চট্টগ্রাম বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২

সর্বশেষ:

২৪ জানুয়ারি, ২০২২ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ

নগরীতে গড়ে উঠেনি পার্কিং ব্যবস্থা

নাজিম মুহাম্মদ

বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে স্বাধীনতা পরবর্তী অর্ধশত বছরেও গড়ে উঠেনি পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা। এমনকি প্ল্যান অনুমোদনের সময়ে ভবন নির্মাতা যে পার্কিং স্পেসের ঘোষণা দিয়েছিল, সেগুলোও অনুসরণ করা হয়নি।  উল্টো সেই স্পেসে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক কিংবা সাধারণ ভবন। ওয়ান ইলেভেনের সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার কিছু মার্কেট ও ভবনের অননুমোদিত পার্কিং স্পেসের বাণিজ্যিক স্থাপনা ভেঙ্গে দিয়েছিল।

কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতায় ধীরে ধীরে সেসব পার্কিং স্পেসে পুনরায় স্থাপনা গড়ে ফেলা হয়েছে। পার্কিং জোন করতে দেশ স্বাধীনের আগে  নগরীর বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে দুটি প্লট নির্ধারিত করা হয়েছিলো। স্বাধীনতা পরবর্তী পার্কিংয়ের প্লটে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ভবন।  বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী নগরীতে নিবন্ধনকৃত প্রাইভেট কার মাইক্রোর সংখ্যা ৪০ হাজার। 

নগর পরিবহন মালিক গ্রুপের দেয়া তথ্য অনুযায়ী নগরীতে মোট গণপরিবহনের সংখ্যা ২৫০০। এর বাইরে সিএনজি চালিত নিবন্ধিত ট্যাক্সি ১৩ হাজার। বাস্তবতা হচ্ছে নগরীতে চলাচলরত বাস, হিউম্যান হলার কিংবা সিএনজি চালিত ট্যাক্সির সংখ্যা দ্বিগুণ। সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী নগরীতে চলাচলরত  নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা ৫৩ হাজার ৭৭৪ টি। বাস্তবে রিকশার সঠিক পরিসংখ্যান  কারো জানা নেই।

বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান ট্রাক, প্রাইমমুভার পণ্য পরিবহন মালিক এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি চৌধুরী জাফার আহমেদ জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রীক পণ্য আনা নেয়ার কাজে  কাভার্ডভ্যান, লং ভ্যাহিকেল, প্রাইমমুভার মিলে প্রতিদিন ১০ হাজার যানবাহন নগরীতে অবস্থান করে। এসব যানবাহনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। সড়কেই এসব যানবাহনকে অবস্থান করতে হয়।

গত বছরের নভেম্বর মাসে নগরীর জিইসি মোড় থেকে ষোল শহর দুই নম্বর গেইট  এবং ষোল শহর থেকে প্রবর্ত্তক মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে থাকা ভবনের পার্কিং রয়েছে কি না তা নিয়ে একটি জরিপ চালায় নগর ট্রাফিকের উত্তর বিভাগ।  মূলত সড়কে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণ খুঁজতে গিয়ে ট্রাফিক বিভাগ ছোট পরিসরে এ জরিপ চালায়।  দেখা গেছে, সড়কের পাশে অবস্থিত ৬৬টি ভবনে নিজস্ব পার্কিং নেই। অথচ এসব ভবনের নকশায় পার্কিং রাখার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব ভবনের পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে তা যথাযথ ব্যবহার হচ্ছেনা। বিষয়টি নিয়ে সিডিএকে চিঠিও দিয়েছিলো ট্রাফিক বিভাগ।  কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

নগরীর ব্যস্ততম মোড় নিউমার্কেট। এর মাত্র আড়াইশ মিটার অদূরে অবস্থিত শাহ আমানত সিটি কর্পোরেশন সুপার মার্কেট। নিউ মার্কেট ও শাহ আমানত মার্কেটের মাঝখানে অবস্থিত হকার মার্কেট। নগরের সর্ববৃহৎ খুচরা ও পাইকারি বাজার রিয়াজ উদ্দিন বাজার ও তামাকুম-ি লেইন। ছোট বড় মিলিয়ে রিয়াজউদ্দিন বাজারে ২৫টি মার্কেট রয়েছে।  অথচ সেখানে যানবাহনের কোন পার্কিং ব্যবস্থা নেই। শাহ আমানত মার্কেটের নিচ তলায় পার্র্কিংয়ের স্থানে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে দোকান তৈরি করেছে সিটি কর্পোরেশন। আমতল সিডিএ মার্কেটে পার্কিং জোনে তৈরি করা হয়েছে দোকান।

সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, সবার জন্য পার্কিং ব্যবস্থা করা সিডিএর দায়িত্ব।

পাকিস্তান আমলেই আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় সিংগাপুর মার্কেট আার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ভবন যে জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে দুটি প্লটে  পার্কিংয়ের জন্য চিহ্নিত করা ছিল। কিন্তু সেখানে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যদিওবা ভবনটি নির্মাণের সময় চেম্বার বলেছিল বাইরের লোকজন চাইলে সেখানে গাড়ি পার্কিং করতে পারবে।  বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বিধিমালা অনুযায়ী যতটুকু পার্কিংয়ের চাহিদা আমরা তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু সেটাও কেউ রাখে  না। চাহিদা অনুয়ায়ী নগরীতে পার্কিংয়ের সংখ্যা কম। একটি ভবন নকশা অনুমোদনের সময় যতুটুকু পার্কিং রাখার কথা বলা হয় তা অনেকেই রাখে না। পার্কিংয়ের নির্ধারিত প্লট তা যথাযথ ব্যবহার হয়নি।

চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হয়। বলা হয় বন্দর নগরী। সেই রকম একটি শহরে পার্কিংয়ের প্লট নেই অথচ পাকিস্তান আমলে যখন দরকার ছিলো না তখন রাখা হয়েছিলো। বর্তমানে যেখানে পার্কিং প্লট বাড়ানোর কথা সেখানে অন্য কাজে ব্যবহার করা হলো।

মার্কেটগুলোতে পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীন বলেন, কোন মার্কেট পার্কিং ছাড়া করার চিন্তা করা  যায় না। লালদিঘি মহল মার্কেটের পাশে খালি প্লটটি আমরা চেয়েছিলাম পার্কিং জোন করার। কিন্তু আইনি জটিতলায় তা আমরা নিতে পারিনি। নিউ মার্কেটের লিফট পার্কিং লোকজন ব্যবহার করতে চায় না। সেখানে পার্কিং করলে পয়সা দিতে হয়। আসলে পে-পার্কিংয়ে লোকজন গাড়ি রাখতে চায় না।

মূলকথা হলো পার্কিংয়ের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সিডিএর। বিধি অনুযায়ী পার্কিং অপ্রতুল। দ্রুত বর্ধনশীল একটি শহরে পার্কিংয়ের জন্য কোন জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। মার্কেটগুলোতে প্রত্যেক ফ্লোরে র‌্যাম করে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। থাইল্যান্ডে প্রত্যেক মার্কেটে প্রতিটি  ফ্লোরে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। বিধি অনুযায়ী পার্কিং চাহিদা আরো বাড়াতে হবে।

নগর ট্রা্িরফকের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার নাসির উদ্দিন বলেন, ট্রাফিক বিভাগ থেকে একাধিকবার সিডিএকে চিঠি দেয়া হয়েছে। রিয়াজ উদ্দিন বাজার নিউ মার্কেট এলাকা, হাসপাতাল, প্রাইভেট ক্লিনিক কারো নিজস্ব পার্কিং নেই। নগরীতে যে পরিমাণ যানবাহন এবং জনসমাগম সে তুলনায় পার্কিং খুবই অপ্রতুল। রিয়াজ উদ্দিন বাজার থেকে জুবলি রোড পর্যন্ত মার্কেটগুলোর কোন পার্কিং নেই। সেখানে কেনাকাটা করতে আসা সব যানবাহন সড়কের উপরে পার্কিং করা হয়। বন্দরের লং ভ্যাহিকেলগুলো বন্দর থেকে সিটি গেইট পর্যন্ত সড়কেই পার্কিং করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে সারাদেশে বাস ছেড়ে যায়। অথচ ফলমণ্ডি, গরিব উল্লাহ শাহ মাজার, সিনেমা প্যালেস, কর্ণফুলী শাহ আমান সেতু গোলচত্বর  এলাকায় বাসের কাউন্টার আছে কিন্তু কোন যানবহান মালিকের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নেই। সড়কেই যাত্রী উঠানামা করছে। এ শহরে কোন বড় টার্মিনাল নেই। নাসিরাবাদ, কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে নিজস্ব কোন টার্মিনাল নেই। শহরের দুই প্রান্তে দুটি বড় ধরনের টার্মিনাল থাকা খুবই জরুরি। পার্কিংয়ের স্থান নির্ধারণ করা ট্রাফিকের পক্ষে সম্ভব নয়। পার্কিংয়ের বিষয়টি সমাধান করা ট্রাফিক বিভাগ একার পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া ফুটপাতগুলো বেদখল হয়ে আছে। হকার উচ্ছেদ করা ট্রাফিকের কাজ নয়। সমন্বিত উদ্যোগ না হলে সবার জন্য পার্কিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

 

 

পার্কিং সমস্যা চিহ্নিত করতে মেগা প্রকল্প নিতে হবে

স্বপন কুমার পালিত

অধ্যাপক, পুরোকৌশল বিভাগ, চুয়েট

কোথায় কি সমস্যা আগে চিহ্নিত করতে হবে। মোড়গুলোতে যানবাহন পার্কিং বন্ধ করতে হবে। যেখানে ফুটওভার ব্রিজ প্রয়োজন সেখানে করা হয়নি। আমাদের আগে চিহ্নিত করতে হবে কতগুলো গাড়ি অনিবন্ধিত রয়েছে। একে তো আমাদের পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। নগরীতে চলাচলরত ৫০ শতাংশ গাড়ি নিবন্ধিত থাকলে অনিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা রয়েছে আরো ৫০ শতাংশ। আমাদের ব্যবস্থাপনা দুর্র্বল। ফুটপাত দখল করে রেখেছে দোকানদার আর হকাররা। ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানবাহন পার্কিং করা হচ্ছে। যেমন-জিইসির মোড়, সিরাজউদ্দৌল্লাহ রোড, আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট এলাকায় অর্ধেকের বেশি রাস্তা গাড়ি পার্কিং আর হকার দখল করে আছে।

অথচ নিউ মার্কেটের সামনে ফোর লেনের সমান সড়ক রয়েছে। অক্সিজেন মোড়ের অবস্থা খুবই খারাপ। একটি ভবন করলে কমার্শিয়াল হোক আর আবাসিক হোক পার্কিং ব্যবস্থা রাখার নিয়ম রয়েছে। পার্কিং মূলত দুই ধরনের অন স্ট্রিট আর অফ স্ট্রিট। অফ স্ট্রিট পার্কিং ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশন আর সিডিএর। ভবন তৈরি করার সময় ডিজাইন সেভাবে করতে হবে। এখনো কিছু স্থান রয়েছে সীমিত পর্যায়ে অন স্ট্রিট পার্কিং করা যায়। যারা ভবন তৈরি করে তাদের ভবনের আয়তন অনুসারে পার্কিং রাখার নিয়ম রয়েছে। তা কিন্তু হচ্ছে না। ট্রাফিক জ্যামের প্রধান কারণ হচ্ছে অবৈধ পার্কিং। একটি মোড়ে যেখানে যানবাহন নির্বিঘ্নে যাতায়াত করবে সেখানে যানবাহান দাঁড়িয়ে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ একার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। আয়তন অনুসারে নগরীর জনসংখ্যা বেশি। যে জায়গায় ফুট ওভারব্রিজ থাকার কথা সেখানে নেই। যেমন- জিইসির মোড়ে একটি ফুট ওভার ব্রিজ খুবই জরুরি।

মুরাদপুরের ফুটওভার ব্রিজ মানুষ ব্যবহার করছে। আন্দরকিল্লা মোড়ে যানবাহন বেশি নেই। অবৈধ দখলে থাকে এলাকাটি। যেদিকে যাবেন সেদিকে অবৈধ দখল। কাজির দেউড়ি মোড় নিয়ে আমরা একটু কাজ করছি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তা হলে যানজট থাকার কথা নয়। মানুষকে সচেতন হতে হবে। আমরা নিজের সুবিধা আগে দেখি। পার্কিংয়ের বিষয়টি মেগা প্রকল্প হিসাবে নিতে হবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। মোড়গুলোতে কোথায় কি সমস্যা হচ্ছে তা চিহ্নিত করতে হবে। মোড়ে গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে হবে। যেখানে সড়ক প্রশস্ত রয়েছে সেখানে কিছু অন স্ট্রিট পার্কিং করা  যেতে হবে। ফ্লাইওভারের নিচে কিছু কিছু জায়গায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে- তবে সব স্থানে নয়। সিডিএ-সিটি কর্পোরেশন ও সিএমপি সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পার্কিং ব্যবস্থার কিছুটা হয়তো সমাধান আসতে পারে।

 

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট