চট্টগ্রাম সোমবার, ০৮ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | ১২:৩৩ অপরাহ্ণ

এহছানুল হক 

চবি’র প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জীবনগাঁথা

অদম্য শক্তিতে অন্ধত্ব জয়

ছয় মাস বয়সে মায়ের কোল থেকে পড়ে গিয়ে দৃষ্টি হারাই। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না বলেই চোখের আলো আর ফিরে পাইনি। পরবর্তীতে বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে কিশোরগঞ্জ থেকে মায়ের সাথে চলে আসি চট্টগ্রামে। বাবা পাহাড়তলী রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরি করলেও বিদ্যালয় থেকে যে বেতন পেতেন তা দিয়ে চলতে আমাদের কষ্ট হতো। তাই বাবা আমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভর্তি করে দেন চট্টগ্রামের মুরাদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সরকারি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে।

এরপর থেকেই শুরু হয় অন্ধত্বকে নিয়েই আমার জীবন সংগ্রাম। বিদ্যালয়টি আবাসিক হওয়ায় আমার পড়ালেখা চালিয়ে যেতে তেমন অসুবিধা হয়নি। সেখানে আমি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া স্কুলে। এ স্কুল থেকে ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাস করে ভর্তি হই চট্টগ্রামের পাহাড়তলি কলেজে। ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করি।

নার্সারি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা চালিয়ে যেতে আমার কোন অসুবিধা না হলেও যখন উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম নিতে যাই তখন বিভিন্ন ঝামেলায় পড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম নিতে গেলে এক সেকশান অফিসার আমাকে ‘অন্ধ’ দেখে কাগজপত্রগুলো মাটিতে ফেলে দেয় এবং চিৎকার করে বলেন ‘তুই অন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বি কেমনে?’। কথাটা শুনে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। বিষয়টি আমার এলাকার এক বড় ভাই দেখলে তিনি কাগজগুলো তুলে নেয়ার জন্য সেকশান অফিসারকে ধমক দেন।

বড়ভাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ধমক খেয়ে সেকশান অফিসার কাগজগুলো তুলে আনেন। ফরম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালোভাবে পাস করি। ভর্তি হই ইতিহাস বিভাগে। তখন কিন্তু কোটা পদ্ধতি ছিল না। পরে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে কৃতীত্বের সাথে বিএ (অনার্স) ও এমএ (মাস্টার্স) ডিগ্রি শেষ করি। এছাড়া আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসএড ডিগ্রি সম্পন্ন করি।

পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু সব জয়গায় দরখাস্ত গ্রহণ করা হলেও অন্ধ বলে কেউ নিতে চাইত না। অবশেষে যে স্কুল থেকে পড়ালেখা শুরু করি সে স্কুলেই চাকরি জুটলো। ২০০৪ সালের দিকে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। যোগদানের পর থেকে এখনও পর্যন্ত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে (হাতে ধরে ধরে বর্ণ চেনানো ও বর্ণ বুঝানো) শিক্ষা দিচ্ছি। বর্তমানে আমি বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন করছি। কথাগুলো বলছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মো. মোখলেছুর রহমান মুকুল।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা তুলে ধরে মুকুল আরও বলেন, যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা দিতে যাই তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায়নি আমি পরীক্ষা দিই। কারণ আমি পরীক্ষা দিলে আমাকে প্রশ্ন বুঝিয়ে দেয়ার জন্য একজন শিক্ষককে দায়িত্বপালন করতে হবে। আমাকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হচ্ছে না, বিষয়টি যখন আমার সহপাঠীসহ সাধারণ ছাত্ররা জানতে পারেন তখন তারা সবাই আমার পক্ষ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাদের অবস্থানের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইন করতে বাধ্য হয় যে ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা পরীক্ষা দিতে পারবেন’। কারণ আমি ছিলাম চবি’র প্রথম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন মোখলেছুর রহমান মুকুল। তবে এ অর্জন নিজ চোখে দেখতে পারছেন না বলে খানিকটা কষ্টের মধ্যে থাকেন দু-চোখের দৃষ্টি হারানো এই শিক্ষক।

শুধু শিক্ষক হয়ে থেমে থাকেননি মুকুল। ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের প্রতি আসক্তি ছিল, হয়েছেন একজন ভালো মানের গায়কও। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের এ-গ্রেডের শিল্পী হিসেবে গান করছেন। দেশের বিভিন্ন ইলেক্ট্রিক মিডিয়ায় একক সঙ্গীত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে মুকুল অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। তবলা, হারমোনিয়াম, বেহালা, বাঁশি, দোতারা, রাবার, কি-বোর্ড ইত্যাদি নিখুঁতভাবে বাজাতে পারেন মুকুল। এছাড়া গানের নেশা থেকে দক্ষিণ খুলশীস্থ ঝাউতলা বাজারে প্রতিষ্ঠা করেছেন মুকুল সঙ্গীত একাডেমি। যেখানে প্রতিদিন গান শিখছেন ৬০ জনেরও অধিক শিক্ষার্থী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক।

মুকুল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে পৌঁছে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। কর্মই তাকে  গোটা দেশের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও একজন মানুষ সফল হতে পারে সেটা দেখিয়েছেন মুকুল। শত প্রতিকূলতা পার হয়েও নিজেকে বিখ্যাত করেছেন সবার কাছে। অন্ধত্ব কখনো তাকে আটকে রাখতে পারেনি। মুকুলই প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তিই মানুষকে বড় করে তোলে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 177 People

সম্পর্কিত পোস্ট