চট্টগ্রাম রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

সর্বশেষ:

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | ১২:০৯ অপরাহ্ণ

ইফতেখারুল ইসলাম 

বার বার আর্থিক প্রতারণা আস্থার জায়গায় ‘চিড়’

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ব্যবসা হয় আস্থা এবং বিশ্বাসের উপর। আর্থিক প্রতারণার কারণে সেই আস্থায় চিড় ধরেছে। এখন অনেক ব্যবসায়ী প্রতারণার শিকার হয়েও চুপ থাকেন। গোপনে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। ব্যবসায়ীরা এর জন্য আইনের দুর্বলতাকে দুষছেন।

১৯৮৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই ধরনের আর্থিক প্রতারণার ৬৭টি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। অনেক ঘটনা অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। প্রকাশিত ঘটনাসমূহের অর্থ যোগ করলে দাঁড়ায় হাজার কোটি টাকা। মূলত ওভারট্রেডিং করতে গিয়েই অনেক ব্যবসায়ী হঠাৎ করে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হন। আবার ডিও ব্যবসার মাধ্যমে পণ্যের দাম অনেক সময় এমনভাবে উঠে যা শেয়ার বাজারকেও হার মানায়। পতনের ঘটনাও একই গতিতে ঘটে। এসময় যারা বেশি দামে ডিও কিনে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।

প্রতারণা রোধে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেক ব্যবসায়ী। কেউ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ধরে এনে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আর কেউ যাতে তার সাথে ব্যবসা করতে না পারে তার উদ্যোগ নিতে পারে। নেতৃত্বের দুর্বলতা কিংবা দূরদর্শীতার অভাবের কারণে এধরনের পদক্ষেপ কম বলে উল্লেখ করেন।

একাধিক ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, আশির দশকের শেষের দিক থেকে খাতুনগঞ্জ এবং আশপাশের ব্যবসায়িক পরিবেশ পরিবর্তিত হতে থাকে। শুরু হয় নতুন ব্যবসা ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) বেচাকেনা এবং ‘টো টো’ পদ্ধতি। ডিও বেচাকেনায় বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়ে না। আর টো টো হল সুদের কারবার। নব্বইয়ের পুরো দশকজুড়ে ছিল এই নব পদ্ধতির অধ্যায়। এই দুই পদ্ধতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়েছে। পথে বসেছে। পাওনাদারের চাপ সইতে না পেরে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। ১৯৮৬ সালে বিভুতি রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের শতবর্ষের ব্যবসায়িক আস্থা ও বিশ্বাসের ঐতিহ্যে চিড় ধরান। একই বছর নুর জাহান ট্রেডার্স তিন লাখ টাকা মেরে দেয়। এরপর চার বছর এই ধরনের ঘটনা বন্ধ ছিল।

১৯৯০ সালে ইসহাক ব্রাদার্স দেড় কোটি টাকা মেরে দেয়। ১৯৯২ সালে কান্তি সাহা আত্মসাৎ করেন তিন কোটি টাকা। পরের বছর ৯৩ সালে বিশ্বনাথ স্টোর আত্মসাৎ করে চার কোটি টাকা। ১৯৯৪ সালে সাতটি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সিরাজ মিয়া তিন কোটি টাকা, উত্তম সাহা এক কোটি টাকা, মো. ওসমান ৫০ লাখ টাকা, সুভাষ সাহা এক কোটি টাকা, হাবিব ব্রাদার্স দুই কোটি টাকা, অন্নপূর্ণা ভা-ার সাড়ে তিন কোটি টাকা, এবং গৌর ভা-ার তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। ১৯৯৫ সালে হারাধন ব্রাদার্স এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এরপর পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে ২০০০ সালে ৮টি কেলেংকারি ঘটে। এর মধ্যে জি আর ট্রেডিং চার কোটি টাকা, অজিত মিলন কান্তি চৌধুরী ৬ কোটি টাকা, ইলিয়াছ সওদাগর এক কোটি টাকা, আল মদিনা ট্রেডিং দুই কোটি টাকা, আলম ফুড তিন কোটি টাকা, মুসলিম ব্রাদার্স এক কোটি টাকা, এইচ এইচ ব্রাদার্স ৫০ লাখ টাকা, এস পি ট্রেডিং এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।

চার বছর পর ২০০৪ সালে ছয়টি প্রতারণার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সালফা ইন্টারন্যাশনাল ৬ কোটি টাকা, এম এম ব্রাদার্স দুই কোটি টাকা, মনসুরী বিক্রমী সাহা দেড় কোটি টাকা, জয়শ্রী ভান্ডার এক কোটি টাকা, ছাবেরিয়া বাণিজ্যালয় দেড় কোটি টাকা, আর পি সত্যবাবু দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। ২০০৬ সালে ৬টি প্রতারণার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বাগদাদ ট্রেডিং (এনাম) ১০ কোটি টাকা, ইউনিক ট্রেডিং এক কোটি টাকা, জে এন্ড জে ট্রেডিং ৫ কোটি টাকা, আল নুর ট্রেডিং তিন কোটি টাকা, থ্রী স্টার সিন্ডিকেট এক কোটি টাকা, আল হোসাইন ব্রাদার্স ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। ২০০৭ সালে চারটি প্রতারণার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে আত্মসাৎ করে জোবাইর জাকের হাজী তিন কোটি টাকা, রহমানিয়া স্টোরস দুই কোটি টাকা, বেঙ্গল ট্রেডার্স এক কোটি টাকা, মিন্টু দে দুই কোটি টাকা। ২০০৮ সালে ৯টি প্রতারণার ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল মৌলভী আলমের ৯০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা। পরে অবশ্য ব্যবসায়ী সংগঠনের উদ্যোগে কিছু টাকা উদ্ধার হয়। এরপর রবিউল ট্রেডিং (হামিদ) দুই কোটি টাকা, মোহাম্মদ শফি ৫০ লাখ টাকা, নুরুল আলম চৌধুরী ১৩ কোটি টাকা, আবছার-মুসা ব্রাদার্স ২১ কোটি টাকা, শাহাজাহান ট্রেডার্স ২৪ কোটি টাকা, লোকনাথ স্টোর দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা, আলম তারা ইয়াসিন/শাকিল ৩০ কোটি টাকা, খোরশেদ (এশিয়া মার্কেট) সাড়ে তিন কোটি টাকা, ২০০৯ সালে মামুন (আজিজ সন্স) ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) জালিয়াতি করে দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। পরে ৬৫ শতাংশ দিয়ে এটি মীমাংসা করা হয়। ২০১০ সালে পায়েল আশুতোষ মহাজন ৯০ কোটি টাকা এবং ২০১১ সালে চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ/চৌধুরী ব্রাদার্স ১৪৫ কোটি টাকার প্রতারণা করে রেকর্ড সৃষ্টি করে। ২০১১ সালে বাবুল স্টোর ৬ কোটি টাকা এবং রিজিয়া স্টোর দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। ২০১২ সালে শাহ আলম দুই কোটি টাকা এবং শ্রী গোবিন্দ স্টোর ২১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। ২০১৩ সালে সাতটি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দেবু মহাজন (ডাল ব্যবসায়ী) ৮ কোটি টাকা, শাহজালাল অয়েল (সেলিম) চার কোটি টাকা, গৌরি স্টোর (অজয় চৌধুরী) চার কোটি টাকা, জয় ট্রেডার্স, মা এন্টারপ্রাইজ (জগন্নাত মিত্র) ৩৭ কোটি টাকা, এম কে ট্রেডার্স (মনসুর) ১২ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে সনজিৎ মল্লিক লাতু চার কোটি টাকা, জহুর আহমদ, কামাল এন্টারপ্রাইজ, ২০১৫ সালে সুজিত কু-ু, ২০১৭ সালে অর্জুন চার কোটি টাকা এবং ২০১৯ সালে শাহ জামাল ৪৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সভাপতি ও চিটাগং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহাবুবুল আলম পূর্বকোণকে বলেন, কিছু লোভী মানুষ যারা খাতুনগঞ্জে ব্যবসা করতে এসে অর্থ আত্মসাৎ করে। তারা আসলে ব্যবসায়ী নয়, প্রতারক। তবে কিছু ব্যবসায়ী নতুন ব্যবসায় নেমে না বুঝে আবার কেউ নিজের আয়ত্তের বাইরে অর্থাৎ ওভারট্রেডিং করতে গিয়ে নিঃস্ব হন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান চেক প্রতারণা প্রতিরোধের আইন দুর্বল। আইনের ফাঁক গলে প্রতারকরা বেরিয়ে যায়। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ আছে যেখানে একটি চেক ডিজঅনার হলে চেক দাতার বাড়ি ঘরের বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্যান্য সব ধরনের সেবা বন্ধ হয়ে যায়। ওই ব্যক্তি সমাজে আর চলতে পারে না। সেসব দেশে চেক একটি স্পর্শকাতর বিষয়। আমাদের দেশেও এসংক্রান্ত আইন আরো কঠোর করা উচিত। একইসাথে যেসব ব্যবসায়ী প্রতারণার আশ্রয় নেয় তাদের সাথে অন্য ব্যবসায়ীরা ব্যবসা না করে তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করার আহ্বান জানান তিনি। ব্যবসায়ী সংগঠন প্রতারণারোধে সবসময় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কারণে গত কয়েকবছর ধরে প্রতারণার ঘটনা কমেছে। তবে কোন কোন ব্যবসায়ী প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক সময় চুপ থাকেন উল্লেখ করে বলেন, প্রতারণার শিকার ব্যবসায়ীরা অনেক সময় মনে করেন, তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর বাইরে জানাজানি হয়ে গেলে তার অন্য ব্যবসায় প্রভাব পড়বে। তাই গোপনে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন।

 

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 958 People

সম্পর্কিত পোস্ট