চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

৪ জুলাই, ২০২২ | ২:৩৩ অপরাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকল্প ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫ গুণ

‘বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া-কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন’ প্রকল্পের ডিপিপি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল ২০১১ সালে। প্রকল্পটির মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে ৮ বছর কেটে গেলেও এখনো সম্পূর্ণ জমি বুঝে পায়নি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন(চসিক)। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এই প্রকল্পে কোন অর্থ বরাদ্দও মিলেনি। তবে কার্যাদেশ দেয়ার পর একাংশে কাজ শুরু করেছে ঠিকাদার।

প্রকল্পের মেয়াদ যত বেড়েছে, ব্যয়ও তত বেড়েছে। ২৮৯ কোটির প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। গত ১৯ এপ্রিল জিরো ম্যাচিং ফান্ডে একনেক সভায় সংশোধিত প্রকল্পটির অনুমোদন হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পের শুরু : শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে খাল খননের জন্য ২০১১ সালের ২৯ ডিসেম্বর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনাটি (ডিপিপি) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায় চসিক। এর প্রায় আড়াই বছর পর ২০১৪ সালের ২৪ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্প পাস হয়। মূলত সেবছর প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম শহর এক প্রকার ডুবে যায়। তখন তড়িঘড়ি করে একনেক সভায় প্রকল্পটি তুলে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত। প্রকল্প ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ সরকার এবং বাকি ব্যয় সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে দেয়ার কথা ছিল। তবে কাজের কোন অগ্রগতি হয়নি।

২০১৫ সালে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। ততক্ষণে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই খাল খননের সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১২৫৬ কোটি ১৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর সংশোধিত প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। দ্বিতীয় দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়নি। তৃতীয় দফায় আবারো ব্যয় বাড়ানো হয়। এখন প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। তবে জিরো ম্যাচিং ফান্ডে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেন। মূলত জমির মৌজা রেইট বৃদ্ধি এবং ক্ষতিপূরণ তিনগুণ দেয়ার সিদ্ধান্তের পর প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৫ গুণ বেড়ে যায়।

প্রকল্পের অগ্রগতি : প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। গত বছরের ২৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৯১১ কোটি টাকা ভূমি অধিগ্রহণ খাতে জেলা প্রশাসন তহবিলে জমা দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পটি গ্রহণের ক্ষেত্রে চসিকের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। একইসাথে ছিল ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা। খাল খনন প্রকল্পটি নগরবাসীর কাছে অতিগুরুত্বপূর্ণ হলেও জেলা প্রশাসনের এল এ শাখার কাছে গুরুত্ব পায়নি। তারা কাজ করছে অত্যন্ত শম্ভুক গতিতে। যেকারণে ভূমি অধিগ্রহণ কাজ এখনো শেষ হয়নি।

প্রকল্পের কাজ : ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন, খালের উভয় পাশে ২০ ফুট করে সড়ক ও ৬ ফুট করে ফুটপাত থাকবে। ৬৫ ফুট প্রশস্থ হবে খালটি। এর মধ্যে মাটি খনন হবে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৮৮১ ঘনমিটার। বালি ভরাট ২ লাখ ৬১ হাজার ঘনমিটার। ড্রেন নির্মাণ ৫.৮ কিলোমিটার। প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ সাড়ে ৫ কিলোমিটার। ৯টি ব্রিজ, সাড়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক, এবং সাড়ে ৫ কিলোমিটার ফুটপাত নির্মাণ।

ভূমি অধিগ্রহণের বর্তমান চিত্র : এলএ মামলা ৫/১ এর ৩.৭৮১৩ একর ভূমি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন হয় ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর চসিকের কাছে জমির দখল হস্তান্তর করা হয়। এলএ মামলা ৫/২ এর ৬.৯৫৯৫ একর ভূমি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন হয় ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর। ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চসিকের কাছে দখল হস্তান্তর করা হয়। এলএ মামলা ৫/৩ এর ৯.৫০৪৮ একর জমি গত ১৬ জুন ভূমি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে। চসিক এখন জমি বুঝে পায়নি। এলএ মামলা ৫/৪ এর ১.০৬৯৮ একর জমি যৌথ ফিল্ড বুক তৈরির কাজ চলছে। এলএ মামলা ৫/৫ এর ৩.৯১৯৬ একর জমির ফিল্ড বুক তৈরির কাজ চলছে।

মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাব : চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) ১৯৯৫ সালে প্রণিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানে তিনটি নতুন খাল খননের প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে একটি বাড়ৈপাড়া হতে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত। অন্য দুটি হলো নয়াখাল থেকে শীতলঝর্ণা এবং মুরাদপুর থেকে বহদ্দারহাট। পরের ২০ বছরের মধ্যে ওই মাস্টাপ্ল্যান বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা হয়নি।

সিটি মেয়রের বক্তব্য : জানতে চাইলে সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, খাল খনন প্রকল্পটি অতীতে কেন বাস্তবায়ন হয়নি আমি সেদিক নিয়ে আলোচনা করবো না। তবে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত কিছু জমি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দখল নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি।

যে জমি এখনো বুঝে পায়নি তা অতিশীঘ্রই পাওয়া যাবে উল্লেখ করে বলেন, খাল খনন কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত থাকলেও আমরা ২০২৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।

তিনি বলেন, এই খালের কাজ সম্পন্ন হলে শহরের নাসিরাবাদ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, শুলকবহর, বারইপাড়া, বাকলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার জলাবদ্ধতা দূর হবে।

পূর্বকোণ/এএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট