চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৫ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | ৬:২৪ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

বাধা ডিঙিয়ে গবেষণায় সেরা

অভিজ্ঞ ও দক্ষ গবেষক আছে। আছে গবেষণার বিষয়ও। অথচ নেই উন্নত মানের কোন গবেষণাগার। গবেষণা কাজের জন্য যে প্রযুক্তি আছে, তাও অপ্রতুলএ বেশিরভাগই ঢাকা নির্ভর। এতকিছুর পরও থেমে নেই চট্টগ্রামের এক দল গবেষকের গবেষণা কর্ম। অনাকাঙ্ক্ষিত সকল বাধা অতিক্রম করে চালিয়ে যাওয়া তাদের গবেষণা জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও।

এমনই এক সুখবর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা ডাটাবেজ ‘স্কোপাসের’ র‌্যাঙ্কিংয়ে। সেখানে স্থান পেয়েছেন চট্টগ্রামের গবেষকরা। প্রতিবছর গবেষণা তালিকা ও গবেষকদের অবস্থান প্রকাশ করে থাকে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটাবেজ স্কোপাস। তালিকায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের মধ্যে সেরা ১৫ তে স্থান নিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্ম।

তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম থেকে তিন শতাধিক  গবেষকের ৮শ’টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গবেষণা কর্ম প্রকাশ হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) থেকে। তাদের ২৭৩টি প্রকাশনার মধ্যে প্রকৌশল, জীববিজ্ঞান, পরিবেশ ও রসায়ন বিষয়ক গবেষণার আধিক্য ছিল । এছাড়াও রয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৬৪টি। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম থেকে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রকাশিত হয় ১৩৮টি প্রকাশনা। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০৮ টি প্রকাশনা রয়েছে। এরবাইরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে ৩৬টি,  বিজিসি ট্রাষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩৪টি,  ইউএসটিসি থেকে ৩১টি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে ২৬টি এবং সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৪টি স্কোপাসে অন্তর্ভুক্ত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। র‌্যাঙ্কিং তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রামের গবেষকদের মধ্যে সর্বাধিক প্রকাশনা রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলিমের এবং বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষক ড. তালহা বিন এমরানের।  ড. আব্দুল আলিম গবেষণা করেন সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে এবং তাপ সহনশীলতা সম্পর্কে। আর ড. তালহা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ নির্যাসের ঔষধি গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তী অবস্থানে রয়েছেন চুয়েটের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল হাসান সরকার। তিনি গবেষণা করেন সাইবার সিকিউরিটি ও মেশিন লার্নিং নিয়ে।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন নবায়নযোগ্য শক্তি, সোলার সেল ও ফটোনিক ডিভাইস নিয়ে চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূইয়া এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আতিয়ার রহমান। ফাংশনাল ফুড বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের গুণাগুণ বিশ্লেষন করে তার মধ্যে ঔষধ হওয়ার সম্ভাব্যতা অনুসন্ধান করে দেখেন ড. আতিয়ার।

চতুর্থ অবস্থানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগের ড. শরিফুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাত হোসেন এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এম এ এম জুনায়েদ সিদ্দিকি ও মোহাম্মদ আহসানুল হক। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছেন চুয়েটের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন। পরবর্তী অবস্থানে আছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের আসাদুজ্জামান এবং ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগের মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান।

এছাড়াও শীর্ষ ১৫ গবেষকের তালিকায় আরও স্থান করে নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. ফজলুল কাদের, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন, চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. হিমেল চৌধুরী ও ড. তমাল বি চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের গিয়াসউদ্দিন এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলোক পাল, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অলি আহমেদ পলাশ ও বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ নোমান।   

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণা সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘যারাই গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন বা যাদের কাজের উৎসাহ আছে, তাদের সব সময় সহযোগিতা দেয়ার পাশাপাশি উৎসাহও দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। পাশাপাশি গবেষনা সেলের পক্ষ থেকেও গবেষণা কজের জন্য আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। আশা রাখি সামনেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে, সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামে যে পরিমাণ গবেষক রয়েছেন, তাতে বর্তমান সময়ের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু উন্নত মানের কোন গবেষণাগার না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া গবেষণা কাজের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োজন, তা একেবারেই অপ্রতুল। যার কারণে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পাশাপাশি গবেষণা কাজের অর্থায়নের দিকেও পুরোপুরি পিছিয়ে। সরকারি গবেষণা অনুদানেও অনেক ক্ষেত্রেই চট্টগ্রামের গবেষকেরা প্রাধান্যও ঠিক মতো পাননা। তাই দক্ষ গবেষক থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করা হয়ে ওঠে না ।

যদিও এত কিছুর মাঝেও চট্টগ্রামের এত সংখ্যক তরুণ গবেষকদের স্পৃহা আর উৎসাহকেই সবচেয়ে ইতিবাচক মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাই এসব কাজকে এগিয়ে নিতে এবং চট্টগ্রামকে বিশ^ দরবারে তুলে ধরতে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান সমূহকে এগিয়ে আসার আহ্বান গবেষকদের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলিম বলেন, গবেষণার কাজে সবচেয়ে বড় বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ফান্ড।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এম জুনায়েদ সিদ্দিকি বলেন, চট্টগ্রামে অসংখ্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ গবেষক আছেন। কিন্তু পরিবেশ গবেষণাগারসহ সহযোগিতার অভাবে কাজ করতে পারছেন না। বিশেষ করে এসব গবেষণা ক্ষেত্রে আর্থিক ফান্ড বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা দূর হলে গবেষণার কাজ আরও সমৃদ্ধ হতো। তাই গবেষণার কাজকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে অর্থনীতির দিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামের শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও এগিয়ে আসতে পারে।

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 350 People

সম্পর্কিত পোস্ট