চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৩ আগস্ট, ২০২২ | ১২:১৪ অপরাহ্ণ

জাহেদুল আলম

তরমুজ চাষের আশাজাগানিয়া গল্প

রাউজান বাঙ্গির জন্য বিখ্যাত। এবার ‘অফ সিজনে’ তিনটি নতুন জাতের তরমুজ চাষ করে আলোর মুখ দেখেছেন রাউজানের দুই কৃষক। স্বল্প সময়ে বেশি লাভবান হয়ে আগামী বছর থেকে এ চাষ আরো ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন তারা। কৃষি অফিস থেকে দেয়া বীজে দুই কৃষকের এমন সাফল্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারাও বেশ খুশি। এই তিন জাতের তরমুজ চাষে দুই চাষির সফলতায় আরো অনেক কৃষকের মাঝে এই তরমুজ চাষাবাদ ছড়িয়ে দিতে চায় উপজেলা কৃষি বিভাগ। অত্যন্ত সুস্বাদু হওয়ায় ও ভালো চাহিদা থাকায় এই চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করেন অনেকে।

জানা যায়, উপজেলার ডাবুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম ডাবুয়ায় বাড়ির কাছে নারায়ন চন্দ্র তালুকদার (৬৩) গত বছর ২ গণ্ডা জমিতে পরীক্ষামূলক নতুন জাতের তরমুজ চাষ করে অভাবনীয় সফলতা পান। এবছর তিনি ৭ গণ্ডা বর্গা জমি নিয়ে তরমুজ চাষের বিস্তৃতি ঘটান। এবার তার মতো ৭ গণ্ডা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন একই ইউনিয়নের হাছান খীল এলাকার কৃষক সামশুল হক (৪৫)। এই তিন নতুন জাতের তরমুজের নাম ‘বাইরে কালো, ভেতরে লাল (কালো মানিক) জাত, ‘বাইরে হলুদ, ভেতরে লাল (রঙ্গিলা জাত), ‘বাইরে কালো ভেতরে হলুদ (কালাচাঁন্দ) জাত।

কৃষক নারায়ন চন্দ্র তালুকদার (৬৩) বলেন, ‘মে মাসের একেবারে শেষের দিকে ৭ গণ্ডা জমিতে তরমুজ চাষ শুরু করি। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে শেষ হবে এই ফলের উৎপাদন-বিক্রি। তিনি বলেন, ‘জমি প্রক্রিয়া ও বীজ রোপণকালের শুরুতে ১জন শ্রমিক কাজ করে একসপ্তাহ। তারপর আমি নিজে শ্রম দিই। ৭ গণ্ডা জমিতে মোট খরচ হয় ১৭ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত ১৮-২০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি। আরো ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকার ফলন রয়েছে জমিতে। এছাড়াও নতুন ফল (নতুন মৌসুমের ফল হিসেবে) ১শটির বেশি তরমুজ আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের উপহার দিতে হয়েছে। জমির আবাদে খরচ, উপহার ছাড়া আরো ৪০ হাজার টাকা মুনাফা থাকবে।

তবে এই কৃষক জানান, ‘এবার বৃষ্টি কম হওয়ায় লাভ প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। অথচ গতবছর মাত্র ২ গণ্ডা জমিতে নতুন জাতের তরমুজ চাষে ৭ হাজার টাকা খরচে ৩০ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি’। তিনি বলেন, ‘এই তিন জাতের তরমুজ খুব সুস্বাদু। এটি লাভজনক হওয়ায় আমি আগামী বছর এককানি জমিতে এ চাষ করবো’। এবার প্রথমবারের মতো অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবে নতুন জাতের তরমুজ চাষ করে দারুণ সফলতা পেয়েছেন আরেক কৃষক ডাবুয়া হাছান খীলের সামশুল হক (৪৫)। তিনিও আগামী অফ সিজনে এককানি জমি বর্গা নিয়ে এ তরমুজ চাষ করবেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এবার ৭ বর্গা জমিতে তরমুজের ফলনে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। মুনাফা উঠেছে ৫০-৬০ হাজার টাকা। এছাড়া আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতিদের উপহার দিতে হয়েছে অনেক তরমুজ’। তিনি জানান, ১০ জুন বীজ দিয়ে তা ২৩ জুন রোপণ করা হয়। ৭০ দিন অর্থ্যাৎ ২ মাস ১০ দিনে ফলন উৎপাদন ও বিক্রি প্রায় শেষ হয়ে যায় এবার। তিনি জানান, চাষাবাদের শুরুতে অর্থাৎ মাচিং পেপার লাগানোর সময় শ্রমিক লেগেছিল ১জন। ওই শ্রমিক কাজ করেছিলেন মাত্র ৪দিন’।

ডাবুয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সৈকত বড়ুয়া ও দিদারুল আলম বলেন, ‘তিন জাতের তরমুজ চাষ করার জন্য নোয়াখালীর লক্ষীপুর থেকে প্রদর্শনী হিসেবে সার, বীজ, কারগরি সহায়তা দিয়েছিল রাউজান কৃষি বিভাগ। আমরা এই দুই কৃষককে এ চাষে সহযোগিতা করি। প্রায় সময় মাঠে গিয়ে তাদের পরামর্শ দিই। তাদের তরমুজ চাষে সাফল্যে খুশি লাগছে। তারা আগামী বছর ১কানি করে দুইকানি জমিতে এই চাষ করার পরিকল্পনা করেছে। আমরা স্বপ্ন দেখছি। বছর বছর এ চাষের ব্যাপকতা বাড়বে’।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, ‘অফ সিজনে এই তিন জাতের তরমুজ চাষে লাগে একটু উঁচু জমি, মাচাং, মালচিং পেপার এবং জমি তৈরির সময় একবার সার। এ ফলকে পানি থেকে আলাদা রাখার জন্য ঝুলে থাকার সুযোগ করে দিতে হবে। এজন্য চিচিংগা, করলা চাষের মতো মাচাং দিতে হবে’। তিনি বলেন ‘এবার কৃষি মেলা, ফল বিক্রেতা ও উৎসাহী ফল ক্রেতার কাছে এই নতুন মৌসুমি ফল বিক্রি করেন দুই কৃষক’।

কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদিত একেকটি তরমুজ ৮ কেজি পর্যন্ত হয়। তবে এবার বৃষ্টি কম হওয়ায় আকার হয়েছে ৪-৫ কেজি। দুই কৃষক এবার প্রায় তিন হাজার পিস বা প্রায় ১০ টন নতুন জাতের তরমুজ বিক্রি করেছেন। ‘অফ সিজন’র সময় ব্যতিক্রমী এবং চাহিদা বেশি হওয়ায় এসব তরমুজ প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা করে’।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট