চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

সর্বশেষ:

৩ মার্চ, ২০২১ | ২:১৪ অপরাহ্ণ

সেকান্দর আলম বাবর, বোয়ালখালী

রইস্যারমার ঘাট বধ্যভূমি: স্মৃতিচিহ্নের স্থানে দালান কোঠা

বোয়ালখালী উপজেলা প্রশাসনিক ভবন ছিল পাক বাহিনীর ক্যাম্প। মুক্তিবাহিনী ও নিরীহ জনগণকে ধরে এনে বর্বরতা চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ রায়খালী খালের রইস্যারমার ঘাটে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। ’৭১-এর এই বধ্যভূমি উপজেলা কার্যালয় থেকে মাত্র ৫ শ’ মিটার দূরত্বে। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এই বধ্যভূমির কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। কালের বিবর্তনে এখানে গড়ে ওঠেছে অনেক বাড়িঘর, দালান কোঠা।

মুক্তিযোদ্ধা বন গোপাল দাশ, আহমদ হোসেন চেয়ারম্যান, শরৎ চন্দ্র বড়ুয়া, শামসুল আলমকে নিয়ে গত সোমবার রইস্যারমার ঘাটে যান এই প্রতিনিধি। রক্তঝরা সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তারা বলেন, ‘উপজেলা হেডকোয়ার্টার ছিল পাক বাহিনীর টর্চার সেল। বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিকামী লোকদের ধরে এনে এখানে নির্যাতন-বর্রবরতা চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হতো। পরে লাশগুলো রইস্যারমার ঘাটে এনে ভাসিয়ে দিত। এই ঘাটে অন্তত ৫-৬ শ’ লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে পাক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। তখন ঝোঁপ-জঞ্জাল ছিল। এখন সেখানে গড়ে ওঠেছে বাড়িঘর, অট্টালিকা। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এই বধ্যভূমিটি।

সরেজমিনে দেখা যায়, রায়খালী খাল এখনো প্রবহমান। তবে খালের তীর দখল করে গড়ে ওঠেছে বাড়িঘর ও দালান। একসময়ে এই ঘাট দিয়ে সওদাগরী পণ্য উঠা-নামা করা হতো। এখন দখল আর ভরাটে ঘাটের চিহ্ন নেই। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-বিজড়িত এই ঘাটে এখন জনবসতি গড়ে ওঠেছে। নির্মাণ করা হয়েছে সারি সারি বাড়িঘর, দালান-কোঠা। মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তালিকায় দেখা যায়, কধুরখীল দুর্গাবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রইস্যার মার ঘাট, পশ্চিম শাকপুরার দারোগা স্কুলের মাঠ, কানুনগোপাড়া আশুতোষ কলেজের সম্মুখ প্রান্তর, করলডেঙ্গার কাজীর ভানজাইল ও কর্ণফুলী নদীর পূর্বপাড় কালুরঘাট সেতু অংশ। এসব মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা করে লাশ ফেলা দেওয়া হয়েছে। নদী ও খাল সংলগ্ন এলাকায় লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হতো। অন্যগুলো লাশ পুঁতে ফেলা হতো।

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফ ও শরৎ চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, ‘কালুরঘাট সেতু সংলগ্ন ছন্দারিয়া খালের মোহনায় আমরা ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে রশিতে বেঁধে লাইন ধরে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভাগ্যক্রমে আমরা দুইজন বেঁচে যাই। নদীতে ভাসতে ভাসতে তীর খুঁজে পাই। অন্যরা পাক বাহিনীর গুলিতে মারা যান।’

সরেজমিন দেখা যায়- কধুরখীল দুর্গাবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম শাকপুরার দারোগা স্কুলের মাঠ এবং কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। অন্য বধ্যভূমিগুলো এখনো অযত্নে-অবহেলায় ও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। অনেকটা ঢেকে গেছে ঝোঁপে-ঝাড়ে ময়লা আবর্জনার স্তূপে।

বোয়ালখালী উপজেলা প্রশাসনিক ভবন ছিল পাক বাহিনী ও এদেশীয় রাজাকারদের টর্চার সেল। সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবন। ’৭১ এর ২৭ আগস্ট উপজেলা সদরের এই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। চার ভাগে ভাগ হয়ে আক্রমণ করেছিলেন। এই সম্মুখযুদ্ধে গ্রেনেড বিস্ফোরণে শহীদ হন ইপিআর হাবিলদার ফজলুল হক (ওস্তাদ ফজলু)। আহত হন রেজাউল করিম বেবী ও সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ। আহত অবস্থায় তাদের আটক করেছিল পাক বাহিনী। এই তিন শহীদের লাশের সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। ১৯৯৬ সালে বোয়ালখালী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে প্রশাসনিক ভবনের সামনে শহীদ ফজলু-বেবি-ওয়াজেদ চত্বর ঘোষণা করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। ২০১০ সালে ইউএনও’র বাসভবনের দেয়ালে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ‘যেন ভুলে না যাই’ শিরোনামে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছিল।

কধুরখীল বধ্যভূমি

কধুরখীল দুর্গাবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে ’৭১ সালের ৩১ অক্টোবর ১৬ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে এনে লাইন ধরিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে পাক বাহিনী। এছাড়াও হিন্দু অধ্যূষিত এলাকা ঘিরে কয়েকশ’ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। হত্যা করে লাশগুলো পাশের ডোবায় ফেলা হতো। এই বধ্যভূমি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় ছিল। ২০১২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন তৎকালীন সাংসদ প্রয়াত মঈন উদ্দিন খান বাদল। এসএস পাইপ ও মার্বেল পাথরে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিচিহ্ন। এতে ৪৫ জনের নামফলক রয়েছে।

শাকপুরার দারোগা স্কুল মাঠ

’৭১-এর ২০ এপ্রিল পাক বাহিনী ও তাদের দোসরা ভোরে শাকপুরা গ্রামটি ঘিরে ফেলে। এ সময় ২৫০ জন নিরস্ত্র নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। রাস্তার পাশে ডোবায় লাশগুলো ফেলে দেয়া হয়। এটি ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম গণহত্যা। শাকপুরা এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে লাশ ওই স্থানে ফেলে দেয়া হতো বলে জানান এলাকাবাসী। এখানে বহু লোককে হত্যা করা হয়। ১৯৯৫ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে একটি স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালে তা সংস্কার করে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলকে আছে ৭৫ জনের নাম।

কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ

’৭১-এর ১৩ এপ্রিল হত্যা করা হয় অধ্যাপক দিলীপ চৌধুরীকে। ৩১ জুলাই হত্যা করা হয় কলেজ অধ্যক্ষ শান্তিময় খাস্তগীরকে। মুক্তিযুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের নীরব স্বাক্ষী এই কানুনগোপাড়া কলেজ। সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আহমদ হোসেন বলেন, এই পূর্বাঞ্চলের শত শত মানুষকে ধরে এনে কলেজে হত্যা করা হয়েছে। লাশ ফেলে দেয়া হত পাশের গর্তে। মাটি চাপা দেয়া হয়েছে বহু লাশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের পুরাতন ভবনের সামনে অধ্যাপক দিলীপ ও অধ্যক্ষ শান্তিময় খাস্তগীরের নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। কলেজের উদ্যোগে তা করা হয়েছে। তবে গণহত্যার কোনো স্মৃতিচিহ্ন এখানে আর নেই।

ঐতিহাসিক কালুরঘাট সেতু

মুক্তিযুদ্ধে নানা ঘটনার সাক্ষী কালুরঘাট সেতু। ১০ এপ্রিল পাক বাহিনী ও তার দোসররা কালুরঘাট এলাকা দখলে নেয়। সেতুর পূর্বপাড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়। রেল থামিয়ে তল্লাশি করা করা হতো। সন্দেহভাজন লোকদের ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে নদীতে ফেলা দেওয়া হতো। এখানে অন্তত ৪ হাজারের অধিক লোককে হত্যা করা হয়েছে বলে জানান মুক্তিযোদ্ধা শরৎ চন্দ্র বড়ুয়া।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বন গোপাল দাশ বলেন, প্রশাসনের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে বধ্যভূমিগুলো আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।

সহকারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শামসুল আলম বলেন, করলডেঙ্গার ধোরলা কাজীর ভানজাইলে অন্তত ৫ শতাধিক লোককে হত্যা করে পুঁতে ফেলা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, এখানে বধ্যভূমির কোনো চিহ্ন নাই। এলজিইডি একটি কালভার্ট নির্মাণ করেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের জন্য তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয়।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 147 People

সম্পর্কিত পোস্ট