ট, ২০২২ | ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

উচ্ছ্বসিত উত্তরের মানুষ

প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ নিয়ে উত্তর ফটিকছড়ির জনগণ বেশ উচ্ছ্বসিত। তবে উপজেলা সদর কোথায় হবে তা নিয়ে তাদের মাঝে কিছুটা দ্বিধা কাজ করছে। এই সমস্যা সমাধানে প্রতিটি ইউনিয়নে চলছে গণশুনানি। হারুয়ালছড়ি, ভূজপুর, নারায়ণহাট, দাঁতমারা এবং বাগানবাজার ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ৪৯৬ তম উপজেলা। সবাই নিজ নিজ ইউনিয়নে উপজেলা সদর চাইলেও সচেতন মহলের অভিমত, সব ইউনিয়নের মানুষ সমানভাবে সুবিধা পাওয়ার মতো স্থানেই তা হওয়া উচিত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯১৮ সালে সৃষ্ট ফটিকছড়ি থানাকে ১৯৮৩ সালে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। ২০০৭ সালের ২১ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশের তৎকালীন আই জি নূর মোহাম্মদ ফটিকছড়ি থানার মধ্যে নতুন ভূজপুর থানার উদ্বোধন করেন। ফটিকছড়ি উপজেলায় ২টি থানা, ২টি পৌরসভা, ১৯টি ইউনিয়ন রয়েছে। ৭৭৩.৫৪ বর্গ কিলোমিটারের ফটিকছড়ি উপজেলার মধ্যে উত্তরের পাঁচ ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৪১৫ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাগানবাজার হল সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। যার আয়তন ১৯১.২২ বর্গকিলোমিটার। দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউনিয়ন নারায়ণহাটের আয়তন ৫৯.৯০ বর্গ কিলোমিটার। হারুয়ালছড়ির আয়তন ৫৯.৭৮ বর্গ কিলোমিটার। ভূজপুরের আয়তন ৫৩.৮৭ বর্গ কিলোমিটার এবং দাঁতমারার আয়তন ৫০.০৫ বর্গ কিলোমিটার।

বৃহৎ এই উপজেলার উন্নয়নে সুষম বন্টন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য আলহাজ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী পাঁচ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়ে মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেন। তারই আলোকে ফটিকছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সায়েদুল আরেফিনের আমলেই নতুন উপজেলা গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়।

উন্নয়ন বঞ্চনার ক্ষোভ উত্তরের মানুষের সবসময় ছিল। নতুন প্রস্তাবিত উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে গণশুনানিগুলো হয়ে উঠেছে তাদের ক্ষোভের প্রকাশ মঞ্চ হিসেবে। সম্প্রতি ভূজপুর এবং নারায়নহাট ইউনিয়নে শুনানি হয়েছে। দুই ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। তারা ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠনের বিষয়ে জোরালো বক্তব্য রাখেন।

বক্তারা ফটিকছড়ি উত্তরে মানুষের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে বলেন, তারা আজীবন ভোট দিয়েছেন। তার সুফল পাননি। ফটিকছড়ি সদর হাসপাতাল করা হয়েছে হাটহাজারীর কাছে। এই হাসপাতালের সেবা পান মূলত হাটহাজারীর মানুষ। ৯০ এর দশকের আগে উত্তরে কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে পরবর্তীতে কিছু স্কুল কলেজ গড়ে উঠলেও তা পর্যাপ্ত নয়। যে কারণে উত্তরে শিক্ষার হার অনেক কম। এখানে নেই কোন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজ। তার উপর রয়েছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।

জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির রহমান সানি পূর্বকোণকে বলেন, নতুন উপজেলা গঠনের বিষয়টি তিনি ফটিকছড়িতে যোগদানের আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। ওই সময় এবিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদন পাঠানোর পর মন্ত্রণালয় থেকে দুটি পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গনশুনানি। কিন্তু করোনাকালে শুনানি করা যায়নি। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর করোনা পরিস্থিতি ভাল হলে শুনানির নোটিশ দেন। প্রথমে ভূজপুরে শুনানি হয়। বাকি ইউনিয়নগুলোও শুনানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করায় তাদেরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। নারায়ণহাট ইউনিয়নের শুনানি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ইউনিয়নেও শুনানি হবে। সব ইউনিয়নের শুনানিশেষে প্রতিবেদন তৈরি করে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠাবেন। সেখান থেকে তা মন্ত্রণালয়ে যাবে। নতুন উপজেলা গঠনের জন্য মন্ত্রণালয়ে ৭ সদস্যের একটি সচিব কমিটি আছে। উপজেলা সদর কোথায় হবে তা ওই কমিটিই নির্ধারণ করবেন ।

নারায়ণহাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবু জাফর মাহমুদ পূর্বকোণকে বলেন, আয়তনের দিক দিয়ে ফটিকছড়ি দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা। স্বাধীনতার পরেই ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা হওয়া উচিত ছিল। উত্তরের তিন ইউনিয়ন নারায়ণহাট, দাঁতমারা এবং বাগান বাজারের আয়তন বাকি ফটিকছড়ির সমান। যেসব ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা হচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে নারায়ণহাট। ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক অবস্থানগতভাবে নারায়ণহাট একটি সমৃদ্ধ জায়গা। সবদিক বিবেচনা করে নারায়ণহাটেই উপজেলা সদর হওয়া উচিত।

বাগান বাজার উপজেলা চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সাজু পূর্বকোণকে বলেন, আগামী ২০ সেপ্টেম্বর তার ইউনিয়নের শুনানি। ১৯১.২২ বর্গকিলোমিটারের এই ইউনিয়নের আয়তন দেশের অনেক ছোট উপজেলার কাছাকাছি। উপজেলা সদর তার ইউনিয়নেই হোক এমন দাবি করে তিনি বলেন, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্যই তারা আলাদা উপজেলা চান। ফটিকছড়ি উত্তর খুবই অবহেলিত একটি জনপদ। নতুন উপজেলা গঠনের মাধ্যমে উন্নয়নের সুষম বন্টন হবে।

হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। ফটিকছড়ি দক্ষিণ নানাভাবে এগিয়ে। আয়তনের দিক দিয়েও ভূজপুর থানা ফটিকছড়ি থানার চেয়ে অনেক বড় উল্লেখ করে বলেন, ফটিকছড়ি থানার চেয়ে ভূজপুর থানায় জনসংখ্যা বেশি। সরকার ছোট উপজেলায় যে বরাদ্দ দেয়, বড় উপজেলাও একই বরাদ্দ পায়। একারণে উত্তরের জনপদ অবহেলিত থেকে গেছে। একটি উপজেলা সদর হওয়ার জন্য কিছু শর্ত থাকে। জায়গাটি উঁচু হতে হবে। আশপাশে স্কুল, কলেজ থাকতে হবে। থানার কাছে থাকতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও আছে। থানার বাইরে গিয়ে উপজেলা করার সুযোগ থাকে না। সেই যুক্তিতে ভূজপুরে উপজেলা সদর করার দাবি জানান তিনি।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও নারায়ণহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মো. গিয়াস উদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, ফটিকছড়িতে স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলন হয় নারায়ণহাটে। তাই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সপক্ষের সরকারের কাছে নারায়ণহাটে সদর করার দাবি করতেই পারেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নারায়ণহাটে উপজেলা সদর হলে ৫ ইউনিয়নের মানুষ সমান সুযোগ ভোগ করতে পারবে। কারণ হারুয়ালছড়ি থেকে বাগান বাজারের মাঝামাঝি স্থান হল নারায়ণহাট।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট