চট্টগ্রাম শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

সর্বশেষ:

২০ জুন, ২০২১ | ১২:৫২ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসেন রাজু/ মরিয়ম জাহান মুন্নী

এখনো খুঁজি বাবা তোমায়

‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতে, বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না। জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা, মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না। আয় খুকু আয়…’। গানের কথাগুলো কানে বাজলে যে কোন সন্তানের চোখেই ভাসবে ছোট্টবেলায় বাবার সাথে থাকা স্মৃতিগুলো। সবার কাছেই বাবা মানে বটবৃক্ষ। আবার মাথার ওপর বিশাল একটা ছায়াও এই বাবা।

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। প্রতি বছরের জুন মাসের তৃতীয় রবিবার পালন করা হয় দিবসটি। বছরের এই একটি দিনকে প্রিয় সন্তানেরা আলাদা করে বেছে নিয়ে থাকেন। বাবা নামের এ বৃক্ষটাই সন্তানদের বড় করতে গিয়ে ত্যাগ করেন অনেক কিছুই। বাবাদের দৃঢ় চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত চার ব্যক্তির গল্প শোনাবো আজ। চট্টগ্রামরই এমন চার ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এবারের আয়োজন। যাদের মধ্যে আছেন জাতীয় সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ রাবার বোর্ডের চেয়ারম্যান, চিকিৎসক ও একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট।

ওয়াসিকা আয়শা খান এমপি

সভাপতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি

আমার কাছে বাবা এমনি এক বটবৃক্ষের নাম, যার স্নেহের শীতল ছায়ায় একজন সন্তান বেড়ে উঠে পরম যত্নে। আমার বাবা আতাউর রহমান খান কায়সার বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ম-লীর অন্যতম প্রতিনিধি। আব্বু ও আম্মু নিলুফার কায়সার দুইজনের অবদান অসীম। কিন্তু আব্বুর অবদান অবশ্যই অতুলনীয়। আজকের আমি এ জায়গায় আসার পেছনে আব্বুর অবদান মুখে বলে শেষ করা যাবে না।

একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমার আজকের পথচলা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল, জননেত্রী শেখ হাসিনার পাশে আমৃত্যু থাকা আমার বাবা আতাউর রহমান খান কায়সারের রয়েছে অনস্বীকার্য অবদান।

সত্যি বলতে কি, পড়ার বই থেকেও বিশ্বসাহিত্য নিয়েই আলাপ হতো বেশি আব্বুর সাথে। পরীক্ষার ফলাফল নয়, তর্ক হতো রাজনীতি নিয়ে। আমার বাবা মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করে গেছেন, যা অনুভব করে গর্বে আমাদের বুক ভরে যায়।

আব্বু আমাকে আদর করে সানু বলে ডাকতেন। দেশের জন্য ছিল আব্বুর সীমাহীন ভালোবাসা। তিনি আমাকে বলতেন বুঝলি ‘সানু মা, আমি মোটেও ভীত নই। তুমি কি এই ভেবে আনন্দিত নও, যে আমি রাজনীতিকে ব্যবহার করে কোন অর্থ উপার্জন করিনি।’ যখন আমার বয়স ১৭ বছর, আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হতে। যারফলে সরকারি কমার্স কলেজে ছাত্রলীগের কর্মকা-ের সাথে জড়িত হই। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। সেই থেকেই আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু।

আব্বু ছিলেন নির্লোভ-নিরহংকার। দেশের প্রতি তার ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। নিজের সন্তানের মতই দেশকে ভালোবাসতেন। তাইতো দেশের দুূঃসময়ে দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি। তিনি সবসময় মানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতি করতেন। আমাদের বলতেন ‘মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার মধ্যে আছে এক সীমাহীন আনন্দ’। তাই দেশ ও মানুষকে ভালোবাসবে।

সৈয়দা সরওয়ার জাহান

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রাবার বোর্ড

আমার ছোটবেলা অন্যদের চাইতে একটু ভিন্ন রকম ছিল। ছোটবেলাটা সাধারণত মায়ের সান্নিধ্যে কাটে। কিন্তু আমার কেটেছিল বাবার কর্মস্থলে সরকারি বাসায়। সেখানে বড় ভাইরাও ছিল। মা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। গ্রামে লেখাপড়া ব্যাহত হবে বলেই এমন করেন বাবা। বাবাই মায়ের সকল দায়িত্ব পালন করতেন। আমার জীবনের সব সফলতায় বাবার কৃতিত্ব। আজকে আমার এ জায়গায় আসার পিছনে বাবার অবদান বলে প্রকাশ করা যাবে না। বাবা আমার জীবনের আদর্শ। তার কারণে শুধু আমিই নয়, আমরা সব ভাইবোন ভালো একটা অবস্থানে আসতে পেরেছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমার পাশে বাবা ছিলেন ছায়ার মত। তিনি শুধু আমাদেরকেই মানুষ করেননি, আমার সন্তানদেরও মানুষ করেন। বাবা সারাদিন পরিশ্রম করে অফিস থেকে ফিরে রাতে ও আমাদের জন্য জেগে থাকতেন যাতে আমাদের পড়ালেখা ভালো হয়। যতক্ষণ আমরা না ঘুমাতাম, বাবাও ঘুমাতেন না। ১৯৮৮ সালে আমি বিসিএস পরীক্ষা দিব। আমার দুই মেয়ে ছোট। ওদের নিয়ে স্কুলে চাকরি করা কষ্টের ছিল। ওই সময়ে বাবা আমার পাশে ডাল হয়ে দাঁড়ায়। বাবার কারণেই আজকের এই আমি।

 

ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আইসিইউ বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

কখনো কোন বিশেষ দিবস আমার মনে তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করে না।  কাঠখোট্টা পেশার মানুষ, কিন্তু গত দুয়েকদিন ধরে বাবা দিবস বারবার মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাবাকে ছাড়া আমার বাবা দিবস। গত ১৬ ডিসেম্বর ২০২০, বিজয় দিবসে আমার জীবন থেকে আমার মাথার ওপর থাকা বাবার ছায়া দৃশ্যত নেই। মৃত্যুর পূর্বে প্রায় ৫ বছর অসুস্থ ছিলেন, শেষ এক বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। তখনও বাবা ছিলেন, মনে হত মাথার ওপর সবকিছুতে অবলীলায়, নিশ্চিন্ত মনে আশ্রয় নেয়ার অবলম্বন আছে। সেই অবলম্বনটা এখন আর খুঁজে পাইনা।

আমার বাবা নির্মল কান্তি বিশ্বাস একজন বেসরকারি চাকুরিজীবী ছিলেন। এক ভাই এক বোনের মধ্যে আমিই ছোট। এখনও ঠিক মনে পড়ে, যখন বাবা কাজ সেরে অফিস থেকে আসতে একটু দেরি হতো, তখনই আমার কান্না শুরু হত। সময়ের পরিক্রমায় একসময় বাবা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষায় থাকতেন আমার ঘরে ফেরার। সন্ধ্যা হলেই ভাবতেন অনেক রাত। শারীরিক অসুস্থতার প্রতিক্রিয়ায় প্রায় সবকিছুই ভুলে গিয়েছিলেন, ভয়-উদ্বিগ্নতার মধ্যে তাঁর নির্ভরতার আশ্র‍য় খুঁজতেন আমার মধ্যে। অকারণেই হয়তো আমার নাম ধরে ডাকতেন। যখন অনেক কিছুতেই সাড়া দিতেন না তখনও আমি ডাকলে তাকাতেন। সেই ডাক গত ছয় মাস ধরে আর শোনা হয়না। একদিন আর আমার ডাকেও সাড়া দিলেন না। কোভিড-১৯ হাসপাতালে কাজ করি। তাই শেষ কয়েক মাস বাবার ঘরের বাইরে দূর থেকে দেখতাম। সারাদিনের কাজ শেষে যখন ঘরে ফিরি বাবাকে খুব মিস করি। সহজ সাধাসিধে জীবন কাটিয়েছেন সারাজীবন। আজকের আমার আমিতে আমার বাবা আছেন। নিজের জীবনযাপনের মধ্যে সহজ সরল উচ্চ জীবনবোধ ছাপিয়ে দিয়েছেন সন্তানদের মাঝে। পিতা হিসেবে গর্বের কারণ হয়ে রয়ে গেছেন সন্তানের মধ্যে।

