চট্টগ্রাম রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

২২ জুন, ২০২১ | ২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ডা. ম রমিজউদ্দিন চৌধুরী

সংবাদভাষ্য

শিল্পবান্ধব চট্টগ্রাম ফের কবে

চট্টগ্রামের সন্তান চট্টগ্রামেই শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রবল ইচ্ছে ছিল। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ ও সহায়তা না পাওয়ায় অগত্যা শিল্প গড়তে হয়েছে ঢাকায়। ব্যর্থতার এই কষ্ট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চট্টগ্রাম ছেড়েছিলেন শিল্পোদ্যক্তা সৈয়দ নাসির। চট্টগ্রামের এই তরুণের খেদোক্তি নিয়ে একটি প্রতিবেদন গতকাল সোমবার দৈনিক পূর্বকোণে ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনটি যারা পড়েছেন, তাদের সকলেই একমত হবেন- সৈয়দ নাসিরের এই ক্ষোভ তার একার নয়। চট্টগ্রামে যারাই শিল্প গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তাদের সকলকেই এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে কেউ ঢাকায় গিয়ে ব্যবসা জুড়েছেন। কেউবা শিল্প গড়ার পরিবর্তে অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। আবার কেউ কেউ দেশের বাইরে টাকা পাঠিয়ে সেখানে বাড়ি-ঘর কিনেছেন। মোটকথা চট্টগ্রাম এলাকায় শিল্পায়ন আর হয়নি। হাতেগোনা যা কিছু হয়েছে, তাদেরকে তীব্র স্রোতের বিপরীতে থেকে অনেকটা লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে।

সাগর-পাহাড় আর ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনায় পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে তৎকালীন সরকার যখন চট্টগ্রামকে ‘কমার্শিয়াল বেল্ট’ হিসেবে তৈরি করে তখন ঢাকাসহ দেশের অনেক ব্যবসায়ী চট্টগ্রামে ছুটে আসেন। তাদের সঙ্গে বহুজাতিক বহু কোম্পানি চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারের ভুলনীতি এমনকি নীতিগত সহায়তার অভাবে চট্টগ্রামে শিল্পায়নতো হয়ইনি, উল্টো সবকিছু ঢাকামুখী হয়ে গেছে। গার্মেন্টসের শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকে। এক সময় গার্মেন্টস খাতের জাতীয় রপ্তানিতে চট্টগ্রামের অবদান ছিল ৪০ শতাংশ। সেটি এখন এককের ঘরে নেমে এসেছে। রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এলাকা শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে। এরকম অনেক কিছুরই শুরু চট্টগ্রাম দিয়ে হলেও বিভিন্ন সময়ে সরকারের অদূরদর্শী পরিকল্পনায় সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রধান কার্যালয় চলে গেছে ঢাকায়। যে কয়টি সরকারি অফিসের প্রধান কার্যালয় কিংবা কার্যকরী লিয়াজোঁ অফিস চট্টগ্রামে ছিল সেগুলোও ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথবা কার্যক্রম ঢাকা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। ছোটখাটো নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্যও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী-বাসিন্দাদের ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বলা চলে, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা চট্টগ্রামকে অনেকদূর পেছনে ঠেলে দিয়েছে।

অথচ পৃথিবীর বহু ব্যবসায়ী সংগঠন চট্টগ্রাম সফরে এসে চট্টগ্রামকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প কারখানা গড়ার ভূস্বর্গ হিসেবে আখ্যা দিলেও সেটি আমাদের নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি কাড়ে না।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্ন সেমিনার- সিম্পোজিয়ামে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে সারাদেশের সুষম উন্নয়নের কথা বলে থাকেন। শিল্পের জন্য উপযোগী জায়গায় শিল্প, কৃষি উপযোগী জায়গায় কৃষিকাজ- এমন নীতি গ্রহণ করে সরকারকে উপযুক্ত সহায়তা দেয়ার তাগিদ দিলেও কাদের কথায়- কোন ইঙ্গিতে সেসব পরামর্শ আলোর মুখ দেখে না, সেটি করো বোধগম্য নয়।

নিজের জায়গায় নিজের শিল্প গড়ার উপযুক্ত পরিবেশ দেয়া না হলে সৈয়দ নাসিরদের মতো উদ্যোক্তাদের কান্না কখনোই বন্ধ হবে না। তাদের আবেগ-অনুভূতিকে মূল্য দিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি করে দিলে এদেশেই বহু তরুণ উদ্যোক্তা বুক চিতিয়ে শিল্প গড়বে। বাইরে থেকে বিনিয়োগের আর প্রয়োজন হবে না। মোটকথা, চট্টগ্রামের ভূ-প্রাকৃতিক সুবিধা বিবেচনা করে বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে সরকার যদি উদ্যোগী না হন, তাহলে সম্ভাবনাময় চট্টগ্রামের প্রতি অবিচার করা হবে।

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 1063 People

সম্পর্কিত পোস্ট