চট্টগ্রাম বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ | ১:১৭ অপরাহ্ণ

হুমকির মুখে গুলিয়াখালী বিচ!

ইমাম হোসাইন রাজু

 

একেতো সাগর থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ, অন্যদিকে কৃষিজমি ভরাটের বিষয়েও রয়েছে নানান বাধ্যবাধকতাও। কিন্তু আইনি তোয়াক্কা না করেই দেদারসে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সাগরের সীতাকুণ্ডের অংশে। অতিসম্প্রতি যে এলাকাকে পর্যটন ঘোষিত এলাকা হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু বেড়িবাঁধ কেটে সাগর থেকে ড্রেজার লাগিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে সাগরে আরও দ্রুত বিলীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে পর্যটন এলাকাসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। জনবসতিও রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বেআইনিভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ‘গুলিয়াখালী’ বিচ ধ্বংস হচ্ছে।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাগর থেকে নিষিদ্ধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করলেও এ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানিয়েছেন খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক। অন্যদিকে, পরিবেশ ও বনাঞ্চল এবং জনবসতি রক্ষায় ভূমি, পরিবেশ অধিদপ্তরের সচিব এবং মহাপরিচালকসহ ১৫ জনকে আইনি নোটিশ দিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সংগঠনের আইনজীবী প্রেরিত আইনি নোটিশে উল্লেখ করেছেন, আলোচ্য বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে মামলা করতে বাধ্য হবেন তাঁরা। বেলা সূত্র জানায়, সীতাকুণ্ড উপজেলার ৪ নম্বর বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর মাহমুদাবাদ ও মান্দারীটোলা এলাকার বেড়ি বাঁধ কেটে ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান পাইপ দিয়ে সাগর থেকে ‘অবৈধভাবে’ বালু উত্তোলন করে পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিতে ফেলছে। বালু উত্তোলনের কারণে নিকটবর্তী ৪ নম্বর মুরাদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ‘গুলিয়াখালী’ বিচ ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া বালু উত্তোলনের কারণে তীরবর্তী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্তের পাশাপাশি বন বিভাগের ম্যানগ্রোভ বনায়ন প্রকল্পও হুমকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি পরিদর্শন করে আলোচ্য অভিযোগের বিষয়ে সত্যতাও পায় বেলা। বেলা’র কর্মকর্তাগণ জানান, প্রায় ৯ একর কৃষিজমির উপর ১৪ ফুট উঁচু বাঁধ দিয়ে বালু ফেলে জমিগুলো ভরাট করা হয়েছে। ভয়ানক ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছে এলাকার প্রায় ২০ একর কৃষিজমি। অরক্ষিত হয়ে পড়েছে বেড়ি বাঁধ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যেকোন সময় বেড়ি বাঁধটি ভেঙে সাগরের নোনা পানিতে প্লাবিত হবে উল্লেখিত এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও জনবসতি। কিন্তু এ বিষয়ে ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়াম কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয়রা শরণাপন্ন হলেও বন্ধ হয়নি বালু উত্তোলন।
এদিকে, গতকাল সোমবার বেলা’র আইনজীবী এডভোকেট এস. হাসানুল বান্না স্বাক্ষরিত আইনি নোটিশে বলা হয়, ‘দেশে প্রচলিত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করে নিষিদ্ধ স্থানে ও নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন বন্ধ না করা আইন বাস্তবায়ন বা প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে আপনার ব্যর্থতার পরিচায়ক। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) অত্র নোটিশের মাধ্যমে নোটিশ গ্রহীতা কর্তৃপক্ষ বালু উত্তোলন বন্ধে ও ভরাটকৃত বালু অপসারণপূর্বক তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছে। একই সাথে উল্লেখিত এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, জনবসতি, বেড়িবাঁধ ও গুলিয়াখালী বিচ রক্ষা ও সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছে। সেইসাথে অনুমোদিত এ বালু উত্তোলনের সহিত জড়িত প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে শাস্তি প্রদানের দাবি জানাচ্ছে।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পূর্বকোণকে বলেন, ‘সমুদ্র থেকে বালু তোলার কোন নিয়ম নাই। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নীরবতার কারণে যে যেভাবে পারছে বালু উত্তোলন করছে। এমনিতেই বালুমহালগুলোর বাইরে গিয়েও বালু তুলে নদীগুলো নষ্ট করছে। এবার কী সাগরও শেষ করবে? তাতো কোন ভাবেই হয় না। এসব কাজ যদি এখানেই না থামানো হয়, তাহলে অন্যরাও সমুদ্র থেকে বালু তোলা শুরু করে দিবে। তাতে পরিবেশ যেমন ধ্বংস হবে তেমনি বালু তোলা নিয়ন্ত্রণ করাও অসম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বাধ্য হয়ে আইনি নোটিশ দিয়েছি। যাতে করে কর্তৃপক্ষ এটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। যদি নোটিশের পরও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা মামলা করতে বাধ্য হবো। জবাবদিহিতা না থাকায় অপশক্তিরাই শক্তিশালী হয়ে যাচ্ছে।’
বালু উত্তোলন এবং নোটিশ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মফিদুল আলম বলেন, ‘এ সংক্রান্ত কোন আইনি এখনও পাইনি। বালু উত্তোলনের ব্যাপারেও আমি অবহিত নই।’
যাদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে : ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান, প্রধান বন সংরক্ষক, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক, পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সীতাকুণ্ড রেঞ্জের উপকূলীয় বন বিভাগের রেঞ্চ অফিসার, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ক্যাপিটাল পেট্রোলিয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

 

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট