চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, ২০২১

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ | ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ

মুনির হাসান

জন্মশতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

ইউসুফ চৌধুরীর কর্মময় জীবনের শিক্ষা

চট্টলদরদী অনন্য উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীর আজ জন্মশতবার্ষিকী। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ঢেউয়াপাড়া হাজিবাড়িতে তাঁর জন্ম। আমার দাদি নাছিমা খাতুন ছিলেন তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন। ভাইদের মধ্যে ইউসুফ চৌধুরী ছিলেন মেজো। এ কারণে আমরা তাকে মেজো দাদা বলতাম।

গত ৭ সেপ্টেম্বর ছিল মেজো দাদার ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী। সেদিন তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের নানা আখ্যান এই পত্রিকায় তুলে ধরেছি। ক’দিন ধরে ভাবছিলাম জন্মশতবর্ষে মেজোদাদার কোন বিষয়গুলো সামনে আনা দরকার। তারপরই মনে হলো তার কর্মময় জীবনের কিছু শিক্ষা যদি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা যায়। এই লেখাটি তাই মেজোদাদার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি।রাউজান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চট্টগ্রাম শহরে এসে প্রথমে অরিয়েন্ট স্টোরের সূচনা করলেও সেটি কিন্তু আগালো না। তার আগে রাউজানের ফকিরহাটে ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরিও কিন্তু হয়নি। তারপর তিনি জুবিলী রোডে একটি পত্র-পত্রিকার দোকান নেন। কিন্তু খুব একটা জমানো যায় নি। খবর পেয়ে কলকাতায় যান দৈনিক আজাদের এজেন্সি নিতে। সেটিও হয়নি। অন্য অনেকের মতো ফিরে এসে হতোদ্যম হলেন না। বরং বেঁচে যাওয়া টাকা দিয়ে নিরুৎসাহী পার্টনারের অংশ কিনে নিলেন এবং পাশের টেইলারিং শপটিও নিজের দোকানে যুক্ত করলেন। জন্ম হলো নিউজফ্রন্টের।

এই সময়টাতে কোলকাতায় জয়তি ছেড়ে চট্টগ্রামে ফিরে এসেছেন বেঙ্গল শিপিং-এর আবদুল বারী চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ জামাতা আবুল কাশেম খান। প্রতিষ্ঠা করেছেন ম্যাচ ফ্যাক্টরি। এই সময় চট্টগ্রামে তৈরি হচ্ছে একদল নতুন ব্যবসায়িক নেতৃত্ব যারা কিছু একটা করতে চান। ইউসুফ চৌধুরী ভাবলেন এই নতুন ‘ইনটেলেকচুয়ালদের’ দরকার বই, বই আর বই। জুবিলী রোডের নিউজফ্রন্ট হয়ে উঠে একদল নতুন যুগের সূচনাকারীদের প্রাণের আড্ডাস্থল ও জ্ঞানতৃষ্ণা মেটানোর জায়গা। নিজের ১৯৪৯ সালে ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব পাকিস্তানের এজেন্সি দিয়ে শুরু করে খুব অল্পদিনেই পাকিস্তানি পত্রিকা, ম্যাগাজিন এবং ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়াও তার ঝুলিতে যুক্ত হয়। নিউজফ্রন্ট পরে ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে স্থানান্তরিত হয়।

১৯৫৩ সালে এ কে খান প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল কটন মিল। সে সময় লক্ষ্য করেন ব্যাংকগুলো পূর্ব পাকিস্তানের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয় না। পরে যখন তিনি শিল্পমন্ত্রী হলেন তখন একটি শিল্পনীতি করলেন। সে সময় শিল্পব্যাংকের প্রতিষ্ঠাও হলো। ১৯৫৪ সালে মেজোদাদা একটি মাত্র ট্রেডল মেশিন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সিগনেট প্রেস। শিল্পব্যাংকের ঋণ নিয়ে পরে এটি সিগনেট প্রেস এন্ড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার পর আবারও সিগনেট প্রেস আর নিউজফ্রন্ট দিয়ে শুরু করেন। কিন্তু উদ্যোগ নিয়েও প্রভাতী নামের দৈনিকটি আর প্রকাশ করেননি। দৈনিক পূর্বকোণ নামে তাঁর স্বপ্নের দৈনিকটি যাত্রা শুরু করে ১৯৮৬ সালে। এরপর তিনি ইউনাইটেড ফার্মা অধিগ্রহণ করেন, প্রতিষ্ঠা করেন সুপার ডেইরি ও সিগনেট বক্স। পরে তার সব প্রতিষ্ঠান মিলে তৈরি হয় পূর্বকোণ গ্রুপ। ইউসুফ চোধুরীর কর্মময় জীবন থেকে নিচের কয়েকটি বিষয় আমরা আলাদা করে নিতে পারি।

পড়ো, পড়ো, পড়ো : মেজোদাদা পকেটে এ টি দেবের একটি পকেট ডিকশনারি রাখতেন। নিউজ ফ্রন্টের জন্য এজেন্সিশিপ পাওয়ার করেসপন্ডেস নিজেই করতেন। জানতেন, বড় হতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। দৈনিক পূর্বকোণের ক্রীড়া সাংবাদিকরা স্মরণ করতে পারবেন ইন্টারনেটবিহীন দিনগুলিতে খেলাধুলা নিয়ে তাঁর আগ্রহ ও জানাশোনা তাদেরকে কীভাবে সহায়তা করতো রিপোর্টিং কিংবা ফিচার লিখতে। শেষ বয়স পর্যন্ত একাধিক বাংলা, ইংরেজি পত্রিকা ও ম্যাগাজিন নিয়মিত পড়েছেন।

নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দূরদৃষ্টি : ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরি বা অরিয়েন্ট স্টোর কিন্তু চললো না। এমনকি কোলকাতায় সশরীরের হাজির হয়েও পেলেন না দৈনিক আজাদের এজেন্সি। অন্য কেউ হলে বিকল্প ভাবতেন। কিন্তু তিনি তার এজেন্সি ব্যবসাকে বড় করলেন, নতুন জায়গা ভাড়া নিলেন! কেন? কারণ ১৯৪৭-৪৮ সালে তিনি জানতেন চট্টগ্রামের লোকদের সামনে অনেক কিছু করতে হবে। আর সেজন্য পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বইয়ের কোন বিকল্প নেই। উনি মাটি কামড়ে সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।

কেবল আইডিয়া নয়, সমস্যার সমাধান : দৈনিক পূর্বকোণ প্রকাশের কথা ধরা যাক। তখনতো চট্টগ্রামে স্থানীয় পত্রিকা ছিলই। তাহলে কেন নতুন একটা দৈনিক? তিনি দুইটি সমস্যা দেখেছেন। এক. সে সময়কার স্থানীয় দৈনিকগুলো ছিল ম্যাড় ম্যাড়ে ছাপা, ঝকঝকে নয়। দুই নম্বর হলো তখন আমাদের বাসার মতো সব বাসাতেই দুইটি দৈনিক রাখা হতো। একটি চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক, অন্যটি ঢাকার জাতীয় দৈনিক। তিনি তাই করতে চাইলেন চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় দৈনিক এবং ঝকঝকে ছাপা। দ্বিতীয়টির জন্য সেটআপ করতে হলো ফটো টাইপসেটিং। আমি যতদূর জানি ফটো টাইপসেটিং-এ বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা হলো পূর্বকোণ। আর ঢাকায় আলাদা অফিস ও সংবাদকর্মী নিয়োগ দিয়ে তিনি প্রথম সমস্যারও সমাধান করে ফেললেন। দৈনিক পূর্বকোণ হলো চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক, স্থানীয় দৈনিক নয়!

লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট এন্ড ফ্রম দ্যা ব্যাক : মেজোদাদার সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল লক্ষণীয়। পূর্বকোণ প্রকাশের অল্প কিছুদিনের মধ্যে তিনি কেবল সেরা সংবাদ কর্মীদের জড়ো করেন নি, চট্টগ্রামের ইনটেলেকচুয়ালদের জড়ো করেন পূর্বকোণে লেখার জন্য। এই সময় ঢাকার দৈনিকগুলোতে তিনি খেয়াল রাখতেন চট্টগ্রামে কে কে কলাম লেখেন। অবধারিতভাবে তাকে পূর্বকোণে লেখার জন্য অনুরোধ করতেন।
ঠিক একই কাজ করেছেন ডেইরি আন্দোলনের সময়। ঠিক ঠিক লোকগুলোকে জড়ো করেন। সবসময় পেছনে থেকে নেপথ্যে কাজ করতেন তা নয়। যখনই মনে করতেন তাঁকে সামনে থাকতে হবে তখন তাই করতেন। মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে তাই আমরা দেখি তিনি ড. আবদুল করিমের নাগরিক শোক সভা কমিটির আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন।

কর্মীদের পাশে : নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের খোঁজ খবর রাখতেন নিয়মিত। বৃদ্ধ বয়সে রোড এক্সিডেন্ট করা কর্মীর সকল দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি লাঠিতে ভর দিয়ে তার বাসায় হাজির হয়েছেন। চট্টগ্রামের দৈনিকগুলো লেখার জন্য সে সময় সম্মানী দিতো না। পূর্বকোণ সেটা দেওয়া শুরু করে, ক্যাশ। চট্টগ্রাম মহসিন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ফজলুল হক সাহেব ক্যাশ নিতেন না বলে তাকে চেকে সম্মানী দেওয়ার প্রথা শুরু করেন। ফজলুল হক স্যার লিখেছেন, ‘দেখা হলে চৌধুরী সাহেব প্রথমেই জিজ্ঞাসা করতেন-চেক ফাইয়্যুন নে (চেক পেয়েছেন তো)’? পাকিস্তান আমলে পত্রিকার হকারদের মধ্যে ২০ জনকে সাইকেল কিনে দিয়েছেন। এসবের মূলমন্ত্র ছিল একটা-কর্মীরা ভাল থাকলে প্রতিষ্ঠানও ভাল থাকবে।

ব্লু-ওশন স্ট্র্যাটেজি : দৈনিক পূর্বকোণ প্রকাশের সময় তিনি ঢাকার বা চট্টগ্রামের পত্রিকার সঙ্গে সার্কুলেশনের লড়াইতে নামেননি। বরং চেষ্টা করেছেন সেসব জায়গাতে, দুর্গম এলাকাতে পত্রিকা পৌঁছে দিয়ে নতুন পাঠক তৈরি করার। একই কাজ করেছেন সুপার ডেইরির ভোক্তা তৈরিতেও। এতে কেবল পূর্বকোণের লাভ হয়েছে তা নয়, অন্যরাও এই সুফল পেয়েছে।

লাগসই উন্নয়ন (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট) : মেজোদাদার এই বিশেষ গুণটি আমি খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করি। চট্টগ্রামের লোকদের পুষ্টি সমস্যার সমাধানের জন্য সুপার ডেইরির জন্ম। সেটাকে আধুনিক করার জন্য টেকনিক্যাল লোক তিনি বাইরে থেকে আনতে পারতেন, কারণ তাঁর সেই সামর্থ ছিল। কিন্তু করলেন কী ? দেশের ৫০% লোক কোন না কোনভাবে পশু সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু সেটা নিয়ে দেশে কোন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় নেই। সমাধান সহজ, চট্টগ্রামে ভেটেরিনারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা। সেই আন্দোলনে সংশ্লিষ্টদের কেবল যুক্ত করে নিজের দায়িত্বই শেষ করেননি। বরং সামনে থেকে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে মিছিলের পুরোভাগে তাকে দেখে আমি খুবই অবাক হতাম। এসি রুম ছেড়ে কেন তিনি মিছিল করছেন? ওই যে লাগসই উন্নয়নের ধারণা, সেটাই তাঁর চালিকা শক্তির অন্যতম ছিল।

পরিবারের শক্তি : হালের অনেক উদ্যোক্তা তাদের পরিবারকে বোঝাতে পারেন না। কিন্তু মেজোদাদা জানতেন দুইটি বাড়তি হাত দরকার হলে সেটি পরিবারেই পাওয়া যাবে। কোথাও আটকে গেলে সেটাও পরিবারকে বলতে হবে। ১১-১২ বছর বয়সে মালেক দাদার সঙ্গে কবি নজরুলের সম্মেলনে দোকানের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর মা’র কাছে সে কথা বলাতে নতুন আইডিয়া পেয়েছেন। সিগনেট প্রেসে একপাতা ক্যালেন্ডারের টিনের হুক লাগানোর কাজটা বাসাতে দাদি করতেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিন ছেলেকেই তাই নিজ ব্যবসাতে যুক্ত করতে পেরেছেন। তারাও যোগ দিয়েছেন আনন্দের সঙ্গে। প্রয়াত তসলিম চাচা (স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী) বা বাচ্চু চাচাকে (ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী) ব্যবসা নিয়ে পড়তে বলেন নি। তাদের শিক্ষাজীবনের ‘চয়েস’-এ কোন বাঁধাও দেননি।

আমি এখন ভাবি, দাদা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি আজ কী করতেন? চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলা, বঙ্গবন্ধু টানেল, মিরসরাই শিল্পনগরী নতুন যে সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে, চট্টগ্রামবাসী যেন সেটিতে তালমিলিয়ে নিজেদের হিস্যা আদায় করতে পারে সেই নিয়ে কাজ করতেন, নিজেই সামনে থাকতেন। চুয়েটের রোবট দলকে উৎসাহ দিতেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপ লার্নিং-এ যুক্ত হতে বলতেন। উদ্যোক্তা হিসেবে চট্টগ্রামবাসীর শত শত বছরের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেন। আমি ঢাকা থেকে গিয়ে তাকে সালাম করার জন্য যখন নাসিরাবাদ পূর্বকোণ অফিসে যেতাম আমাকে চা-নাস্তা খাইয়ে নতুন একটা মাইলস্টোন ধরিয়ে দিতেন। ফেরার পথে আমি মনে মনে ভেবে শেষমেষ ইন্টারনেট ঘেঁটে জানতাম আমার জন্য দেওয়া নতুন চ্যালেঞ্জটি তিনি আজ সকালে গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে জেনেছেন।

চট্টলদরদী এই অনন্য উদ্যোক্তার কর্মময় জীবনের শিক্ষা থেকে যদি নতুন প্রজন্ম তাদের নতুন পথের দিশা নিতে পারে তাহলে কেবল এই ক্ষণজন্মা উদ্যমী উদ্যোক্তার শতবর্ষ পালন আমাদের জন্য অর্থবহ হবে। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসীব করুন।

মুনির হাসান, সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 382 People

সম্পর্কিত পোস্ট