চট্টগ্রাম রবিবার, ২২ মে, ২০২২

সর্বশেষ:

১৭ জানুয়ারি, ২০২২ | ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

মহাসড়কে ডাকাতি মামলা নিতে অনীহা পুলিশের

নাজিম মুহাম্মদ 

ডাকাতের পিটুনিতে মারা যায় দুবাই প্রবাসী হোসেন মাস্টার। হোসেন মাস্টারকে যাত্রীবেশে মাইক্রোবাসে তোলা হয়েছিলো পাহাড়তলি থানার অলংকার মোড় থেকে। আহত অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়েছিলো চৌদ্দগ্রাম থানার বাতনিয়া বাজার এলাকায়। তাকে উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ। বাবা হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে দশদিন ঘুরলেও চৌদ্দগ্রাম থানা মামলা নেয়নি। হোসেন মাস্টার মারা যাবার বিষয়টি কাগজে—কলমে চৌদ্দগ্রাম থানাকে অবহিত করেছিলো লাশের সুরতহালকারি নগরীর পাচলাইশ থানা পুলিশ। এমনকি পাহাড়তলি থানাকে বিষয়টি জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। ঘটনার দশদিন পর হোসেন মাস্টারের ছেলে মঞ্জুর হোসেনের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পর মামলা নেয় পাহাড়তলি থানা। আর মামলা নেয়ার দশদিনের মাথায় ধরা পড়ে ডাকাত দলের ছয় সদস্য। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়স আবুল কালামের। ২০১৩ সালে খুলনার খালিশপুরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্বর্ণের দোকান লুটের মূলহোতা। ২০১৪ সালে নগরীর কোতোয়ালি থানা এলাকায় একই কায়দায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্বর্ণের দোকান ডাকাতি করে পালানোর সময় আহত অবস্থায় ধরা পড়েছিলো পুলিশের হাতে। পনেরো বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে বরগুনার পাথরঘাটার কালাম। পঞ্চাশোর্ধ মিজানুর রহমান প্রকাশ চাঁন মিয়া। তার বাড়িও বরগুনায়। পেশাদার এ ডাকাতের সাথে কালামের দীর্ঘদিনের সখ্যতা। বয়স বাড়লেও ডাকাতির পেশা কোনমতেই ছাড়তে পারছিলো না। অবশেষে দু’ জনে মিলে গঠন করে নিজস্ব গ্রুপ। ডাকাতি করতে বেছে নেয় ঢাকা—চট্টগ্রাম মহাসড়কের তেরো স্থান। যাত্রীবেশে সপ্তাহে তিনদিন ডাকাতি করতো ওরা। অথচ হাইওয়ে পুলিশ ও কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার টহল পুলিশ কারো নজরে বিষয়টি ধরা পড়েনি। ভুক্তভোগিরা থানায় গিয়ে অভিযোগ করলেও তা খুব বেশি গুরুত্বের সাথে নেয়নি সংশ্লিষ্ট থানা। বার বার ডাকাতি করার পরও কোন থানায় মামলা না হওয়ায় ডাকাতদল উৎসাহিত হয়েছে বৈকি। জোরারগঞ্জের বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী হোসেন মাস্টারের কাছ থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার কেড়ে নিয়ে পিটিয়ে আহত করে মাইক্রোবাস থেকে ফেলে দেয় চৌদ্দগ্রাম থানার বাতনিয়া বাজারের পাশে। পরদিন (২০ ডিসেম্বর) মারা যায় হোসেন মাস্টার।
ঘটনার দশদিনেও মামলা না নেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চৌদ্দগ্রাম থানার পরিদর্শক শুভ রঞ্জন চাকমা জানান, হোসেন মাস্টারকে আহত অবস্থায় আমরা উদ্ধার করেছিলাম। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। নিহত হোসেন মাস্টারের ছেলে মঞ্জুর হোসেনের দাবি— তিনি একাধিকবার গেলেও চৌদ্দগ্রাম থানা তাকে কোন ধরনের সহযোগিতা করেনি। এ প্রসঙ্গে ওসি শুভ রঞ্জন বলেন, মনে হয় একবার এসেছিলো। এলাকায় নির্বাচন থাকায় তাকে পরে আসতে বলেছিলাম।
হোসেন মাস্টার মারা যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার সুরতহাল করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (ওসি) জাহেদুল কবির জানান, নিয়ম অনুযায়ী সূরতহাল করার পর চৌদ্দগ্রাম থানাকে বিষয়টি আমরা অবহিত করেছি।
দশদিন পর মামলা নেয়া প্রসঙ্গে পাহাড়তলি থানার ওসি মোস্তফিজুর রহমান জানান, নিহত হোসেন মাস্টারের ছেলে থানায় এসে বিষয়টি জানানোর সাথে সাথে আমরা মামলা নিয়েছি। এর আগে বিষয়টি আমরা জানতাম না। আহত হোসেন মাস্টারকে উদ্ধার করেছে চৌদ্দগ্রাম থানা। তারাও আমাদেরকে বিষয়টি অবহিত করেনি।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার শুরু এবং শেষ। সংশ্লিষ্ট দুই থানায় মামলা হতে পারে। হোসেন মাস্টারকে যেহেতু চৌদ্দগ্রাম থানা উদ্ধার করেছে। তাদের মামলা নিতে আইনগত কোন সমস্যা নেই। এমনকি কোন ঘটনায় বাদী পাওয়া না গেলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা নিতে পারে। চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশ বিষয়টি হয়তো গুরুত্ব দেয়নি।
মহাসড়কে ১২ স্থানে ডাকাতি : পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডাকাত দলের নেতা আবুল কালাম জানায়, মহাসড়কের ১৩ স্থানকে তারা ডাকাতির নিরাপদ এলাকা হিসাবে বেছে নিয়েছে। তা হলো— চট্টগ্রাম মহানগরের অলংকার থেকে সিটি গেইট, সীতাকুণ্ড, জোরারগঞ্জ, মীরসরাই, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, কাঁচপুর, দাউদকান্দি, মনদপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও গাজিপুর। ওই সড়কে যানজট কম। টানা গাড়ি চালানো যায়। এ সুযোগে যাত্রীবেশে তোলা লোকজনের কাছ থেকে সর্বস্ব কেড়ে নেয়া যায়। টার্গেট করে সপ্তাহে তিনদিন দুটি মাইক্রোবাস নিয়ে বের হয় তারা। দুপুরের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সড়কে ঘুরে ঘুরে যাত্রীবেশে ডাকাতি করে ওরা। তারা কখনো এক হোটেলে থাকতো না এমনিট জানিয়ে কালাম বলেছে— এক হোটেলে থাকলে ধরা পড়লে সবাই একসাথেই পড়বে। তাই একেকজন একেক জায়গায় থাকতো। শুধুমাত্র কাজের সময় এক জায়গায় জড়ো হতো।

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট