চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১০ জুলাই, ২০১৯ | ২:০৪ পূর্বাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক

টানা বর্ষণে পানিবন্দী নিম্নাঞ্চলের মানুষ

বান্দরবানের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের আশংকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে পাহাড় ধস আর গাছপালা ভেঙ্গে সারাদেশের সাথে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং অব্যাহত রয়েছে।
বান্দরবান: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, বান্দরবান কেরানীর হাট সড়কের বাজালিয়া অংশে সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় বান্দরবানের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সকাল থেকে এই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সোমবার বিকেলে বাজালিয়া অংশের বুড়ির দোকান এলাকায় সড়কের কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেলেও ভারী যানবাহন চলাচল ছিল। তবে মঙ্গলবার সকাল থেকে এ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যানবাহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, কিছু কিছু বড় গাড়ি এয়ার ক্লিনার খুলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সড়কের উপর দিয়ে কয়েক ফুট পানি প্রবাহিত হচ্ছে। একই সাথে ওই এলাকায় সহস্রাধিক ঘর বাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে বান্দরবানের সাথে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পাহাড় ধসের কারণে যানবাহন চলাচল বিঘিœত হচ্ছে বান্দরবান রাঙামাটি সড়কে। এছাড়া বান্দরবান, রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এদিকে টানা প্রবল বর্ষণের কারণে বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতা মুহুরী, বাঁকখালী নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর অববাহিকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় এসব নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নিম্নাঞ্চলের ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বান্দরবান শহরের আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী লোকজনদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে প্রশাসন। শহরের হাফেজগণ আশ্রয়কেন্দ্রে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী বৃষ্টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
এছাড়া শহরের উজানী পাড়া স্কুল কেন্দ্রে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে। সোমবার রাতে শহরের উজানী পাড়া হাফেজ ঘোনা সহ বেশ কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্রে সেনাবাহিনী পৌরসভা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবানের লামা উপজেলা সদরে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম জানিয়েছেন পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক শতাধিক পরিবারকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারীদের খাদ্য সহ অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
প্রাণহানি ঠেকাতে পাহাড়ের পাদদেশে

বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা জানিয়েছেন, খাগড়ছড়িতে চেংঙ্গী নদীর পানি বেড়ে গিয়ে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় প্রায় তিন শতাধিক বাড়ি ঘর ডুবে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার হঠাৎ চেংঙ্গী নদীর পানি বেড়ে পৌর শহরের শান্তিনগর, মুসলিমপাড়া, গঞ্চপাড়া, মেহেদিবাগ, গরু বাজারসহ নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। সন্ধ্যার দিকে পানি বাড়তে থাকায় লোকজন উচুঁ এলাকার স্কুলগুলোতে আশ্রয় নেয়। জেলা প্রসাশন ও পৌরসভা মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশের পরিবার ও চেংঙ্গী নদীর আশপাশ এলাকার পরিবারগুলোকে আশ্রয় কেন্দ্রে চলে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে মুসলিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শব্দমিঞা পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেশ কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। রাতের বেলা যদি বৃষ্টি বাড়ে, পাহাড়ি ঢলে আরো এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশংকা করছে এলাকাবাসী।
বাঁশখালী: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, উপজেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গত ৩ দিনের টানা বর্ষণের ফলে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করলেই বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। গত চারদিন ধরে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। পাহাড় ধসের আশংকায় উপজেলা প্রশাসন থেকে পাহাড়ি এলাকার লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। টানা বর্ষণের ফলে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়িতে ঢলের পানি ঢুকে পড়ে। এতে বসত ঘরের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধানি জমি ও ফসলাদি পানিতে ডুবে রয়েছে। ছনুয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ার আশংকা করছে এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানাযায়, টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে পাঁচটি ছড়ার কুল ভেঙ্গে বিভিন্ন বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পৌরসদর জলদী, শেখেরখীল, চাম্বল, পুঁইছড়ি, কালীপুর, বৈলছড়ী, সাধনপুর, পুকুরিয়া এলাকায় নিম্নাঞ্চলে ঢলের পানি জমে থাকায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় জলদী, চাম্বল, কালীপুর, সাধনপুর, শীলকূপ এলাকায় হাজার হাজার পরিবার পাহাড়ের ঢালুতে ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।
বাঁশখালী পৌরসভার বাসিন্দা নীলকমল তালুকদার বলেন, পাহাড়ি ঢলের পানি বৃদ্ধি পেলেই কেবল কৃষ্ণ মহাজন পাড়া ও চুড়ামনি পাড়ায় অধিকাংশ পরিবার পানির মধ্যে ডুবে থাকে। এসময় গ্রামীণ সড়কপথে যাতায়াত বন্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন এই অচল অবস্থা থাকলেও দেখার জন্য কেউ নেই। প্রতি বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। বাঁশখালী পৌরসভার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পূর্ব মিয়াবাড়ি সড়ক, আশ্চর্য পাড়া সড়কে নির্মাণাধীন ব্রিজের বিকল্প সড়ক না থাকায় ও ঠিকাদারি কাজে গাফিলতির জন্য ৩টি ব্রিজ অসম্পূর্ণ থাকায় এই বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কালীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট আ.ন.ম শাহাদত আলম বলেন, গত ২ দিন ধরে সরকারিভাবে নির্দেশনা পাওয়ার পর পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী পরিবারদেরকে নিচে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ১নং ওয়ার্ডের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করে বিভিন্ন পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। কালীপুরে নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ বলেন, উপকূলের মানুষজন নিরাপদে রয়েছে। প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে। সাগরের উত্তাল জোয়ারে ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে পারে। এলাকায় জোয়ারের পানি ঠেকাতে ভাঙ্গন এলাকার কাছাকাছি দ্রুতভাবে মাটি ফেলার জন্য স্কেভেটর গাড়ি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়েছে। জোয়ারের পানি প্রবেশ করলে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, পাহাড়ে বসতবাসকারী মানুষদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে, এইজন্য মাইকিং অব্যাহত রয়েছে।
পানছড়ি: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, দু’দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণে পানছড়ি উপজেলার প্লাবিত হয়েছে ৪টি গ্রাম। গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৭২ পরিবারের ১২০০ মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে পানছড়ি-দুধুকছড়া সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, বড় কলক, কিনাধন বৈদ্যপাড়া, মধুমঙ্গলপাড়া, পূজগাং বাজার পাড়া পানিতে প্লাবিত হওয়ার করুণ দৃশ্য। এলাকার মুরুব্বি রমেশ বিকাশ চাকমা ও ২নং চেংগী ইউপি’র প্যানেল চেয়ারম্যান তন্টু চাকমা জানান, কয়েক পরিবারকে পূজগাং মূখ উচ্চ বিদ্যালয়ে আপাতত থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জোসনা চাকমা জানায়, তার ঘরটি পানিতে তলিয়ে গেছে। গোলায় রাখা ধানগুলিও সরানোর সময় পায়নি। এদিকে ১নং লোগাং ইউপির একমাত্র ব্রিজটি ধসে গেছে চেংগী নদীর প্রবল স্রােতে। এলাকার কৃতি শংকর দেওয়ান, শান্তি বিকাশ চাকমা, মনোরম চাকমা জানায়, এ ধরণের বর্ষণ আগে আর পানছড়িতে কখনো দেখা যায়নি। ব্রিজটি জরুরি ভিত্তিতে চালু করার দাবি তাদের।
প্যানেল চেয়ারম্যান জাপাইন্না চাকমা জানায়, এই ব্রিজ দিয়ে লোগাং ও চেংগী ইউপির প্রায় ৪০ গ্রামের লোকের চলাচল। প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে বন্যায় প্লাবিত এলাকা ও ভেঙ্গে পড়া ব্রিজ পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো আশেকুর রহমান। তারা বলেন শীঘ্রই ভেঙ্গে যাওয়া ব্রিজটি প্রাথমিকভাবে চালুর উপযোগী করে তোলা হবে। পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে নির্মাণের ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে চেংগী নদীর পানি বিপদ সীমা অতিক্রম করায় নদীর আশপাশ এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ডুকে পড়েছে। প্রবল স্রােতে কয়েকটি ঘরবাড়ি ভেসে গেছে বলেও খবর পাওয়া যায়। রাতের মধ্যে বৃষ্টি না কমলে নদীর আশপাশ এলাকার ঘরবাড়ি স্রােতে ভেসে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সর্বশেষ পানছড়ি বাজারস্থ সানরাইজ কিন্ডার গার্টেনের পাশ দিয়ে তালুকদার পাড়ার দিকে বয়ে যাওয়া সড়কটি পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। রাস্তাটি আরো দুই আড়াই ফুট উচুঁ করা হলে সমস্যার সমাধান হবে বলে শিক্ষার্থীদের দাবি।
সাতকানিয়া: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের টানাবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলে সাতকানিয়ার প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাজালিয়া ইউনিয়নের বড়দুয়ারা এলাকায় কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের উপর কয়েক ফুট উঁচু পানি উঠায় বান্দরবানের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর তীরে বসবাসরতরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। কয়েকটি ইউনিয়নের কয়েক শতাধিক বসতঘর ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া কয়েক কোটি টাকার মৎস্য প্রজেক্ট পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, প্রাণহানি এড়াতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং ও ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
সরেজমিন পরিদর্শন, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা যায়, সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার মধ্যে চরতি, ঢেমশা, খাগরিয়া, এওচিয়া, মাদার্শা, আমিলাইশ, বাজালিয়া, নলুয়া, ধর্মপুর, ছদাহা, কেঁওচিয়া, কালিয়াইশ ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় সবকটি ওয়ার্ডের অর্ধলক্ষাধিক লোক পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বাড়ির উঠান ও চলাচলের সড়কে কোথাও হাঁটু ও কোথাও বুক পরিমাণ পানি থাকায় নৌকা নিয়ে যাতায়াত করছে লোকজন। গতকাল দুপুরে কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের দস্তিদারহাট এলাকায় ছদাহার হাঙ্গরখালের পানি পার হতে দেখা গেছে। এছাড়া বাজালিয়ার বড়দুয়ারা এলাকায় কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের উপর কয়েক ফুট উচ্চতায় পানি উঠায় ওই সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করতে না পারায় বান্দরবানের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ আপাতত বন্ধ রয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে রিক্সা-ভ্যান ও নৌকা নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।
চরতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ডা. রেজাউল করিম বলেন, দ্বীপ চরতি এলাকায় সাঙ্গু নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এই এলাকার লোকজন ভাঙ্গন আতংকে রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কেশুয়ার একটি ব্রিজ পানির স্রােতে বিধ্বস্ত হয়েছে।
ঢেমশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. রিদুয়ান উদ্দীন বলেন, এ ইউনিয়নের হাঙ্গরমুখ, ঢেমশা উচ্চ বিদ্যালয়, মরিচ্ছা পাড়া, বড়–য়া পাড়া ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৮হাজারের অধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তবে অসহায়রা যাতে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ছদাহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোসাদ হোসাইন চৌধুরী বলেন, হাঙ্গর খালের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে উত্তর ছদাহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়ক ভেঙ্গে গেছে এবং কুমার পাড়া, ফজর পাড়া, হাড়ি সিকদার পাড়ার লোকজন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। কয়েক কোটি টাকার মৎস্য প্রজেক্ট পানিতে তলিয়ে গেছে।
সাতকানিয়া পৌরসভার মেয়র মো. জোবায়ের বলেন, পৌরসভার ৮ ও ৯নং ওয়ার্ড বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অনুমোদনহীন আবাসন ও রেলপথ তৈরির কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, বিগত ২ দিন ধরে পাহাড়ি এলাকার ইউনিয়নগুলোতে বসবাসরতদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভূমি অফিসের তহসিলদার ও স্টাফ’রা পাহাড়ি এলাকার আশ্রয়ন প্রকল্প ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরাপদে সরে যেতে বলেছে এবং যারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তাদের সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। ইউএনও আরো বলেন, কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বাজালিয়ার বড়দুয়ারা এলাকায় পানি উঠায় বান্দরবানের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পুরো উপজেলায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দির খবর পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের নিকট ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে যারা উঠবে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
নাজিরহাট: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, তিনদিনের ভারী বৃষ্টিপাতে ফটিকছড়ি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ১০/১৫ টি গ্রামে কৃষকের প্রায় ১ শত হেক্টর আউশ ধান ও বীজ তলা ডুবে গেছে। সে সাথে হালদা ও ধুরং নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করছে। অনেক জায়গাতে ভাঙ্গা বেড়ী বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করছে বলে জানাগেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বিস্তীর্ণ গ্রাম প্লাবনের সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার লিটন দেব নাথ বলেন, অব্যাহত বর্ষণে উপজেলার বাগান বাজার, দাঁতমারা, নারায়নহাট, ভূজপুর, লেলাং, নানুপুর, রোসাং গিরী, খিরাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে কৃষকের ৫০ হেক্টর আমন ধান ও ৪০ হেক্টর বীজ তলা পানিতে ডুবে রয়েছে।
অপরদিকে, উপজেলার হালদা ও ধুরং নদী, লেলাং খাল, সর্তা খাল, গজারিয়া খাল, মন্দাকিনী খাল ও বার মাসিয়া খালে পানি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নদী ও খালের বেড়ী বাঁধ সংস্কার না করায় নদী ও খালের পানি প্রবেশ করে আবারো বন্যা হতে পারে।
ফটিকছড়ি পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের বণিক পাড়ার রতন বণিক জানান, উক্ত ওয়ার্ডের কুমার পাড়া ও বণিক পাড়ার সামনে কয়েক শত ফুট পূর্বের ভাঙ্গা বেড়ী বাঁধ গাছের খুঁটি দিয়ে বালির বস্তা দিয়ে রক্ষার জন্য কাজ করলেও গতকাল মঙ্গলবার তা ধুরং নদীতে তলিয়ে বাঁধ একেবারে সরু হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, ১ /২ ফুট নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে। স্থানীয়রা তাদের জীবন বাঁচাতে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সায়েদুল আরেফিন বন্যার আশংকায় উপজেলার ২টি পৌরসভা মেয়র ও ১৯টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে স্ব স্ব ইউনিয়নে অবস্থান করে খোঁজ খবর নিতে চিঠি প্রেরণ করেছেন।
সীতাকু-: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সীতাকু-ে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন মাইকিং করা হলেও সরছেন না তারা। ফলে চলমান টানা বর্ষায় যেকোন সময় প্রাণ ও সম্পদহানির আশংকা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট বাসিন্দারা এসব তথ্য নিশ্চিত করলেও প্রশাসন বলছেন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা অনেকেই সরে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীতাকু-ের প্রায় প্রত্যেক ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় যুগ যুগ ধরে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন হাজার হাজার মানুষ। তবে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করেন সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায়। এদিকে সারাবছর এসব পাহাড়ি মানুষগুলো সেখানে বসবাস করলেও বর্ষায় পাহাড় ধসের কারণে তাদের প্রাণ ও সম্পদ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। ফলে বর্ষার মৌসুমে এসব বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠে। কিন্তু ছিন্নমূল প্রকৃতির বেশিরভাগ বাসিন্দাদেরই অন্যত্র ঘর-বাড়ি করার অবস্থা না থাকায় ঝুঁকি জেনেও তারা পাহাড়েই বসবাস করতে বাধ্য হন। সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুর অলিনগর বস্তি এলাকার বাসিন্দা মো. আলমগীর হোসেন বলেন আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার কারণেই তো আমরা পাহাড়ে থাকি। সরকার বর্ষাকাল এলেই আমাদের পাহাড় ছেড়ে স্কুলে কিংবা সাইক্লোন শেল্টারে যেতে বলেন। এটা তো কোন স্থায়ী সমাধান না।
প্রায় অভিন্ন বক্তব্য সোনাইছড়ির ত্রিপুরা পাড়ার বাসিন্দা ত্রিপুরা সর্দার কাঞ্চন ত্রিপুরার। তিনি বলেন, আসলে কোথায় যাব আমরা? পাহাড়ে থাকি, তাও পরের জায়গা। এখন আমাদেরকে প্রশাসন সরে যেতে বলছে। কিন্তু যাব কোথায়?
এদিকে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সীতাকু-ের বারৈয়াঢালা, পৌরসদর, বাড়বকু-, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী ও সলিমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানের অন্তত ২০টি স্পটে বসতি স্থাপন করে বসবাস করছেন ৯০ হাজারের মত মানুষ। এর মধ্যে শুধুমাত্র সলিমপুর ইউনিয়নের ছিন্নমূল ও অলিনগর বস্তি এলাকায় বাস করেন প্রায় ১৯ হাজার পরিবার। এসব পরিবারের বাসিন্দা ৭৫ হাজারের মত। এছাড়া অন্যত্র আরো ১৫-২০ হাজার মানুষ বাস করেন। এসব স্থানে বিগত দিনে বর্ষায় পাহাড় ধসে অনেকের প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে জঙ্গল ছলিমপুরের ছিন্নমূল বস্তিতে পাহাড় ধসে ৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
সীতাকু- উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায় বলেন, প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড় ধসে জেলার কোথাও না কোথাও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ কারণে আমরা এবারও পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে উদ্যোগী হয়ে সর্বত্র মাইকিং করে সতর্ক করেছি। তিনি দাবি করেন জঙ্গল ছলিমপুরে বেশি মানুষ বসবাস করেন ঝুঁকি নিয়ে। তাদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে ঠিক কতজন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।
লামা: নিজস্ব সংবাদদাতা জানিয়েছেন, টানা বর্ষণে লামা পৌরসভায় একটি ব্রিজ ধসে তিন গ্রামের সহস্রাধিক মানুষের যোগাযোগ ব্যাহত হয়ে তারা ভোগান্তিতে পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের মধুঝিরি মার্মা মাস্টার পাড়া সংলগ্ন নুনার ঝিরির উপরে নির্মিত ব্রিজটি বর্ষার টানা বৃষ্টিতে প্রচুর পানি আসলে স্রােতের ধাক্কায় একাংশ ধসে পড়ে এবং অসংখ্য জায়গায় বড় বড় ফাটলের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মিরাজ বলেন, যে কোন সময় ব্রিজটি ঝিরিতে পড়ে যেতে পারে। এতে করে হতাহতের আশংকা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, কয়েকদিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে লামা পৌরসভার ৩, ৭নং ওয়ার্ড ও সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের উপর দিয়ে প্রবাহিত নুনারঝিরি নামক এই ঝিরিটির দুইপাশ খনন করা হয়। খনন কাজটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও যুগোপযোগী উদ্যোগ ছিল। কিন্তু গত ৪/৫ দিনের চলমান টানা বর্ষণে ঝিরির দু’পাড়ে ব্যাপক ভাবে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এতে করে ব্রিজটির নিচের অংশের মাটি সরে যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যে একপাশ দেবে গেছে। সেই সাথে ব্রিজের অসংখ্য স্থানে বড় বড় ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। যেকোন সময় ব্রিজটি ধসে পড়ে জানমালের ক্ষতি হতে পারে। তাই এখনই বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করে নিরাপত্তার স্বার্থে ব্রিজটির উপর দিয়ে জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ করা প্রয়োজন।
পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. কামাল উদ্দিন বলেন, সকালে খবর পেয়ে আমি ব্রিজটি দেখে গিয়েছিলাম। ব্রিজটির একপাশ দেবে গেছে। ঝুঁকি থাকায় ব্রিজের উপর দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। বেপরোয়াভাবে ঝিরির দু’পাশ খননের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও আরো দুইটি ব্রিজ ঝুঁকিতে আছে। সেগুলোও যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে।

The Post Viewed By: 222 People

সম্পর্কিত পোস্ট