চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২

সর্বশেষ:

১৪ এপ্রিল, ২০২১ | ১:২০ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী 

হল না পান্তা ইলিশের আয়োজন

বিগত কয়েক বছর ধরে শহরে অনেকের মধ্যে বর্ষবরণে নতুন প্রথা দেখা যাচ্ছে। নামী দামি রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাচ্ছেন পান্তা-ইলিশ। ইদানীং এ প্রথা থেকে বাদ যাচ্ছে না বাসাবাড়িও। যদিও করোনা ও পবিত্র রমজানের কারণে এবার পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম কম থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

বাঙালি আবহমান কাল ধরে বর্ষবরণে নানা উৎসব পালন করে আসছে। সেই তালিকায় পহেলা বৈশাখে হাল আমলে যুক্ত হয়েছে ঘটা করে ‘পান্তা-ইলিশ’ খাওয়ার ধুম। সংস্কৃতি সচেতন ব্যক্তিদের মতে, বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের চিরায়ত সংস্কৃতির সাথে ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া হাল আমলের ‘হুজুগী’ কর্মকা- ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রতি বছর বৈশাখে প্রথম দিনে নগরীর নামীদামী হোটেল-রেস্টুরেন্টে আয়োজন করা হয় পান্তা-ইলিশ। এর আগে কয়েকদিন ধরে রং বেরঙের লিফলেট বের করে হোটেল মালিকরা ত্রেুতা আকর্ষণের চেষ্টা করেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতি লাভের আশায় নববর্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রথা চালু করে। অথচ এ প্রচলন আগে কখনো ছিল না। পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রবণতায় সাগরে বেড়ে উঠা মওসুমে অবাধে জাটকা শিকার করা হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাধাগ্রস্থের পাশাপাশি সরকারি আইন লঙ্ঘন হচ্ছে অহরহ। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশের ব্যাপক প্রচলন থাকলেও এই প্রথার বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সোচ্চার হয়েছে। এমনকি পান্তা-ইলিশ না খেতে মৎস্য অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নানাভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইলিশের উচ্চমূল্য ও এর প্রজনন মৌসুম চলায় বিভিন্ন মহল থেকে আহ্বান আসছে পান্তা-ইলিশের রেওয়াজ পরিহারের জন্য। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়াকে হাল আমলের ‘হুজুগ’ বলে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এ প্রথার বিপক্ষে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন। ফলে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া থেকে বিরত থাকছেন। অনেকে ইলিশ ছাড়া পহেলা বৈশাখ পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসার ফারহানা লাভলী দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত না খাওয়ার জন্য মৎস্য অধিদপ্তর জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে। সাধারণত বছরের নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত জাটকা ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বর্তমানে সাগরে জাটকা বড় হচ্ছে। তাই এ সময়ে জাটকা ইলিশ আহরণ ও বিপণন করলে মৎস্য আইনে দ-নীয় অপরাধ। তিনি বর্ষবরণে জাটকা ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত না খাওয়ার পরামর্শ দেন।’

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ‘মৎস্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইন’ অনুযায়ী নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত জাটকা (১০ ইঞ্চির ছোট সাইজের ইলিশ) ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু পহেলা বৈশাখের পান্তা ইলিশের কারণে এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই প্রচুর ইলিশের চাহিদা থাকে। ফলে নিষিদ্ধ মৌসুমে ইলিশ আহরণ করতে গিয়ে জালে প্রচুর জাটকা এবং ইলিশ ধরা পড়ে। এতে দেশে ইলিশ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

পান্তা-ইলিশ বাঙালির বর্ষবরণের ঐতিহ্য নয়। বর্ষবরণের নামে বেড়ে ওঠার মৌসুমে ধরা হচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ইলিশকে রেহাই দেওয়ার কথা বলেছেন অনেকে। ইলিশের পরিবর্তে আলু ভর্তা, শুটকি ভর্তা, পোড়া মরিচ, কাঁচা মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত এবং আবহমান কাল ধরে গ্রাম বাংলায় যে কোন উৎসব পার্বণে চলে আসা মুড়ি মোয়া, গুড়ের মাখানো খৈ, কদমা (কদম ফুলের মতো চিনির নাড়–) ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, বৈশাখের সাথে ইলিশের কোনও সম্পর্ক নেই। গ্রামে অনেকের ইলিশ খাওয়ার সামর্থ্য নেই। অথচ বর্ষবরণের নামে আমরা মা ইলিশ খাচ্ছি, ডিমও খাচ্ছি, জাটকাও খাচ্ছি । ভবিষ্যতের ইলিশগুলোকে শেষ করে দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘দেশে খাদ্যের অন্যতম যোগানদাতা গ্রামের কৃষক ও খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। সাধারণত রাতের খাবারশেষে অবশিষ্ট ভাত সংরক্ষণের জন্য পানি দিয়ে রাখা হয়। পানি দিয়ে সংরক্ষিত এই খাবারই মূলত: পান্তা ভাত। কৃষকরা মাঠে কাজ করার সময় এ পান্তা ভাত খায়। দরিদ্রদের এই পান্তা খাওয়া কিন্তু কোন শখের বিষয় নয়। গ্রামের মানুষ পান্তা ভাত খায় লবণ ও মরিচ মাখিয়ে। তাই অনেকে পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশকে দেখছেন বাঙালির প্রান্তিক মানুষের প্রতি উপহাস ও ব্যঙ্গ হিসেবে।’

‘পান্তা-ইলিশ’ বাঙালির বর্ষবরণের ঐতিহ্য নয় উল্লেখ করে মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘১৫ থেকে ২০ বছর আগেও এটা নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে অতি উৎসাহী কিছু লোকের মধ্যে বাংলা বর্ষবরণের দিন পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও জাটকা নিধন বন্ধের স্বার্থে এ প্রবণতা হ্রাস পাবে বলে মনে করি।’

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট