চট্টগ্রাম শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০২৩

৯ জুন, ২০২২ | ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘আগুন নিভিয়ে আসবে বলেছিল কিন্তু সে নিজেই নিভে গেছে’

‘তাকে বারবার বলেছি, তুমি চলে আসো। কিন্তু সে বলেছিল-আরেকটু পর আসবো। আগুন নিভিয়ে বাসায় আসার কথা ছিল তার। তবে সে আমার কথা শুনেনি। এখন নিজেই নিভে গেছে। আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমি এখন এ দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে থাকবো? তাদের কিভাবে বুঝ দিব তাদের বাবা নেই।’
কান্না জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো গণমাধ্যমকে বলছিলেন স্বামী হারানো বাকরুদ্ধ মাসুদ রানার স্ত্রী মৌসুমি আক্তার। গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বামীর সঙ্গে বলা শেষ কথাগুলো তুলে ধরেন তিনি।
মৌসুমি আক্তার বলেন, ‘আগুন লাগার পর মোবাইলে ভিডিও কলের মাধ্যমে তা আমাদের দেখানো হয়। ভয়াবহতা দেখে আমি তাকে বারবার বাসায় চলে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু সে আর আসেনি। পরে তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। খোঁজ না পেয়ে বিভিন্ন হাসপাতালেও যাই। সর্বশেষ চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে তার খোঁজ পাই। কিন্তু তার সাথে আর কথা বলতে পারিনি।’
এদিকে স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে স্ত্রী মৌসুমি আক্তার। জানেন না কীভাবে কাটবে আগামী। স্বামীকে হারানো নির্বাক মাসুদ রানার স্ত্রী বলেন, ‘তাদের নিয়ে কীভাবে চলবো, কী করবো আমি জানি না। আমাদের যদি কোন ব্যবস্থা করে দেয় কোম্পানি, আমার বাচ্চাদের যেন দায়িত্ব নেয়। আমি এটুকুই আশা করি।’
এক যুগের সংসার মাসুদ-মৌসুমির। তাদের ঘরে নয় বছরের একটি মেয়ে আর আড়াই বছরের এক ছেলে সন্তান রয়েছে। গত ছয় বছর ধরে মাসুদ রানা বিএম কন্টোইনার ডিপোতে কর্মরত।

 

চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে প্রাণপ্রদীপ নিভল বিএম শ্রমিক মাসুদ রানার

 

চারদিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে হেরে গেলেন সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর শ্রমিক মাসুদ রানা। গতকাল বুধবার ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণপ্রদীপ নিভে যায় তার। মাসুদ রানা জামালপুরের সরিষাবাড়ি থানার গোপীনাথপুর এলাকার খলিলুর রহমানের ছেলে। তিনি বিএম কন্টেইনার ডিপোর ক্রেন অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে গত শনিবার রাতে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে আগুন লাগার পর কন্টেইনার সরাতে গিয়ে দগ্ধ হন মাসুদ রানা। পরে তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে এলে সঙ্গে সঙ্গে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। সেখানেই গতকাল বুধবার ভোরে মৃত্যু হয় তার। পরে দুপুরে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি।
বিষয়টি নিশ্চিত করে চমেক হাসপাতালের জেলা পুলিশের দায়িত্বরত এএসআই আলাউদ্দিন বলেন, ‘আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাসুদ রানা নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার দুপুরে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’
জানা যায়, ঘটনার দিন নাইট ডিউটি ছিল মাসুদ রানার। আগুন লাগার পর স্ত্রীর সঙ্গে ভিডিওকলে কথা বলেছিলেন তিনি। আগুন লাগার বিষয়টি স্ত্রীকে ভিডিও কলের মাধ্যমে জানানো হয়।
মাসুদ রানার সহকর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আগুন লাগার পর লিফট ক্রেন দিয়ে খালি কন্টেইনার সরাচ্ছিলেন মাসুদ। হঠাৎ বিস্ফোরণে পুরো শরীর ঝলসে যায় তার। অন্যদের সাথে তাকেও উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

উল্লেখ্য, মাসুদ রানার মতো সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। যাদের মধ্যে ২৭ জন শনাক্ত হলেও বাকি ১৯ জন এখনও শনাক্ত হয়নি।

পূর্বকোণ/এস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট