চট্টগ্রাম সোমবার, ১০ মে, ২০২১

১৭ এপ্রিল, ২০২১ | ২:৪৯ অপরাহ্ণ

অনুপম কুমার অভি

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী ইলশার বখশী হামিদ মসজিদ

বাঁশখালী উপজেলার ইলশা গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী বখশী হামিদ মসজিদ। এ মসজিদে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। মুসলিম শিক্ষা-সংস্কৃতির ভিত রচনা করে ও ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশে তৎকালীন সময়ে এই মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শতবর্ষী এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে ইট, পাথর ও সুরকি ব্যবহার করে। এই মসজিদটির নির্মাণ কৌশলের সাথে ঢাকার শায়েস্তা খান মসজিদ এবং নারায়নগঞ্জের বিবি মরিয়ম মসজিদের মিল রয়েছে বলে স্থপতিদের দাবি। ৪৫০ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী বখশী হামিদ মসজিদের সামনে রক্ষিত ফলকে আরবিতে লেখা আছে “বনাল মাসজিদুল মোকারেম ফি আহমিদুল মূলক, ইসনাদুল মিল্লাত ওয়াদ্দিন সুলতানুল মুয়াজ্জাম সুলাইমান। আর তিনি হলেন সুলাইমান কররানী। শিলালিপির বক্তব্য মতে, এটি সুলাইমান কররানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করার কথা থাকলেও লোকমুখে বখশী হামিদের নির্মিত মসজিদ বলে পরিচিত। অলি বুজুর্গের আবাদকৃত এ গ্রামে বহু দ্বীনদার পীর মাশায়েখের আর্ভিভাব হয়েছিল। তন্মধ্যে শাহ চান মোল্লা অন্যতম। বখশী আবদুল হামিদ উক্ত শাহ শাহের অধস্তন বংশধর। কেউ কেউ মনে করেন গৌড় থেকে আগত সুফী দরবেশের মধ্যে একজন ছিলেন সুলাইমান। তিনি সাধক ও জ্ঞানে গুনে প্রভাবশালী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে সকলে তাকে সুলতান বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারের প্রত্নতত্ব সংরক্ষণ বিভাগ হতে এটি সংস্করণের উদ্যোগ নেন। ১৯৭৫ সালে এটি প্রটেকটেড মনুমেন্ট এন্ড মৌন্ডস ইন বাংলাদেশ-এর তালিকায় স্থান পাওয়ায় কিছু অংশ সংস্কার করেন।  মোঘল স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত এ মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট। মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং ছোট গম্বুজ দুটি ধনুকের মতো করে ছাদের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। বখশি হামিদ মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল ইসলামী কমপ্লেক্স। এ কমপ্লেক্সের নাম রাখা হয়েছে দারুল কোরআন মুহাম্মদিয়া শাহ বখশি হামিদ কমপ্লেক্স। এখানে প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।

বর্তমানে মোঘল স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত মসজিদের পূর্ব পাশে রয়েছে প্রাচীন কালের একটি বিশাল আকারের দিঘী। এই দিঘীর পশ্চিম পাড়ে কবরস্থানে বিশাল আকৃতির বটগাছ ইতিহাসের সাক্ষী রয়েছে। দিঘীতে মাছ চাষ করা হয় এবং মুসল্লিরা পানি ব্যবহার করে অজু করেন। মসজিদের পশ্চিমে কবরস্থান, পূর্বে-উত্তরে গড়ে উঠেছে বিশাল মাদ্রাসা ও এতিমখানা সহ ইসলামী কমপ্লেক্স। এ কমপ্লেক্সের নাম রাখা হয় দারুল কোরআন মুহাম্মদিয়া শাহ আব্দুল হামিদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা। প্রতি শুক্রবার এই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করার জন্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত ধর্মপ্রাণ মুসল্লি সমাবেত হয়।

বখশী হামিদ মসজিদের মোতোয়াল্লী মো. আজিজ বলেন, ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম এবং পুরাতন লোকজনের তথ্যমতে মোগল আমলে বঙ্গোপসাগর হয়ে নদী পথে ইলশা গ্রামের প্যারাবন জঙ্গলের মধ্যেই জনবসতিশূণ্য এলাকায় বখশি হামিদ অবস্থান নেন। বখশী হামিদের পুরো নাম মুহাম্মদ আবদুল হামিদ, বখশী তার উপাধি। বখশী ফার্সি শব্দ। এর অর্থ কালেক্টর বা করগ্রহীতা। তৎকালীন সময়ে বখশী হামিদ এতদাঞ্চলের কালেক্টর তথা প্রশাসক ছিলেন। তিনি এলাকার শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন।

ইতিহাসবিদদের তথ্য মতে, ইউসুফ ও কুতুব নামে গৌড়ের দুজন আমির শাহ আবদুল করিম নামক জনৈক সুফীর সঙ্গে গৌড় ছেলে উপযুক্ত বাসস্থানের সন্ধানে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি দিয়ে বাঁশখালীর এ জায়গা অবস্থান নেন। তারা বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে বাঁশখালীর ইলশার দরগা বাড়ির স্থানে পৌঁছলে শাহ আবদুল করিম সাহেব ইল্লাল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করে তার ছড়ি পুঁতে রাখেন। তিনিই সেখানে বসবাসের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এ সময় থেকে স্থানটি ইল্লাল্লাহ শাহের স্থান এবং পরে ইলশায় রূপান্তরিত হয়। এ থেকেই ইলশায় থেকে বর্তমানে ইলশা গ্রামে পরিচিতি লাভ করে। সেখানে মাটি খুঁড়লে এখনও প্রাচীন সভ্যতার নির্দশন খুঁজে পাওয়া যাবে।

বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, বখশি হামিদ মসজিদটি ইতিহাস ঐহিত্য সংরক্ষণ করেছে। প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষ মসজিদটি পরিদর্শনে আসেন, নামাজও আদায় করেন। এখানে গড়ে উঠেছে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 216 People

সম্পর্কিত পোস্ট