চট্টগ্রাম শনিবার, ০৬ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

২৬ জুলাই, ২০১৯ | ২:৩১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অতীতের অপরিকল্পিত নগরায়নের ফল ভোগ করছি : সিটি মেয়র

সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেছেন, বন্দর নগরীর সকল সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় রেখে যা বাস্তবায়ন করা যাবে সে ধরণের পরিকল্পনা আমি করি। স্বপ্নও দেখি বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন নিয়ে। নগরবাসীকে আকাশকুসুম স্বপ্নের কথা বলে কাজ করার মানুষ তিনি নন উল্লেখ করে বলেন, দায়িত্ব পালনের এই চার বছর দুই মাস সময়ের মধ্যে কি করতে পেরেছি বা পারিনি- সে বিচারের ভার নগরবাসীকে দিলাম। নগরবাসীই আমার সফলতা ব্যর্থতার মূল্যায়ন করবেন। গতকাল (বৃহস্পতিবার) নগরীর একটি কনভেনশন সেন্টারে ‘জনতার মুখোমুখি মেয়র’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
৪১টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নগরবাসীর মুখোমুখি মেয়র নাছির। তারই অংশ হিসেবে গতকাল ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ওয়ার্ডের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ মেয়রের কাছে সরাসরি প্রশ্ন করেন।
বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে মেয়র বলেন, নিরাপদ, বাসযোগ্য, পরিষ্কার ও সবুজ নগরী হিসেবে বন্দরনগরী দৃশ্যমান হচ্ছে। এ কাজে নগরবাসীকে আমাদের সঙ্গে পেতে চাই। আমার প্রত্যাশা উন্নত দেশের সমৃদ্ধ নগরীর মতো এই শহরকে গড়ে তোলা। নালার পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ঢাকনা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে মেয়ল বলেন, ঢাকনার কারণে কেউ নালায় ময়লা ফেলে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চসিক নিয়মিত ওষুধ ছিটানো, ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহ এবং রাতে ময়লা অপসারণ করায় অন্য যেকোনো শহরের চেয়ে মশা কম। ডেঙ্গুর প্রকোপও কম। প্রতি ওয়ার্ডে ফগার ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিনে ১৬১ জন ওষুধ ছিটাচ্ছেন। ডাক্তারদের সচেতন করেছি। নগরবাসীর অবগতির জন্য বিজ্ঞপ্তি, প্রচারপত্র বিলি করছি। ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ চিকিৎসা করাতে অপারগতা প্রকাশ করলে তার দায়িত্ব মেয়র নেবেন বলে জানান।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও নিরাপদ যাত্রীসেবার লক্ষ্যে নগরীতে একশ’টি এসি বাস নামানোর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে রাজি করিয়েছেন তিনি। তারা এলসি খুলেছে। দ্রুত অনুমোদন দেয়ার জন্য বিআরটিএ, সিএমপিকে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তিনি নিজে কোনো সম্মানি বা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন না উল্লেখ করে বলেন, ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা সম্মানিসহ সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা অনুদান দিয়ে আসছি। শিক্ষার্থী, সেবা সংস্থা, রোগীদের কল্যাণে এ টাকা খরচ হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, এ শহরে যে উন্নয়ন হয়েছে তা পরিকল্পিতভাবে হয়েছে এটা দাবি করতে পারি না। অতীতের অপরিকল্পিত নগরায়নের ফল ভোগ করছি আমরা। ড্রেনেজ ব্যবস্থা সুপরিকল্পিত নয়। দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু বাসিন্দা পানি আটকে দেন, বৃষ্টি-জোয়ারের পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করে। পাহাড়ি ঢলে জামালখান বাই লেনে বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি উঠে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ২০১৬ সালে ১১ মাস ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছিল বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে জমা দিই। তখন জানতে পারি সিডিএ’র মেগাপ্রকল্প একনেকে ওঠছে। আমরা এর বিরোধিতা করেনি, শতভাগ সহযোগিতার সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলাম।সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ চলছে। ফিজিবিলিটি স্টাডিশেষে ১৩টি খালের ড্রয়িং ডিজাইন কয়েকদিন আগে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায় প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে সর্বোচ্চ হোল্ডিং ট্যাক্স, ৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছি। যা চসিকের ইতিহাসে রেকর্ড। অথচ কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন খাতে চসিকের ব্যয় ২৬০ কোটি টাকা। তিনি দায়িত্ব গ্রহণকালীন সময়ে মাসে ৯ কোটি টাকার প্রশাসনিক ব্যয় এখন ২০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৫৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে চসিক।
নিজেকে জনবান্ধব মেয়র দাবি করে বলেন, এখন আমার বাসা থেকে বের হওয়া যুদ্ধের মতো। ড্রয়িং রুমে ৬০-৭০ জন বসে থাকে। কয়েকশ লোককে সময় দিতে হয়। মেয়রের নির্ধারিত কিছু দায়িত্ব আছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিতে হয়। মেয়রের অফিস জনসভাস্থলে পরিণত হয়। মানুষ এমন এমন আবদার নিয়ে আসে যা আমার আওতার বাইরে।
এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, আমার কাছে দলমত নির্বিশেষে সকল নেতাকর্মী অবাধে আসেন। আমার কাছে যেভাবে লোকজন আসার সুযোগ পায় অন্য কোন নেতার কাছে সে সুযোগ পান কিনা সন্দেহ আছে। হাতে করি নিত্যকর্ম, মুখে বলি খোদা- এভাবেই আমার দিন কাটে।
জামালখান সিঁড়ির গোড়া এলাকার বাসিন্দা ইউনিট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ.টি.এম আহসানউল্লাহ খোকন বলেন, তার এলাকায় সকালে অবৈধ বাজার বসে। সেখানে চাঁদাবাজি চলে। ভ্যান থেকে চারশ, মাছ বিক্রেতার কাছ থেকে তিনশ এবং ঝুড়ি নিয়ে যারা বসে, তাদের কাছ থেকে দেড়শ টাকা করে নেয়া হয়। পুলিশ একভাগ, সিটি কর্পোরেশনের লোকজন একভাগ এবং নেতা এক ভাগ নেয়। উত্তরে মেয়র নাছির বলেন, আপনি সিটি কর্পোরেশনের বিষয়ে ঢালাওভাবে বললে তো হবে না। কে নেয় ? নাম জানেন? নাম জানলে বলেন। জবাবে আহসানউল্লাহ খোকন বলেন, পরিচ্ছন্নকর্মীরা টাকা তোলে। মেয়র বলেন, যদি আপনার অভিযোগ সত্যি হয় তাহলে তাদের আমি ডাকব। ব্যবস্থা নেব। আপনিও তো এলাকার নেতা। আপনার কী ভূমিকা আছে? নগরীতে যত বাজার, প্রয়োজন তত নেই। আপনি না করলেও এখানে অনেকে হয়ত বাজার করেন। তবে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেব।
যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেললে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মেয়র, এবিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। নিজে দাঁড়িয়ে জরিমানাও করেছিলাম। কিন্তু সেসময় আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল- আমি নাকি নগর কিনে ফেলেছি। নগরীর শাসক হয়ে গেছি। মার্শাল ল’ জারি করেছি কিনা? এই ধরনের অপপ্রচারের কারণে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপকারীদের বিরুদ্ধে আপাতত ব্যবস্থা নেয়া বন্ধ রয়েছে।
ফারজানা নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা মেয়রকে বলেন, জামালখান বাই লেনের নালায় মাটি ও পলিথিনের স্তূপ। গত সপ্তাহে কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনকে বলেছি। তিনি বলেছেন, এটা সিডিএ’র কাজ। সিডিএ তে বলেছি, তারা বলছে এটা সিটি কর্পোরেশন করবে। সমাধান কী? জবাবে মেয়র বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল নগরবাসী যত দ্রুত জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়। তাই সিডিএ যখন জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প নেয় তখন বলেছি, শতভাগের বেশি সহযোগিতা করবো। সিডিএকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে ও মৌখিকভাবে বলেছি, কোন ৩০২ কিলোমিটার সেকেন্ডারি নালার কাজ তারা করবে সেটা জানাতে। তাহলে বাকিগুলো আমরা করবো। একটা প্রকল্প এক প্রতিষ্ঠান নিলে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। করলে ওভারলেপিং হয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানে প্যানেল মেয়র হাসান মাহমুদ হাসনী, জামালখান ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, মহিলা কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মনি, সচিব আবু সাহেদ চৌধুরীসহ চসিকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম মনি জলাদ্ধতার জন্য সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামকে জবাবদিহি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন। বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছিরকে তিনি আবারো মেয়র হিসেবে দেখতে চান বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। ওই বছরের ২৬ জুলাই তিনি মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 403 People

সম্পর্কিত পোস্ট