চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

৮ মার্চ, ২০২১ | ৪:০১ অপরাহ্ণ

মিটু বিভাস 

দেশে করোনার এক বছর: অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে মধ্যরাতে পাগল প্রায় বিশ্বজিত

এখনো মুখে কথা ফোটেনি শিশুটির। তাকে ঘিরেই এখন পরিবারের সব আনন্দ উল্লাস। বাবা বিশ্বজিত রায়ের সব স্বপ্ন এখন আট মাসের শিশু প্রথম রায়কে ঘিরে। অথচ এ শিশুর জন্মের সময় কত না ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে পরিবারকে। জুন মাসের প্রথম দিকে সন্দ্বীপের এ পল্লী চিকিৎসক বিশ্বজিত সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরীর উত্তর কাট্টলীতে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিলেন। ১৬ জুলাই মধ্যরাত থেকে এ ওয়ার্ডে চলছিল লকডাউন। ১৯ জুন সন্ধ্যায় আত্মীয়ের বাসায় প্রসব বেদনা উঠে স্ত্রী লিপি রায়ের। স্ত্রীকে নিয়ে মহাবিপদে পড়ে যান তিনি। লকডাউনে রাস্তা জনশূন্য।

স্ত্রীকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য কোন যানবাহন পাচ্ছেন না। আত্মীয় স্বজনরা নানাভাবে চেষ্টা করছিলেন লিপিকে হাসপাতালে পাঠানোর। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছিল না। স্থানীয় মনিটরিং সেলে ফোন করেও কোন সাহায্য পাননি। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা প্রায় পাগল ছিলেন বিশ্বজিত। চারঘণ্টা পর স্থানীয় এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে রেডক্রিসেন্ট। এম্বুলেন্সে করে স্ত্রীকে নিয়ে এ কে খানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি। ওই রাতে তাদের কোল জুড়ে আসে প্রথম সন্তান প্রথম রায়। লকডাউনের সে দিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে এখনো শিউরে উঠেন বিশ্বজিত।

কোভিড-১৯ এর প্রকোপে গতবছরের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী লকডাউন সবে মাত্র শিথিল হয়েছে। টানা বন্ধে খেয়ে না খেয়ে দিন অতিবাহিত করা দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নিম্ন মধ্যবিত্তরা আবারো বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। এর মধ্যে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১০নং ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়। ওয়ার্ডের ২০টি প্রবেশ পথের মধ্যে ১৪টি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়ে ১৬ জুন মধ্যরাত থেকে পরীক্ষামূলকভাবে নগরীর প্রথম ওয়ার্ড হিসেবে শুরু হয় লকডাউন।

ফলে আবারো বিপদে পড়ে এখানকার এসব খেটে খাওয়া মানুষগুলো। সরকারি-বেসরকারি অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই এসব অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে এসেছেন। তবে অর্ধলক্ষাধিক বাসিন্দার ওয়ার্ডে তা ছিল বড়ই অপ্রতুল। এরমধ্যে গরীব অসহায় অনেক পরিবার একাধিক ত্রাণও পেয়েছেন। অন্যদিকে, আবার ভাড়াটিয়া দাবি করে ত্রাণ না দেয়ার অভিযোগও আছে। স্থানীয় বিশ্বাস পাড়ায় বসবাসকারী মো. জালাল বলেন, গত ১৮ বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছি। পুরো পরিবার এখানকার ভোটার। কিন্তু লকডাউনে কোন সাহায্য পাইনি। প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের কাছে ধার-দেনা করে লকডাউনের সময় দু-মুঠো খেয়ে বেঁচেছিলাম।

লকডাউনের শুরুতে দোকানপাট বন্ধ থাকলেও ভ্যানগাড়িতে করে মাছ সবজিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে বিভিন্ন গলিতে বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এতে করে সচ্ছল ব্যক্তিদের তেমন কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্টে ছিলেন নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষ, যারা লোকলজ্জার ভয়ে ত্রাণও নিতে যাননি। ইশান মহাজন সড়কে বসবাসকারী মিলন ভৌমিক স্বল্প আয়ের একটি চাকরি করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তার দুই ছেলে বতর্মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। তিনি জানান, লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে চাকরি ও বেতন দুই বন্ধ। বড় ছেলে কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে নিজের ব্যয় বহন করতো। কিন্তু করোনা প্রকোপে তারও আয় বন্ধ হয়ে যায়। চারজনের পরিবার নিয়ে প্রথম তিন মাস কোনভাবে কেটে গেছে। কিন্তু কাট্টলীতে নতুন করে লকডাউন শুরু হওয়ার পর বেশ কষ্টে ছিলাম। এত বছরের জমানো আয় এবং সাথে চাকরিও হারাতে হয়েছে। তিনি আরো জানান, না খেয়ে থাকলেও কোথাও ত্রাণ আনতে যাইনি।

এলাকায় ছোট্ট দোকানের আয় দিয়ে চলত কুতুব উদ্দীনের সংসার। করোনার শুরু থেকে দোকান বন্ধ থাকায় আয় শূন্যের কোটায় নেমে আসে তার। বিকল্প আয়ের জন্য জুনের শুরুতে ফল ব্যবসায় নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় লকডাউনে দোকান খুলতে না পারায় সব ফল নষ্ট হয়ে যায়।

লকডাউন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ড. নেছার উদ্দিন আহমেদ মঞ্জু পূর্বকোণকে বলেন, লকডাউনে এলাকার মানুষের পাশে থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। চসিক এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে মোট ৮ হাজার প্যাকেট ত্রাণ বিতরণ করেছি। প্রতিদিন দুই হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার এবং ১৬০ কেজি মাছ বিতরণ করা হয়েছে গরীব অসহায়দের মাঝে। ২৫০ স্বেচ্ছাসেবক ও ১০০টি ভ্যান ব্যবহার করা হয়েছে এলাকাবাসীকে হোম ডেলিভারিসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদানের জন্য।

লকডাউনে চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ছিল না। এলাকার অরক্ষিত পথ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারী বাইরে বের হয়েছেন। শুরুর দিকে রাস্তাঘাট জনমানবহীন থাকলেও ধীরে ধীরে এলাকার মধ্যে চলাচলকারী মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে দোকানপাটও খুলেছে বিভিন্ন এলাকায়। তবে এরমধ্যেও লকডাউন সফল বলে জানান কাউন্সিলর মঞ্জু। তিনি বলেন, লকডাউনে আশানুরূপ সাফল্য পেয়েছে এলাকার মানুষ। লকডাউনের শুরুতে ১৪৫ জন করোনাক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু  ১৪ দিনের মাথায় সে সংখ্যা ১১-তে নেমে আসে। এলাকা ভিত্তিক লকডাউনে বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র সফল ওয়ার্ড কাট্টলী।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 467 People

সম্পর্কিত পোস্ট