চট্টগ্রাম সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১

সর্বশেষ:

১২ জুলাই, ২০২১ | ১২:১৬ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু 

কোন ‘কুকুরে কামড়িয়েছিল’ অজ্ঞাত মেয়েটিকে?

কপালের ঠিক উপরের মাথার ডান দিকে থেঁতলানো। দু’পায়ের গোড়ালিতেও আছে জখম। আঁচড়ের চিহ্ন রয়েছে শরীরের বিভিন্ন স্থানে। আছে কামড়েরও দাগ। তাও আবার প্রায় ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর শরীরে! নাম পরিচয়হীন এমন এক তরুণীর শরীরে ভয়ংকর এমন চিহ্নগুলো দগ দগ করছে। প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় অজ্ঞাত তরুণীকে ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালে চারদিন আগে যারা ভর্তি করিয়ে গেছেন, তারা বলেছেন কুকুর কামড়েছে মেয়েটিকে। সেই কামড়ের তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেছে তরুণীটি। যদিও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানা যায়নি তার চিহ্নগুলোর রহস্য কী?  কোন ‘কুকুরে কামড়িয়েছিল’ এই অজ্ঞাত মেয়েটিকে?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৭ জুলাই সকাল ১০টার দিকে বিআইটিআইডি হাসপাতালে চারজন ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েটিকে ভর্তি করায়। ওই দিন রাত পর্যন্ত একজন পাশে থাকলেও বাকি তিনজনই চলে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় মেয়েটির পাশে যখন কেউই ছিল না, তখনই রক্ত ও চিকিৎসার ওষুধে ক্রয়ে এগিয়ে আসেন হাসপাতালেই চিকিৎসকরা। প্রাণপণে চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেনি মেয়েটিকে। শেষ পর্যন্ত গতকাল রবিবার সন্ধ্যার দিকে মৃত্যু হয় তার।

মৃত্যু হওয়া মেয়েটি আসলেই কে? কীভাবে তার এমন অবস্থা হয়েছিল? কোথায় থেকে এসেছিল হাসপাতালে? এসব প্রশ্ন খুঁজতে গিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসা এক ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়। তার নাম রশিদ। তিনি বাকলিয়া এলাকায় সিকিইউরিটি গার্ডের চাকরি করেন। জানতে চাইলে রশিদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘ডিউটি শেষ করে আমি আর আমার সাথের একজন বাসায় যাচ্ছি। এ সময় ফুলকলি কারখানার এক সিকিউরিটি গার্ড আমাকে ফোন দেয়, বলে একটা মেয়েকে ৫/৭টা কুকুরে কামড়িয়েছে। তখন আমরা ঘটনাস্থলে যাই এবং দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েটি পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯ এ ফোন দেই। কিছুক্ষণ পর বাকলিয়া থানা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি কলও আসে।

বিষয়টি তাদের বললে, পুলিশ বলে তোমরা একটা ব্যবস্থা কর। আমি বলি, আমরা কী ব্যবস্থা করব? আপনারা আসেন। পরে পুলিশ বলে, গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাও। বাধ্য হয়ে একটা ভ্যান গাড়ি নিয়ে আমিসহ চারজন হাসপাতালে (চমেকহা) নিয়ে যাই। কিন্তু তারা ভর্তি করায় নি। পরে জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। তারাও ভর্তি করায়নি। শেষে ফৌজদারহাটে নিয়ে গেলে, তারা দ্রুত ভর্তি করায়।’ মেয়েটিকে কী ওই এলাকায় আগে দেখা গিয়েছিল? প্রশ্ন করলে বলেন, ‘না না, আগে এই এলাকায় দেখা যায়নি। তাছাড়া অন্য কেউও নাকি তাকে চেনেও না। কীভাবে এখানে আসল, সেটিও বলা যাচ্ছে না। আমি শুধু মানবিক দিক থেকে মেয়েটির পাশে এগিয়ে এসেছি।’

বিআইটিআইডি হাসপাতালে সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বুধবার সকালে মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। সাথে সাথে আমরা নিজেরাই রক্তের ব্যবস্থা করি এবং চিকিৎসা দেই। আমরা চিকিৎসকরা নিজেদের পক্ষ থেকে সকল ওষুধপত্র দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যায় মেয়েটি মারা যায়। যারা নিয়ে এসেছিল, তারা জানিয়েছে মেয়েটিকে ৫/৭টা কুকুরে কামড়িয়েছিল। মাথা থেকে শুরু করে পায়ের পাতায় মারাত্মক জখম ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিক ধারায় মনে হচ্ছে কুকুরেই কামড়িয়েছে।’

সীতাকু- মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছে বাকলিয়া থানায়। ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট থানায় অবহিত করেছি। আর হাসপাতাল থেকেও আমাদের আগে জানানো হয়নি। যখন জেনেছি, তখন মেয়েটি মারা গেছে। লাশটি ময়না তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে।’ ‘হাসপাতালে মেয়েটিকে যিনি নিয়ে এসেছিল, তিনি একজন সিকিইউরিটি গার্ড। তার সাথেও কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, বাকলিয়ার শাহ আমানত সোসাইটির পাশে এ ঘটনা ঘটে। সেখানে ৫/৭টা কুকুর মেয়েটিকে কামড়িয়েছিল বলে জানিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান ওসি আজাদ।’

গতকাল রবিবার দুপুরে হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত নার্স জানান, ‘একবার মেয়েটির জ্ঞান ফিরেছিল। তখন তার কাছ থেকে নাম পরিচয় জানার চেষ্টা করি। সে বলেছিল, তার নাম আঁখি মনি। বাড়ি কক্সবাজার। আর একটি মোবাইল নম্বর বলেছিল। কিন্তু সেই নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাতে সংযোগ পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর পর মনি রে… মনি… বলে চিৎকার করেছে। আর তিন চারজনের নাম বলে ওঠেছিল। স্পষ্ট না হলেও ফারুক নামে কারও একজনের নাম বারবার বলার চেষ্টা করে। তখন তাকে জিজ্ঞাসাও করেছি, তার মালিকের নাম কী? বলেছিল রেশমি। আর কিছুই সে বলতে পারেনি। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।’

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, ‘যেহেতু রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। তারাও (স্থানীয়রা) মানবিকতার সাথে কাজটি করেছিলেন। তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতেই হয়। সন্ধ্যায় খবর পেয়েছি, মেয়েটি মারা গেছে। এখন সীতাকু- থানা আমাদের অবশ্যই এ বিষয়ে আপডেট জানাবে, এরপর আমরাও সহযোগিতা করবো অবশ্যই।’

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 318 People

সম্পর্কিত পোস্ট