বাবা যখন থাকে না তখনই হয়তো বোঝা যায় বাবা আসলে কি। সব বাবা, সব সন্তানেরা সুখী হোক। বাবা তো দিবসের মাঝে সীমাবদ্ধ নয় তবু বাবা দিবসের শুভেচ্ছা সব পিতা আর সন্তানদের।

মোহাম্মদ রিজওয়ানুল আলম এফসিএ

চাটার্ড একাউন্টেন্ট

আবুল খায়ের স্টিল মেল্টিং লি.

নুরুল আলম। আমার বাবা। একজন যন্ত্রপ্রকৌশলী তিনি। বাংলায় বাবার নামের মানে দাঁড়ায় ‘বিশ্বের আলো’। আড়ালে আমরা তাঁকে ‘জ্যোতি বাবু’ নামে ডাকতাম। জ্যোতি বাবু ছিলেন একাধারে আমার বাবা, শিক্ষক, পথ প্রদশর্ক এবং বন্ধু। জ্যোতি বাবু বলতেন স্রষ্টাকে তুমি করে ডাকতে পারলে আপন বাবা মাকেও তুমি করে ডাকা যায়।

তাই বাবাকে আমরা তুমি করেই ডাকতাম। নির্দ্বিধায় এবং নির্ভয়ে সবকিছু বলতে পারতাম। আজীবন মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া আমার বাবা কোনদিন আমাদের পরীক্ষায় প্রথম হতে চাপ দেননি। পাঠ্যবই পুরোটা ভালোমতো পড়া এবং বুঝে পড়াটা নিশ্চিত করেছিলেন। শুধু পাঠ্যবই নয়, রোজ রাতে রুটিন করে তাঁকে আধা ঘণ্টা ইংরেজি পত্রিকা পড়ে শোনাতে হত। রুটিন মাফিক পড়াশুনার সাথে গল্পের বই পড়া, মুভি দেখা, খেলা দেখা, গান শোনা এবং বেড়ানোও চলতো।

আমাদের টিনএজেই তিনি হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন একা রাস্তা পার হওয়া, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানো, মেইন সুইচ অফ করা, ফিউজ পালটানো কিংবা ব্লাড প্রেসার চেক করার মতো লাইফ স্কিলগুলো। শুধুমাত্র পড়ালেখা নয়, বাবার কাছেই শিখেছি জীবনে সুখী হওয়ার এবং জীবনকে উপভোগ করার মূলমন্ত্র। সত্য বলা, নির্লোভ এবং সৎ থাকা, অসাম্প্রদায়িকতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সহানুভূতিশীল হওয়ার দীক্ষা পেয়েছি বাবার কাছে। শিখেছি সন্তুষ্ট থাকা এবং ছোট বড় সব সাফল্য উৎযাপন করতে।

মাতৃভক্তি, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব এবং মমত্ববোধ, শেয়ারিং কেয়ারিং এবং নিজের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মান সুনিশ্চিত করে কীভাবে তিন কামরার একটা বাসাকে সুখী, সমৃদ্ধ পরিবার হিসেবে গড়ে তোলা যায় সেই শিক্ষাটাই বাবা আমাদের দিয়েছেন। জ্যোতিবাবু আলো জ্বেলেছিলেন। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পথচলায় অনুভবে, আবেগে, সাফল্যে কিংবা ব্যর্থতায়, আমাদের সবকিছুতে জ্যোতিবাবু ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন চিরকাল। ঐ আকাশের তারায় আমাদের সৌর ম-লের উজ্বলতম নক্ষত্র জ্যোতি বাবুর জন্য আমরা এই পৃথিবীতে সাদকায়ে জারিয়া হয়ে থাকতে চাই।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 452 People

সম্পর্কিত পোস্ট