চট্টগ্রাম সোমবার, ১০ মে, ২০২১

১৪ এপ্রিল, ২০২১ | ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম  

‘হালখাতা’র সেই আমেজ নেই

প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে পণ্য কেনা, টাকা পরিশোধ কিংবা বাকির হিসাব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসেই পাওয়া যায়। তার সাথে রয়েছে বাকিতে পণ্য বিক্রির প্রবণতা কমে যাওয়া। এসব কারণে বাংলাদেশের ওয়ালস্ট্রিটখ্যাত খাতুনগঞ্জে ‘হালখাতা’ উৎসবের আমেজ ধীরে ধীরে কমে আসছিল। করোনা মহামারউ সেই ক্ষীণ আমেজটুকুও কেড়ে নিয়েছে। একারণে এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রে গতবারের ন্যায় এবারো হালখাতার উৎসবের আমেজ নেই বললেই চলে। এখানে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী বিশেষ করে সনাতন ধর্মের ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখের দিন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করছেন।

অপরদিকে, বন্দর নগরীর অপর পাইকারি বাজার পাহাড়তলী বাজারে একমাস আগেই হালখাতা হয়ে গেছে। পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম নিজাম উদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, গতবছর করোনার কারণে তারা হালখাতা অনুষ্ঠান করতে পারেননি। তাই এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগেই গত ১৪ মার্চ এই বাজারে সব ব্যবসায়ী হালখাতা অনুষ্ঠান সেরে ফেলেছেন।

বাংলা বছরের শুরুর দিনটিতে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার হিসাব নিকাশ নতুন খাতাতে শুরু করেন। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় হালখাতা অনুষ্ঠান। আর পুরনো বছরের হিসাব বন্ধ করে নতুন হিসাব খোলা হয় যে খাতায়, সেটাই ‘হালখাতা’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের ওয়ালস্ট্রিটখ্যাত খাতুনগঞ্জের প্রতিটি দোকানে একসময় হালখাতা খোলা হতো উৎসবের আমেজে। পুরানো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাব খোলার সময় ক্রেতাদের আপ্যায়ন করা হত নানা পদের মিষ্টি, নাড়–সহ নানা মুখরোচক খাবার দিয়ে। কেউ কেউ উপহারও পাঠাত। সারাবছরের পাইকারি ক্রেতারা যখন তাদের দেনা মিটিয়ে দিতেন তখন বাকির কিছু অংশ মওকুফও করে দেয়া হত। পহেলা বৈশাখ হালখাতার উৎসবকে কেন্দ্র করে এখন আন্দরকিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গায় বইসহ অফিসের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রির দোকানগুলোতে নানা আকারের ও নানা ডিজাইনের হালখাতা বিক্রির হিড়িক পড়তো। খাতা বিক্রি অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার একেবারেই কম।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগির আহমদ পূর্বকোণকে বলেন, একসময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। দুর-দুরান্ত থেকে পাইকারি ক্রেতারা এসে হিসাব করে টাকা পরিশোধ করতেন। এখন ব্যাংকের মাধ্যমে দেনা-পাওনা লেনদেন হয়ে যাচ্ছে। হিসাব মেইলে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং চালু আছে। সুতরাং বৈশাখের প্রথম দিন টাকা পরিশোধের জন্য কাউকে আসতে হয় না। পুরানো এই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে।

খাতুনগঞ্জের খুবই কম সংখ্যক ব্যবসায়ী হালখাতা খুলেন। আর করোনার কারণে তাতেও ভাটা পড়েছে। তবে একথা সত্য যে, আমরা আমাদের ঐহিত্য ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।  খাতুনগঞ্জ হামিদ উল্লাহ বাজার আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, একসময় রীতি ছিল ক্রেতারা পহেলা বৈশাখের আগে এসে টাকা পরিশোধ করবেন।

কিন্তু তা কমতে কমতে এখন একেবারে কমে গেছে। পাইকারি ক্রেতাদের দাওয়াত দেয়া হত হিসাব শেষ করার জন্য। তাদের মিষ্টি খাওয়ানো হত। কিছু মওকুফ করে বছরের হিসাব সম্পন্ন করা হত। কেউ কেউ খাবারের আয়োজনও করতো। পাইকারি ক্রেতাদের মাঝে বাকি পরিশোধ করার প্রবণতা কমে গেছে। পরে দিব। এই ধরনের মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে। সময়ের সাথে এই প্রথায়ও পরিবর্তন ঘটছে।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, করোনার কারণে গত বছরও তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হালখাতা খুলতে পারেননি। এবার পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একসময় তারা হালখাতার খোলার জন্য তাদের ক্রেতাদের কার্ড দিয়ে দাওয়াত দিতেন। মিষ্টি খাওয়াতেন। আগের বছরের যত বাকি সব তুলতেন। নিজেদের কাছে কেউ পেলে তাও দিয়ে দিতেন। একটা উৎসবের আমেজ ছিল। এখন সেই আমেজ নেই। তবে এখনো পহেলা বৈশাখের দিন কেউ কেউ মিলাদ এবং দোয়ার আয়োজন করে।

খাতুনগঞ্জের ডাল ব্যবসায়ী অজয় দত্ত জানান, পাইকারি ক্রেতারা নগদে নিয়ে যাচ্ছে। বাকি টাকা বাকি থেকে যাচ্ছে। তাই হালখাতা খোলা হলেও পুরানো হিসাব রয়ে যাচ্ছে। তবে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান তারা করছেন। সকাল ৭টায় ব্রাহ্মণ এসে খাতার একটি পৃষ্ঠায় আশীর্বাদসুচক শুভ হালখাতার মহরত লেখে দেন। ব্রাহ্মণ পূজার কাঁচা হলুদ, ফুলসহ উপকরণ সামগ্রি নিয়ে আসেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে সাজানো হয়। তারপর পূজা দেয়া হয়। এরপর ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়ানো হয়। গুদাম এবং দোকানে নতুন কিছু পণ্য ঢুকানো হয়। মুরুব্বিদেরর কদমবুচি, করমর্দন করে বখশিস দেয়ারও রেওয়াজ রয়েছে। তবে করোনার কারণে আগের মত উৎসবের জৌলুস নেই।

খাতুনগঞ্জের আরেক ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক পূর্বকোণকে বলেন, আর্থিক প্রতারণার কারণে ব্যবসায়ীদের মাঝে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা নগদে লেনদেন করতে পছন্দ করে। একসময় হালখাতার খোলার জন্য ঝাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ছিল। এখন তা নেই বললেই চলে। একদিকে, করোনা মহামারী অপরদিকে আস্থার সংকট। এই দুই কারণে উৎসবে ভাটা পড়েছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক সময় সর্বজনীন উৎসব হিসেবে ‘হালখাতা’ ছিল বাংলা নববর্ষের প্রাণ। ১৫৮৪ সালে ১০-১১ মার্চ সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তনের পর থেকেই ‘হালখাতা’র প্রচলন হয়। অতীতে জমিদারকে খাজনা দেওয়ার অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ প্রচলিত ছিল। বছরের প্রথম দিন প্রজারা সাধ্যমতো ভালো পোশাক পরে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করতেন। তাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। জমিদারী প্রথা উঠে যাওয়ায় পুণ্যাহ বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু হালখাতা যেহেতু ব্যবসায়ীরা পালন করতেন তাই এটি অক্ষুণ্ন আছে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 149 People

সম্পর্কিত পোস্ট