চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ মে, ২০২২

১৪ মে, ২০২২ | ৭:৩২ অপরাহ্ণ

মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ হারাবে

ইফতেখারুল ইসলাম

বিশ্বের প্রায় সবদেশেই কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বা পণ্য বিনিময় কেন্দ্র চালু থাকলেও বাংলাদেশে নেই। তবে চলতি বছরেই দেশে পণ্য কেনাবেচার স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থা চালু করতে চায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। আর তাতে সায় দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

দেশের পুঁজিবাজারে পণ্য-সেবায় বৈচিত্র্য আনতে শুরুতে গম, তুলা ও সোনা কেনা বেচার মাধ্যমে দেশের প্রথম পণ্য বিপণনের এই এক্সচেঞ্জটি চালু করবে সিএসই। এই কার্যক্রম চালু করতে ভারতের মুম্বাইভিত্তিক কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এমসিএক্সকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কোন পণ্য নিয়ে এ এক্সচেঞ্জ চালু করা যায়, তার গাইডলাইন দেবে। এনিয়ে দৈনিক পূর্বকোণ এর সাথে কথা বলেছেন সিএসই’র চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম।

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমোডিটি মার্কেট চালু হলে উৎপাদক ও ভোক্তারা সঠিক দামে পণ্য কেনা-বেচা করতে পারবেন। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগিরা দাম নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ হারাবে। এতে বাজারে খানিকটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কি : সিএসই’তে এখন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে শেয়ার বা ঋণপত্র কেনা বেচা হয়, তেমনই একটি এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা হবে সোনা-রুপা, তেল-ডাল ও পাটের মতো পণ্য। অবশ্য কমোডিটি এক্সচেঞ্জে ক্রেতা ও বিক্রেতার সরাসরি পণ্য কেনাবেচার সুযোগ নেই। অনেকটা শেয়ারের মতো বিক্রেতার দেওয়া পণ্যের সার্টিফিকেট (মান সনদসহ) বিক্রি হয়। মান সনদ দেখেই পণ্যের গুণগত মান বিষয়ে নিশ্চিত হন ক্রেতা। শুধু দেশেই নয়, অন্য দেশে থেকেও কেনাবেচা করা যাবে এই এক্সচেঞ্জে। এতে মূল পণ্যটি থাকে কোনো গুদামে বা মাঠে। সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর এটি হস্তান্তর হয়। ক্রয় আদেশ যার হাতে থাকবে, তাঁকে বিক্রিত পণ্য বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এটি অনেকটা কারখানার মিলগেটে ডেলিভারি অর্ডার বা ডিও কেনা বেচার মতো।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কেন দরকার? কমোডিটি এক্সচেঞ্জ হলে বিশ্বের আগ্রহী সব ক্রেতা-বিক্রেতাকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পণ্য কেনাবেচার সুযোগ পাবে। এতে পণ্যমূল্যে ভারসাম্য নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে। সিন্ডিকেটের কারণে কম দামে পণ্য বিক্রি করার ঝুঁকি কমবে। বাংলাদেশের বাজারে সিন্ডিকেটভিত্তিক পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এছাড়াও কমোডিটি এক্সচেঞ্জের কারণে নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা বাড়ে। ফসল তোলা পরবর্তী অবকাঠামো উন্নয়ন ও মাননিশ্চিত করার স্বার্থে উপযুক্ত মানের ওয়্যারহাউস ও কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করতে হয়। কৃষককে তখন আর পণ্য মজুদের মতো সমস্যায় ভুগতে হয় না। পন্য নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা না থাকায় বাজারে সংকট তৈরির আশংকাও কমে যায়।

এছাড়াও স্টক-বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের বাইরেও বিনিয়োগের সুযোগ এনে দেয় কমোডিটি ডেরিভেটিভস। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি বিনিয়োগে ঝুঁকি কমায় কমোডিটি ডেরিভেটিভস। বাজারে কখনো ধস হলেও বিনিয়োগকারীদের লোকসান তখন তত বেশি হয় না।

পার্থক্য আছে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এবং স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে : কমোডিটি ট্রেডিংয়ের জন্য আলাদা বিধি ও আইন নির্ধারণ করা হবে। সাধারণ বিও একাউন্ট দিয়ে এই মার্কেটে ট্রেড করা যাবে না। এর জন্য আলাদা ট্রেডিং একাউন্ট খুলতে হবে। এছাড়া আলাদা ব্রোকারও থাকবে। ট্রেডিংয়ের সময়েও থাকবে পার্থক্য। স্টক মার্কেট বেলা আড়াইটায় বন্ধ হয়ে গেলেও বিশ্ব বাজারের সাথে মিল রেখে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলবে কমোডিটি মার্কেট।

পণ্য নয়, বিক্রি হয় চুক্তিপত্র : স্টক মার্কেটে যেমন কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচার সাথে সাথে তা একাউন্টে ট্রান্সফার হয়ে যায় এখানে তেমনটি হবে না। এখানে মূলত কেনা-বেচা হবে চুক্তিপত্রের। একে ফিউচারস কন্ট্রাক্ট বলা হয়ে থাকে। আইনের মাধ্যমে এই চুক্তিপত্রের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এসময়ের মধ্যে বাজারের চাহিদা বুঝে যে কেউ তার কাছে থাকা এই চুক্তিপত্র ইচ্ছেমত দামে বিক্রি করতে পারবে। তবে একে স্টক মার্কেটের শেয়ারের মত যতদিন ইচ্ছে হাতে ধরে রাখা যায় না। এটি যেহেতু নির্ধারিত সময়ের চুক্তিপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় তাই সময় শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারে চলতি দরে একাউন্টে টাকা জমা হবে।

লাভ তুলে আনতে সময় বেশি লাগে : কমোডিটি মার্কেটের বিনিয়োগ কিছুটা দীর্ঘ সময়ের জন্য হয়ে থাকে। বিশ্ববাজারে খুব বড় কোন হেরফের না হলে বিনিয়োগ করে মুনাফা তুলে আনতে সপ্তাহ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

অস্থিরতা কম, কারসাজি কম : কমোডিটি মার্কেটে বিনিয়োগ করে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকা যায়। এই মার্কেটের সব পণ্যের দাম নির্ধারণ হয় সাধারণ বাজারে ভোক্তার চাহিদার উপর নির্ভর করে। এছাড়াও কমোডিটি মার্কেটের পণ্য বিশ্বের সব বাজারের সাথে সংযুক্ত থাকায় কেউ চাইলেও এর দর নিয়ে কারসাজি করতে পারে না। এর নজরদারি অনেক বেশি শক্ত হওয়ায় বিনিয়োগকারীর পুঁজি তুলনামূলক নিরাপদ থাকে।
ক্ষতির ঝুঁকিও আছে : স্টক মার্কেটে কোন শেয়ারের দর ওঠা-নামার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ১০ শতাংশের সার্কিট ব্রেকার দিয়ে রাখতে পারে। তবে কমোডিটি মার্কেটে এমন কোন ব্যবস্থা নেই। প্রাকৃতিক কারণে বা বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ-তিনগুণও হতে পারে।

লভ্যাংশ পাওয়া যায় না : সাধারণ স্টক মার্কেটে শেয়ার কিনলে, শেয়ার বিক্রি করে লাভ করার পাশাপাশি বছর শেষে শেয়ারের লভ্যাংশও পাওয়া যায়। তবে কমোডিটি মার্কেটে এই সুযোগ নেই।

লটে কেনা-বেচা : লটের সাইজেও পার্থক্য আছে স্টক মার্কেটের সাথে কমোডিটি মার্কেটের। স্টক মার্কেটে কেউ চাইলে একটি শেয়ার কিনেও কোন কোম্পানির বিনিয়োগকারী হতে পারেন। কিন্তু কমোডিটি মার্কেটে কেনা-বেচা করতে চাইলে তাকে অবশ্যই লটে কেনা- বেচা করতে হবে। এমনকি এই মার্কেটে লেনদেন করতে হলে প্রথমে একাউন্ট খোলার সময় প্রাথমিক বায়না-পত্রের জন্য টাকা দেয়া লাগবে। যখন কমোডিটি মার্কেটের কিছু কিনবেন তখন আবার পণ্যের অনুপাতে টাকা জমা করতে হবে। শেয়ার বাজারের মতো কমোডিটি এক্সচেঞ্জেও নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত ব্রোকারের মাধ্যমে নিজ বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাউন্টে পণ্য কেনাবেচা করবে। তবে লেনদেন নিষ্পত্তি হয় ক্লিয়ারিং এন্ড সেটেলমেন্ট হাউসের মাধ্যমে। প্রথমে ক্যাশ সেটেলমেন্ট অর্থাৎ ক্রেতার ব্রোকার থেকে অর্থ নিয়ে বিক্রেতার ব্রোকার একাউন্টে পাঠানো হয়। এরপর চুক্তি অনুযায়ী ফিজিক্যাল ডেলিভারি সম্পন্ন করতে পণ্যটি ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী পৌঁছে দেয়া হয়।

ফিউচারস কন্ট্রাক্ট : পণ্য বিদ্যমান না থাকলেও তা কেনাবেচা করা যাবে। বাজারের এ অংশকে ‘ফিউচারস কন্ট্রাক্ট’ বলা হয় । যেমন মৌসুমি ফল আম বা এ ধরনের পণ্য সাধারণত সারা বছর হয় না। চাইলে কোনো বিক্রেতা এ ধরনের ফসল আগাম বিক্রির আদেশ দিতে পারেন। ওই আদেশ অনুযায়ী, কোনো ক্রেতা তা আগাম কিনেও নিতে পারেন। এক্ষেত্রে পণ্য একমাস বা দুইমাস বা তারও বেশি সময় পর ডেলিভারি হতে পারে। শুধু মৌসুমি নয়, যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এধরনের ফিউচারস কন্ট্রাক্ট হতে পারে।

মান নিশ্চিতকরণ : বাংলাদেশে পণ্যের মান যাচাই এবং সংরক্ষণ অপেক্ষাকৃত একটি কম গুরুত্ব পাওয়া কার্যক্রম। সেখানে এমন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্লাটফর্মই দিতে পারে যথাযথ মান যাচাই ও সংরক্ষণের নিশ্চয়তা। যা কিনা এই প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক শর্ত। ওয়্যারহাউস ও মানব্যবস্থা নিশ্চিতে ৬টি অবকাঠামো সুবিধা এবং সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বলেছে। একইসাথে বাজারে অংশগ্রহণকারীদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি, ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়। তবে দ্রুত পচনশীল পণ্যে ভোক্তার ঝুঁকি অবশ্যই থাকে। যে কোন ভোগ্যপণ্য যার বাজারে চাহিদা ও ব্যবসায়িক মূল্যমান রয়েছে তা এখানে বাণিজ্যের আওতায় আসতে পারে। এমনকি আমদানিকৃত পণ্যও এখানে বিক্রয় করা যাবে ।

উত্থান-পতন : শেয়ারবাজারের ন্যায় কমোডিটি মার্কেটে দ্রুত উত্থান পতনের সম্ভাবনা কম। এখানে যে পণ্যর ক্রয়-বিক্রয় হয় তার নেপথ্যে সম্পদ একটি ট্যানজিবল সম্পদ। আর তার মান কৃত্রিমভাবে কম বা বেশি দেখানো সম্ভব নয়, বরং এর দর পরিবর্তন বৈশ্বিক দর পরিবর্তনের সাথে সম্পৃক্ত।

দেশে উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে মূল্যের সমন্বয় : যেহেতু কমোডিটি এক্সচেঞ্জের ধারণাটা শুধু অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তাই এর দর স্থাপনও হয় আন্তর্জাতিক বাজারের দরকে মাথায় রেখেই। তাই এখানে পণ্যের উৎপত্তির ভিন্নতার কারণে দর স্থাপনে তেমন সমস্যার সম্মুখীন হবে না ।

 

তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকদের সম্পৃক্ততা তৈরি : এক্ষেত্রে সিএসই প্রাথমিকভাবে গম ও তুলা চাষাবাদের ক্ষেত্রে আধুনিকায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে কমোডিটি এক্সচেঞ্জের বাজার : এটি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার, যা নির্ভর করে একটি পণ্যের মোট উৎপাদন বা আমদানির শতকরা কি পরিমাণ ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে তার উপর।

কার্যক্রম চালুর সম্ভাব্য সময় : গত বছর ২৮ অক্টোবর দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করার অনুমতি পায় সিএসই। শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর বিষয়ে শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিক সম্মতিপত্র দিয়েছে সিএসই’কে। কাজ চলছে, চলতি বছরেই চালু হতে পারে।

 

পূর্বকোণ/এস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট