চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ১:১৮ অপরাহ্ণ

আবাসন শিল্পে স্থবিরতা ৪ কারণে

ইমরান বিন ছবুর 

করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আবাসন খাত। এই খাতের নির্মাণ সামগ্রীর দাম লাগামহীভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও, নামসর্বস্ব ও ভুঁইফোঁড় আবাসন ব্যবসায়ীর প্রতারণা, রেজিস্ট্রেশন ফি না কমানো, ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে সরকারি ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় আবাসন শিল্পে কার্যত স্থবিরতা বিরাজ করছে। এভাবে চলতে থাকলে ফ্ল্যাট বিক্রি কমে অর্ধেকে আসার শঙ্কা করছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। ফলে অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও আবাসন খাত বিকশিত হতে পারছে না। যথাযথভাবে বিনিয়োগ ও সরকারি নীতিসহায়তা পেলে এ খাতেও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি টন ৫০ হাজার টাকার রডের দাম বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন ৮০-৮২ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। ৩৫০ টাকার বস্তাপ্রতি সিমেন্টও এখন ৪৩০-৪৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুল্কসহ পাথরের (স্টোন) দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একটি বহুতল ভবন (১০-১৫ তলা) নির্মাণ করতে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। ভবন নির্মাণের সময় ভূমি মালিক ও গ্রাহকের সাথে চুক্তি হয় আবাসন ব্যবসায়ীর। তবে এই তিন-চার বছরের মধ্যে যদি নির্মাণ সামগ্রীর ৪০-৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পায়, তাহলে আবাসন ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়া ছাড়া বিকল্প নেই।

নাম সর্বস্ব ও ভুঁইফোঁড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের কারণে মূল আবাসন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে চট্টগ্রামের কয়েকজন আবাসন ব্যবসায়ী জানান, যখনই আবাসন খাত মানুষের আস্থা অর্জন করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই কিছু ভুঁইফোঁড় আবাসন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ফলে প্রকৃত আবাসন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ভূমি মালিককে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে জমি নিয়েছেন এবং গ্রাহকদের সুযোগ-সুবিধার কথা বলে ফ্ল্যাট বুকিং নিয়েছেন। চুক্তির পর এসব কোম্পানি গ্রাহক ও ভূমি মালিকদের বছরের পর বছর ঘুরিয়েছে। এসব কিছুর ফলে মূল আবাসন ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।

জানতে চাইলে রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম রিজিওনাল কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল কৈয়ম চৌধুরী বলেন, আবাসন নির্মাণ সামগ্রীর দাম যেভাবে বাড়ছে, এখন যদি এর লাগাম টেনে ধরা না হয় এই খাত ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন এবং হস্তান্তর ফি কমানোর জন্য আমরা অগামী বাজেটে সরকারের কাছে আবেদন করবো। এছাড়া, আবাসন শিল্পের জন্য সেকেন্ডারি বাজার সৃষ্টিতে আমরা কাজ করছি। একটি নতুন গাড়ি ক্রয়ের সময় রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়। এরপর বিক্রি করলে শুধুমাত্র হস্তান্তর ফি দিতে হয়। একইভাবে, ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রেও এ নিয়ম কার্যকর করা হোক। প্রথমবার ফ্ল্যাট ক্রয়ের সময় রেজিস্ট্রি ফি এবং এরপর বিক্রির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হস্তান্তর ফি দিবে। ফলে একই সম্পত্তি একাধিকবার হাত বদলের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু একটি ফ্ল্যাট একাধিকবার বিক্রি হলেও একাধিকবার রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়। এতে মানুষ ফ্ল্যাট ক্রয়ে অনাগ্রহী হচ্ছে।

সিডিএ’র বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, চট্টগ্রাম শহরে বিশাল কোনো খালি জায়গা নেই, যেখানে সরকার ইচ্ছে করলেই কোনো উপশহর করতে পারে। তাই সরকারের উচিত নগরী থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে পরিকল্পিত উপশহর করা। এরফলে সুবিধা হবে- একদিকে শহরের উপর থেকে চাপ কমবে, অন্যদিকে কম মূল্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা ফ্ল্যাট ক্রয় করতে পারবে।

চট্টগ্রামের আবাসন শিল্পের অন্যতম প্রতিষ্ঠান এপিক প্রপার্টিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এস এম লোকমান কবির বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে (বেজা) হাজার হাজার অনুন্নত জায়গা দেয়ার ফলে এখন তা উন্নত হয়েছে। সেখানে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। শহরে বর্তমানে উন্মুক্ত জায়গার প্রচুর অভাব। তাই আবাসন নিয়ে সরকারকে শহরের বাইরের এলাকা নিয়ে ভাবতে হবে। অন্যথায়, ছোটখাটো চাকরিজীবী এবং ব্যবসায়ীদের টাকা জমিয়ে ফ্ল্যাট কিনার সুযোগ হবে না।

চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় অন্যতম আবাসন শিল্প প্রতিষ্ঠান সিপিডিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন বলেন, সরকার যদি এগিয়ে আসে, তাহলে এ খাতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। আবাসন শিল্পকে বিলাসিতা হিসেবে না দেখে মানুষের মৌলিক চাহিদার খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সরকার স্বল্প সুদ ও সহর্জ শর্তে যদি ঋণ দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ভাড়ার টাকায় ফ্ল্যাট নিতে পারবে। অন্যদিকে, সরকার যদি আবাসন ব্যবসায়ীদের কম দামে জমি দেয়, তাহলে মধ্যবিত্তরা কম মূল্যে ফ্ল্যাট কিনার সুযোগ পাবে এবং একটি সময়ে সবাই ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন