চট্টগ্রাম শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ | ২:২৯ অপরাহ্ণ

নওশের আলী খান

‘তোমরা এগুলো দেখ না?’

২০০৫ সালের শেষ দিকের ঘটনা। তারিখটা মনে নেই। বিকেল ৫টায় রাউজানে একটি অনুষ্ঠান হবে। সেখানে প্রধান অতিথি দৈনিক পূর্বকোণের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী।

৩টায় পূর্বকোণ থেকে নিজের কার নিয়ে রাউজানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন তিনি। রিপোর্টার হিসাবে আমি (তখন স্টাফ রিপোর্টার) এবং চিত্র সাংবাদিক হাবিবুর রব মাসুম। গাড়ির সামনের সিটে মাসুম। আমি ও মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী পিছনে। হাটহাজারী অতিক্রমের পর তিনি আমাকে ইশারা করে মাসুমকে দেখিয়ে দিলেন। আমি কিছু বুঝলাম না। জানতে চাইলাম, কি ব্যাপার।

মাসুম দীর্ঘক্ষণ ধরে মোবাইল ফোনে কার সাথে খুব নিচু স্বরে আলাপ করছে। আরো কিছুদূর যাবার পর মাসুমের কথা বলা শেষ হলে ইউসুফ চৌধুরী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতক্ষণ ধরি কার লয় কথা হদ্দে’। চাইছ উল্ডা-পাল্ডা ন গরিছ’। ( এতক্ষণ ধরে কার সাথে কথা বলছ, দেখিস উল্টা-পাল্টা করিস না) পূর্বকোণের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীকে দেখতে রাশভারী লোক মনে হলেও তাঁর মাঝে রসবোধও কম ছিল না।

পথে গহিরার পর বড়পুলের উত্তর পাশের জমিগুলোতে চাষাবাদের চিহ্ন না দেখে তিনি বললেন, ‘তোয়াঁরা এগিন ন দেখ! এখনত জবিনত ধানর চারা থাকিবার কথা! চাষ নঅর লেখ না! চাষবাস ন অইলে কীভাবে দেশ চলিবো’। (তোমরা এগুলো দেখ না, এখনতো জমিতে ধানের চারা থাকার কথা, চাষবাদ নাহলে দেশ চলবে কেমন করে।) তিনি নির্দেশ দিলেন সরেজমিন দেখে রিপোর্ট করার জন্য। অসংলগ্ন কিছু দেখলেই তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতেন। বিশেষ করে কৃষিসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

আরেক দিনের ঘটনা। বিকেল ৫টার পর তিনি পূর্বকোণ কার্যালয়ের সামনে একটি টুলের উপর লাঠি ধরে বসে থাকতেন। রিপোর্টাররা এবং সাব এডিটররা কখন অফিসে আসে, তা পর্যবেক্ষণ করতেন। আমি একদিন ৬টার পর অফিসে ঢুকছিলাম। তিনি আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু কিছু বলছেন না। আমি বুঝতে পারলাম, দেরির জন্য তাঁর এই তাকানো। আমি তাঁর সামনে গিয়ে বললাম, এসাইনমেন্ট থেকে আসছি। তিনি বললেন, ‘আঁই তোয়াঁরে কিছু কইর না!’ ইউসুফ চৌধুরী সময়ের প্রতি ছিলেন অসম্ভব যত্নবান। তিনি নিজেও এক মিনিট দেরি করতেন না। কেউ করলে সহ্য করতেন না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির তিনি ছিলেন সভাপতি। জনমত সৃষ্টির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে চলছিল উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সভা। সভার সময় সন্ধ্যা ৭টা হলে তিনি আধঘণ্টা আগে সভাস্থলে পৌঁছে যেতেন। এ ধরনের একটি সভার নির্ধারিত সময় ছিল সন্ধ্যা ৭টা। ইউসুফ চৌধুরী যথাসময়ে পৌঁছে দেখেন লোক আছে মাত্র ৫ জন। তিনি নিজে, পূর্বকোণের তখনকার রিপোর্টার আলমগীর সবুজ ও পূর্বকোণের একজন চিত্র সাংবাদিকসহ মোট ৮ জন। ইউসুফ চৌধুরী নির্দেশ দিলেন সভা শুরু করার জন্য। প্রথমে বক্তৃতা দেয়ার জন্য নাম ঘোষণা করা হলো সাংবাদিক আলমগীর সবুজের। বেচারা গেছে এসাইনমেন্টে। এখন দিতে হচ্ছে বক্তৃতা। যাক কিছু কথা বলে কোনরকমে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। অফিসে এসে রিপোর্টে আলমগীর সবুজ তার এই দুঃখের বর্ণনা দেন। এখানে বিষয়টা হচ্ছে, মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী সময়টাকে গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারিত সময়ের সভা নির্ধারিত সময়ে শুরু করেছিলেন। যাতে অন্যরা শিক্ষা নেয়। এছাড়া পূর্বকোণের রিপোর্টারদের সাপ্তাহিক মিটিংয়ে কেউ একটু দেরি করলেই তিনি রেগে যেতেন।

তাঁকে আমরা একদিনও বিলম্ব করতে দেখিনি। যা আমাদের নিজেদের জন্যেও শিক্ষা হয়ে গিয়েছিল। এই বিরল ব্যক্তির সাথে আমার এবং আমাদের পূর্বকোণের সবার রয়েছে বহু স্মৃতি। কোনটা রেখে যে কোনটা বলি, তা নির্ধারণ করাটা কষ্টসাধ্য। আমি এই মহান পুরুষকে ব্যথিত চিত্তে স্মরণ করছি, জন্মদিনে জানাচ্ছি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা।

লেখক:  বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সিটি এডিটর, দৈনিক পূর্বকোণ

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 179 People

সম্পর্কিত পোস্ট