চট্টগ্রাম বুধবার, ০৩ মার্চ, ২০২১

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

বদলে যাওয়া একটি জনপদের গল্প

২০১৬ সাল। প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে ডিম ছাড়েনি রুই জাতীয় মাছ। স্মরণাতীতকাল থেকে মা মাছ ডিম ছেড়ে আসলেও সে বছর প্রথমবারের মতো এর ব্যত্যয় ঘটে। ঘটনার আকস্মিকতায় ডিম সংগ্রহকারী ও হালদা সংশ্লিষ্টরা বিস্মিত হন। তারপরও তারা আশায় বুক বাঁধেন। হয়তো বিলম্বে হলেও ডিম ছাড়বে মা মাছ। এ জন্য দীর্ঘ তিন মাস অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত ডিম মেলেনি। বিনিময়ে ডিম সংগ্রহকারীদের গুণতে হয় বিশাল আর্থিক ক্ষতি।

এরপর শুরু হয় কারণ অনুসন্ধান। অবশেষে জানা গেল হালদার উজানে মানিকছড়ির তিন ইউনিয়নের বিশাল এলাকা জুড়ে তামাক চাষের খবর। উপজেলার তিনট্যহরি, যুইগগ্যাছোলা ও বাটনাতলির হালদা চরে ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয় তামাক চাষ। শুরুতে কয়েক একরে এ চাষ হলেও ধীরে ধীরে তা ব্যাপক আকারে বাড়তে থাকে। কয়েকটি তামাক কোম্পানির আর্থিক সহযোগিতায় এক পর্যায়ে ২০১৬ সালের দিকে প্রায় ৫০০ একর জমিতে তামাক চাষের বিস্তৃতি ঘটে। তিন ইউনিয়নের দেড় শতাধিক কৃষক এ কাজে যুক্ত হন। বর্ষায় তামাকযুক্ত বিষাক্ত পানি হালদায় নেমে আসার কারণে মাছের প্রজননে বাধা হয়ে ওঠে। গবেষকদের অনুসন্ধানে এ চিত্র উঠে আসার পর শুরু হয় তামাক চাষবিরোধী কার্যক্রম।

প্রসঙ্গত প্রজনন মৌসুমে হালদায় মা মাছের ডিম ছাড়ার জন্য প্রয়োজন হয় পাহাড়ি ঘোলা পানির ঢল। স্বাভাবিকভাবে এই পাহাড়ি ঢল না নামলে প্রজনন ক্ষেত্রে মা মাছ ডিম ছাড়ে না। ২০১৬ সালে ঘটে তার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। প্রজননের সময়ে পাহাড়ি ঢলের পানি তামাকের বিষাক্ততা নিয়ে নেমে আসলে মা মাছ আর ডিম ছাড়েনি।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, মানিকছড়ির তিন ইউনিয়নের হালদার চরের কৃষকদের তামাক চাষ থেকে মূলধারার কৃষি কাজে ফেরত আনতে মাঠে নামে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। কারণ তামাক চাষ বন্ধ করতে না পারলে ধ্বংস হয়ে যাবে হালদার প্রজনন। ল্যাবরেটরির পক্ষ থেকে একটি বেইজ লাইন স্টাডি করে তামাক চাষীদের তালিকাসহ কিছু সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়। সেই সুপারিশমালার ভিত্তিতে এগিয়ে আসে বেসরকারি সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) এবং পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। দুই সংস্থাকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে মানিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন। ২০১৮ সাল থেকে মানিকছড়ির তামাক চাষীদের নিয়ে অনেকগুলো সচেতনতা প্রোগ্রাম করা হয়। সচেতনতা প্রোগ্রামসহ বিকল্প জীবিকায়নের মাধ্যমে ২০২০ সালে দীর্ঘ দুই বছর কাজ করে কয়েকশত তামাক চাষীকে মূল ধারার কৃষি কাজে ফেরত আনতে সক্ষম হয় আইডিএফ।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কোঅর্ডিনেটর প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘২০১৭ সালে আমরা প্রথমবারের মতো মানিকছড়ি এলাকায় গেলে তামাক চাষীদের আচরণ ছিল অনেকটা অসহযোগিতামূলক ও আক্রমণাত্মক। ওই সময়ে মাঠের পর মাঠ তামাক ক্ষেত দেখতে পাই। তখন তামাক চাষের বিরুদ্ধে যারা কথা বলতো তাদের শত্রু মনে করতেন চাষীরা। দীর্ঘ কার্যক্রমের পর ২০২০ সালে পাল্টে যায় ওই তিন ইউনিয়নের হালদা চরের পরিবেশ। চাষীরা তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে তারা তামাকের পরিবর্তে শাক-সবজি চাষে ধাবিত হন। শুরু করেন পাহাড়ি মুরগি ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন, হালদার মৎস্য ও কুচিয়া চাষ। ফসল হিসেবে আরো বেছে নেন রামবুটান, বারোমাসী আম, তাইওয়ানের কাঁঠাল, বাতাবি লেবু, কমলা, মাল্টা, পেঁপে, ড্রাগন চাষ ইত্যাদি।’

ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, হালদা নদীকে ইতোমধ্যে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছে সরকার। ছোট একটি সমন্বিত উদ্যোগে হালদা নদীর উজানে মানিকছড়ির কৃষকরা তামাক চাষ ছেড়ে শাক-সবজি ও ফল-ফলাদি’র চাষাবাদে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এতে রক্ষা পেয়েছে হালদা, সংরক্ষিত হবে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’।

তামাক চাষ ছেড়ে শাক-সবজি চাষে ফিরে আসা মুছা মিয়া, গাজী মিয়া, মনসুর আলী ও সায়রা বেগম জানান, ‘তামাক চাষের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম না। ফলে এলাকার দেড় শতাধিক কৃষক তামাক কোম্পানির লোভে পড়ে বিগত সময়ে অবাধে তামাক চাষ করেছে। কিন্তু হালদা নদীর মৎস্য প্রজনন, নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, এলাকার পরিবেশ এবং জমির উর্বরতার কথা বিবেচনায় নিয়ে আমরা তামাক চাষ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আইডিএফ-পিকেএসএফের সহযোগিতা পেয়ে আমরা আনন্দিত। আইডিএফ আমাদের বিনামূল্যে ফলের চারা, চীনা বাদাম ও আলু বীজ সরবরাহ করেছে। সার-ঔষধ এবং প্রশিক্ষণসহ কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’

আইডিএফ এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম বলেন, ‘মানিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা নিয়ে আইডিএফ তামাক চাষবিরোধী কার্যক্রম শুরু করে। আগে যেসব কৃষক তামাক চাষ ছাড়া কিছুই বুঝতো না, তারা এখন নিজেদের মেধা খাটিয়ে কৃষি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে মানিকছড়ির হালদা চরের পরিবেশ। বর্তমানে দেড় শতাধিক চাষীর মধ্যে মাত্র তিনজন তামাক চাষ করছে। আগামী বছর থেকে তারাও আর তামাক চাষ করবে না বলে আমাদের জানিয়ে দিয়েছে।’

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 263 People

সম্পর্কিত পোস্ট