চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

৭ মার্চ, ২০২১ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম 

আস্থার সংকটে বিদ্যমান আইন অনেকাংশে দায়ী

ব্যাংকাররা মনে করছেন খাতুনগঞ্জের ঐতিহ্য এবং ব্যবসায় আস্থার সংকট সৃষ্টির পেছনে রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন এবং নীতিমালাও অনেকাংশে দায়ী। আইনের দুর্বলতা জেনে অনেক ব্যবসায়ী স্বেচ্ছায় খেলাপি হচ্ছেন। কিছু বড় ব্যবসায়ীর কূটকৌশলের কাছে অনেক সময় ছোট ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে গা ঢাকা দেন।

অপরদিকে, শুধুমাত্র চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জন্য মহাসড়কে ওজন স্কেল স্থাপন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করা এবং নৌবাণিজ্য ক্রমশ কমতে থাকায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা চলে যাচ্ছে। পূর্বকোণের পক্ষ থেকে খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা অফিসে কর্মরত পাঁচ জন কর্মকর্তার সাথে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এসব কথা বলেন।

ব্যাংকাররা জানান, খাতুনগঞ্জে যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই নাজুক। একারণে অনেকের অফিসে যেতে দেরি হয়ে যায়। অনেক বড় শিল্পগ্রুপ এখান থেকে চলে যাচ্ছে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে বসে ব্যবসা করার ঐতিহ্য একসময় ছিল। প্রযুক্তির কারণে এখন তার প্রয়োজন নেই। যেকোন ব্যাংকের শাখা থেকে এলসি খুলতে পারছেন।

তারা বলেন, আস্থার সংকট আরেকটি বড় সমস্যা। স্বেচ্ছায় খেলাপি হওয়া সংস্কৃতি শুরু হয়ে গেছে। আইনের ফাঁক গলিয়ে ব্যাংকের টাকা মেরে দেয়ার প্রবণতা ব্যবসার জন্য খুবই খারাপ একটি সংস্কৃতি চালু আছে। টাকা মেরে দিয়ে খেলাপিরা আদালতের আশ্রয় নেন। বিচার কাজ সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। মামলার মাধ্যমে সময় ক্ষেপণ করে কয়েকবছর পর সুদ মওকুফ করে আসল টাকা ফেরত দিচ্ছে। তাতে ওই ব্যবসায়ী বিনাসুদে ব্যাংকের টাকা খাটিয়ে ব্যবসা করছে। একারণে ব্যাংক এবং গ্রাহকের মাঝে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আইনকে ঢেলে সাজাতে হবে। অর্থঋণ মামলা সর্বোচ্চ এক বছর এবং এনআই এক্টের মামলা তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করলে আত্মসাতের প্রবণতা কমবে।

ব্যাংকাররা বলেন, খাতুনগঞ্জে বড়দের কারণেও অনেক সময় ছোট ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হন। আবার কেউ কেউ ওভারট্রেড করতে গিয়ে টিকে থাকতে পারেন না। তবে একথা সত্য যে যিনি পালিয়ে যান তিনিও অনেকের কাছে টাকা পান। কেউ সেদিকে খেয়াল রাখে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি আদেশ জারি হয়েছে। তাতে বলা হয়, কোন গ্রাহক যে কাজের জন্য ঋণ নেবেন ওই টাকা যেন সেই কাজে ব্যবহার করা হয় তা ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে। যেকারণে ব্যাংকসমূহ অনেক সতর্কভাবে বিনিয়োগ করছে। যাচাই-বাছাই করে ঋণ দিচ্ছে। খাতুনগঞ্জে কোন কোন ব্যাংকের শাখা আছে যারা বাইরের বড় শিল্পগ্রুপের সাথে ব্যবসা করে। ওইসব শিল্পগ্রুপের অফিসে ব্যাংকের লোক সারাক্ষণ দায়িত্ব পালন করে। খাতুনগঞ্জের ছোট ব্যবসায়ীদের সাথে ব্যবসা করার আগ্রহ তাদের কমে গেছে। কারণ ব্যাংক কর্মকর্তারা এখন আর ঝুঁকি নিতে চান না। কারণ ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত তার বলি হতে হয় শাখা প্রধান কিংবা কোন কর্মকর্তাকে।

আস্থার সংকটের জন্য শুধুমাত্র ব্যাংক কিংবা ব্যবসায়ীরা দায়ী নয়। উল্লেখ করে বলেন, এর জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থাও দায়ী।  চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ওজন স্কেলের কারণে অন্য জেলার ব্যবসায়ীদের তুলনায় দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। মংলা কিংবা অন্য কোথাও দিয়ে পণ্য আনা-নেয়া করলে স্বাভাবিক ভাড়ায় আনা যাচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির অনেক অফিস ঢাকায় চলে গেছে। ঢাকায় গিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। জলাবদ্ধতার কারণে পণ্যের নিরাপত্তা নেই। ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামের বাইরেও চলে যাচ্ছে। একসময় ভোগ্যপণ্য আমদানি মানে ছিল খাতুনগঞ্জ। এখন ঢাকার মগবাজার, শ্যাম বাজার, চকবাজারসহ অনেক এলাকায় বড় বড় আমদানিকারক আছেন। যেখানে ব্যবসার খরচ কম সেখানেই ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক।

বাঙালি ব্যাংকিং ব্যবসার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, পশ্চিম পাকিস্তানের ধনকুবেরদের একাধিপত্য মোকাবেলায় ৬০ এর দশকের প্রথম দিকে কিছু স্বাধীনচেতা বাঙালি ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাঙালিদের প্রথম ব্যাংক ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যমন্ত্রী প্রয়াত এম আর ছিদ্দিকী চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাঙালিদের প্রথম বীমা কোম্পানি (৬০ এর দশকের প্রথম দিকে) ইস্টার্ন ইনসুরেন্স কোম্পানি লি.। মুক্তিযুদ্ধের বেশ পূর্বে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা শুরু করেছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দুইটি প্রতিষ্ঠান আর চট্টগ্রামে থাকেনি। স্বাধীনতার পর সব ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি জাতীয়করণ করা হলে ইস্টার্ন ইন্সুরেন্স কোম্পানি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নাম হয় পূবালী ব্যাংক। সদরদপ্তর হয় ঢাকায়।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 227 People

সম্পর্কিত পোস্ট