চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ | ১:৪৩ অপরাহ্ণ

করোনাকালে গার্মেন্টস সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ‘প্রণোদনা’

নাসির উদ্দিন চৌধুরী 

করোনার শুরু থেকেও সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তখন সরকার আপদকালীন প্রণোদনা (লোন) দিয়ে গার্মেন্টস সেক্টরকে যেভাবে সাহায্য করেছে। এই প্রণোদনা আমাদের খুব বেশি সাহায্য করেছে। সরকারের সেই সিদ্ধান্ত খুবই কার্যকর ছিল। এই গার্মেন্টস সেক্টর টিকে থাকার পেছনে প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রণোদনা না পেলে গার্মেন্টস সেক্টরে ধস নামতো। আসলে সেই সময়টায় ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। এখন করোনার তৃতীয় ঢেউ আমাদের ফের দুশ্চিন্তায় ফেলছে।
প্রথম লকডাউন ছাড়া পরবর্তীতে করোনার তেমন কোনো প্রভাব গার্মেন্টস সেক্টরে পড়েনি জানিয়ে বলেন, পরবর্তীতে লকডাউন হলেও উৎপাদনে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হচ্ছে না। তবে বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি খারাপ হলে তখন তো প্রভাব পড়বেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
গার্মেন্টস সেক্টরের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য সরকার যেসব পলিসি নিয়েছে তা বাস্তবসম্মত ছিল। এছাড়া পূর্বের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগিয়েছে। অর্থনীতি সচল রাখার জন্য গত দু’বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সামনে একইভাবে এগিয়ে গেলে গার্মেন্টস সেক্টর ধরে রাখা যাবে।
এবার যেভাবে অর্ডার আসছিল, অনেকই ক্যাপাসিটি ফুল, আবার কেউ ওভার বুকিংও করেছিল। আগে তো ক্যাপাসিটির ৫০ ভাগ উৎপাদন করেছি, যেহেতু অর্ডার ওভাবে ছিল না। এখন যদি আবার ক্যাপাসিটি কমিয়ে ফ্যাক্টরি চালাতে হয়, তখন আমরা বেকায়দায় পড়ে যাবো। কারণ আমরা অর্ডার নিয়েছি ফুল ক্যাপাসিটির। আমাদের ধারণা ছিল কভিড—১৯ আমাদের আর ভোগাবে না। এখন করোনার তৃতীয় ঢেউ এর কারণে যদি সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্তের দিকে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই এই সেক্টরে আবার সমস্যা দেখা দিবে।
গার্মেন্টস শিল্প চট্টগ্রাম থেকে হাতছাড়া হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে— বন্দর নগরী হিসেবে বিসনেস হাব চট্টগ্রামে হওয়ার কথা ছিল। সব দিক বিবেচনায় গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে চট্টগ্রামের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল না। ঢাকায় গার্মেন্টস সেক্টর সম্প্রসারণ হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে— ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স এর হেড কোয়ার্টার সব ঢাকায়। আমরা চট্টগ্রামবাসীরা অনেকটা মফস্বলের মত। এসব কারণে কাস্টমারদের ঢাকামুখী হতে হয়েছে। তারা তো আবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসতে চায় না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অবকাটামো ঢাকায়। অন্যদিকে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অবকাঠামো নিয়ে চট্টগ্রামের কোনো পরিকল্পনাই নেই। যে যেখানে জায়গা পেয়েছে সেখানেই ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করেছে।
ঢাকায় গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়নগঞ্জে যেভাবে গার্মেন্টস সেক্টর গড়ে উঠেছে, চট্টগ্রামে সেভাবে হয়নি। বলতে গেলে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ শতাংশ এক্সপোর্ট হয় ঢাকার গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়নগঞ্জ থেকে। এর কারণ হচ্ছে— ওখানে ইউটিলিটি সার্ভিস গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি সার্ভিস পর্যাপ্ত রয়েছে। এছাড়া, জায়গার দামও একটা বড় ফেক্টর। সেখানে এক বিঘা জায়গা পাওয়া যেত ১০ লাখ টাকায়, আরা আমাদের এদিকে ১০ লাখ টাকায় এক কাঠাও পাওয়া যেত না।
ঢাকার আশেপাশে হাজার হাজার বিঘা জায়গা প্রতি বিঘা দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকায় পাওয়া যায়। যাদের বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে, তারা সেখানেই বিনিয়োগ করে। অপর্যাপ্ত জায়গাও চট্টগ্রামে গার্মেন্টস সেক্টর গড়ে না উঠার অন্যতম কারণ। বিনিয়োগকারীরা ১০—১৫ বছর আগে প্ল্যান করে জায়গা নিয়ে বিনিয়োগ করেছে। আমাদের তো জায়গার সংকট রয়েছে। আমরা চাইলেই যেখানে সেখানে জায়গা কিনে ইন্ডাস্ট্রি উন্নত করতে পারিনি।
শুরু থেকে হিসেব করলে প্রায় সাত হাজার গার্মেন্টস চালু ছিল দেশে। বর্তমানে মাত্র তিন হাজারের মত গার্মেন্টস টিকে আছে। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন কারণে এসব গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যায়। ৪০ বছর সময়ে প্রায় চার হাজার গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আবার বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্টসগুলোর মধ্যে অনেকগুলো মাঝেমধ্যে চালু করে। পর্যাপ্ত অর্ডার পেলে তারা উৎপাদন শুরু করে। আবার অর্ডার না পেলে বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় হাজার খানেক এমন ফ্যাক্টরিও বাংলাদেশে আছে।
আসলে বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলো তো ঢাকায়। চট্টগ্রামে তিনশ’র মতো ফ্যাক্টরি বাকি তিন হাজার বা সাড়ে তিন হাজার ফ্যাক্টরি তো ঢাকায়। চট্টগ্রামে গার্মেন্টস সেক্টর টা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।
কালুরঘাটে গার্মেন্টস পল্লী সম্পর্কে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ—সভাপতি
বলেন, কালুরঘাটে গার্মেন্টস পল্লী করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একটা উদ্যোগ নিয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। যথাযথভাবে স্ট্যাডি না করেই সিটি কর্পোরেশন এই উদ্যোগটা নিয়েছিল। সিটি কর্পোরেশনের এক মেয়র যান, অন্য মেয়র আসেন। তারা কেউ এটা নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে পারেননি। পরবর্তীতে, সেখানে সবাই ময়লা—অবর্জনা ফেলে ময়লার স্তূপে পরিণত করেছে।
বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এটা হবে দীর্ঘ মেয়াদী। সেখানে গার্মেন্টসের বিনিয়োগ হতে সময় লাগবে। বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরী আমাদের ভবিষ্যতের জন্য খুব ভালো একটা জায়গা। শ্রমিকদের জন্য ট্রেনিং সেন্টারসহ একটি ইন্ডাস্ট্রিকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই করতে হবে।

লেখক : সাবেক প্রথম সহ—সভাপতি বিজিএমইএ

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট