চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

সর্বশেষ:

৩ মার্চ, ২০২১ | ২:২০ অপরাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

স্থবির উন্নয়ন কার্যক্রম

তিনদিন ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ইটভাটাগুলোতে বন্ধ রয়েছে ইট বিক্রি। ইটভাটার ছাড়পত্র নবায়ন না করা ও শুধুমাত্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলার কারণে চট্টগ্রাম ইট প্রস্তুত মালিক সমিতির ডাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইট বিক্রি বন্ধ রেখেছে। দুই শতাধিক ইটভাটায় ইট বিক্রি বন্ধ থাকায় স্থবিরতা নেমে এসেছে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

ইট বিক্রেতাদের ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব পড়বে চলতি অর্থবছরের চট্টগ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে। ইট প্রস্তুত মালিক সমিতির নেতারা বলেন, সারাদেশে একই ধরনের ইটের ভাটা রয়েছে। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইটের ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। যা অনেকটা এ অঞ্চলের উন্নয়ন কাজে প্রতিবন্ধকতার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা মনে করছেন ইটের ভাটার মালিকরা।

দোহাজারী সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ জানান, দোহাজারী সড়ক বিভাগে বর্তমানে সাতটি বড় প্রকল্পে প্রায় ৩ শ’ কোটি টাকার কাজ চলছে। এরমধ্যে বেশকিছু সড়ক আছে যেখানে সাববেইজ করতে ইটের বিকল্প নেই। যথাসময়ে ইট পাওয়া না গেলে এসব প্রকল্প সমাপ্ত করা যাবে না। সামনে বর্ষা শুরু হলে আর কাজ করা সম্ভব হবে না। আমরা আশা করবো আলোচনার মাধ্যমে ইটভাটা মালিকদের এ সংকটের সুষ্ঠু সমাধান হবে। নয়তো সরকারের উন্নয়ন কাজে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। 

ইট প্রস্তুত মালিক সমিতির আহবায়ক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, আমাদের জন্ম বৈধভাবেই হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে ইটভাটা আইন হয়েছে। শুরুতে ড্রাম চিমনির ইটের ভাটায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র দিয়েছে। পরবর্তীতে বলা হলো চিমনি ১২০ ফুট করতে হবে। তাও করা হলো। এরপর বলা হলো জিগজাগ ইটের ভাটা করতে হবে। তাও করা হলো। হঠাৎ করে আইনের সংস্কারে ২০১৬ সাল থেকে আমাদের ছাড়পত্র মিলছে না। সারাদেশে একই অবস্থা। কিন্তু শুধুমাত্র চট্টগ্রামের ইটের ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, একটি ইট ভাটায় বিভিন্ন কাজের তিন থেকে চারশো শ্রমিক জড়িত। আমাদের সমিতির সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ১৮১। প্রতিটি ইটের ভাটায় গড়ে প্রায় ১০ হাজার ইট বিক্রি হয়। সেই হিসাবে প্রতিদিন এক কোটির বেশি ইট বেচাকেনা হয়। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থায় যে দরপত্র দেয়া হয় (যেখানে ইটের কাজ থাকে) তার শিডিউল তৈরি করা হয় ইটের মূল্যের উপর। চলতি অর্থবছরে চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলায় যে পরিমাণ উন্নয়নমূলক কাজ চলছে তাতে ৩০ কোটির বেশি ইট লাগবে। প্রতিবছর একেকজন ইট ভাটার মালিক ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু আইনি প্রতিবন্ধকতার কারণে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।

সাতকানিয়ার ৩০টির বেশি ইটের ভাটায় গত তিনদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ইট বিক্রি। এখন চলছে ইট তৈরির মৌসুম। চট্টগ্রাম শহরের প্রতিষ্ঠিত আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ ছাড়া উপজেলার অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকাজে ৩০টির বেশি ইটের ভাটা থেকে ইট সরবরাহ করা হয়। ইট বিক্রি বন্ধ থাকায় এসব কাজে স্থবিরতা নেমে এসেছে। একই অবস্থা লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারাসহ জেলার ১৬ উপজেলায়।

সাতকানিয়া ইট ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম বলেন, অবৈধ ইট ভাটা বন্ধের বিপক্ষে আমরা নই। আমরা বলেছিলাম জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে একটি কমিটি করুক। ওই কমিটি সরেজমিন দেখে ছাড়পত্র দেবে। ছাড়পত্র দিয়েছে বলেইতো আমরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। আইনি জটিলতার কারণে আমরা গত অনির্দিষ্টকালের জন্য ইট বিক্রি বন্ধ রেখেছি।

মিরসরাই সংবাদদাতা জানান, মিরসরাইয়ে ১৪টি ইটের ভাটায় ইট উৎপাদন ও  বিপণন বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে আসা ইট বহনকারী ট্রাক আটকে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। এতে বিঘœ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীর মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজ। অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণাধীন একটি কারখানার সাইট ইঞ্জিনিয়ার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনদিন ধরে আমাদের সাইটে কোন ধরনের ইট আসেনি। এতে শতাধিক নির্মাণ শ্রমিক বসে বসে বেতন নিচ্ছে। ইস্যুটি দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত।

মিরসরাই ব্রিকফিল্ড মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম খোকন জানান, সরকার আমাদেরকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময় দিয়েছিলো। আমরা সরকারকে রাজস্ব দিয়ে ইট উৎপাদন করি। হঠাৎ করে চট্টগ্রামের নতুন সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিতে পারিনি। দুই একদিনের মধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেবো।

রাউজান সংবাদদাতা জানান, রাউজানেও ৯টি ইটভাটা উচ্ছেদ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। উপজেলার ৫১টি ইটভাটার প্রত্যকটি মালিক কর্মচারী এ আন্দোলনের সংহতি প্রকাশ করে ইট বিক্রি বন্ধ রেখেছে। এমনকি এ উপজেলার উপর দিয়ে বিস্তৃত চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক দিয়ে অন্য উপজেলার ইট বহনকারী কোনো ট্রাক, জিপ, মিনি ট্রাক দেখলেই তা আটকে আনলোড করা হচ্ছে। তাদের দাবি পূরণের জন্য এ উপজেলার  ইট প্রস্ততকারী মালিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিকরা আজ-কালের মধ্যে উপজেলা সদরে মানবন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করবেন বলেও তাদের নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যে জানিয়েছেন।

এদিকে ইট বিক্রি বন্ধের পর থেকে রাউজানে সরকারি-বেসরকারি এবং সাধারণ মানুষের ঘর-বাড়ি-দালান স্থাপনা নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। এ কারণে কয়েকদিন ধরে কমে গেছে লোহার রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী বেচা-বিক্রি।

এ প্রসঙ্গে ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতি রাউজানের সমন্বয়কারী আজিজুল হক কোম্পানি ও সৈয়দ হোসেন কোম্পানি বলেন, পুরো বাংলাদেশে ইটভাটা চালু থাকলেও শুধু চট্টগ্রামের ইট ভাটাগুলো অভিযান করে বন্ধ করা হচ্ছে যা সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 1353 People

সম্পর্কিত পোস্ট