চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৪ মার্চ, ২০২১

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | ৬:৪৮ অপরাহ্ণ

তাসনীম হাসান 

নিরাপদ খাদ্য এখনও স্বপ্ন

ফ্রিজে কাঁচা মাংস আর রান্না করা তরকারি মাখামাখি করছে। খোলা ডাস্টবিন আর খাবারের অবস্থান এতই কাছাকাছি যে একটু এদিক-ওদিক হলেই একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে যাবে। রান্নাঘরের দিকে তো তাকানোই যায় না। পোড়া ডালডা তেল আর ময়লা স্যাঁতসেতে ওই ঘর থেকে যেন একটা জিনিসই বের হয় দুর্গন্ধ। 

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত এই চিত্র দেখতে পাচ্ছে। অনিরাপদ খাদ্য বিক্রির এই দৃশ্য অবশ্য শুধু রেস্তোরাঁয় নয়। কাঁচাবাজার থেকে বেকারি পণ্য, মিষ্টি থেকে ফলের দোকান প্রায় সব খাবারেই মিশে থাকছে স্বাস্থ্যর পক্ষে ক্ষতিকর কিছু না কিছু। অবশ্য সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এসব বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু সেই নজরদারির ফাঁক গলেই ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্যদ্রব্য চলে যাচ্ছে আমজনতার পাতে। উঁচু দালানের বাসিন্দা থেকে ফুটপাতের মানুষ কেউ যেন ভেজাল খাবার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।

ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সঙ্গে যুক্তরা বলছেন শুধু জরিমানা করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে না। বারবার একই অপরাধ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধের পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই পরিবর্তন আসতে পারে।

অভিযানের চিত্র

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৫৯৭টি অভিযান পরিচালনা করেছে তারা। এসব অভিযানে ১ হাজার ২৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৪২ লাখ ২২ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি গ্রাহকের ৮৭৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করে আদায় করেছে ২১ লাখ ১১ হাজার টাকা। একই সময়ে ৬৪টি সেমিনার ও ৭০টি গণশুনানিও করে সংস্থাটি। এছাড়া চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও প্রায় ৭০টি অভিযান পরিচালনা করেছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসন কতটি অভিযান পরিচালনা করেছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে অভিযান পরিচালনা করা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে কথা বলে একটি আনুমানিক হিসাব পাওয়া গেছে। তাঁরা জানিয়েছেন ২০২০ সালেই বাজারে অন্তত ৫০০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন।

পরিবর্তন নেই

চট্টগ্রাম মহানগরীতে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার রেস্তোরাঁ আছে। আবার কয়েকশ’ বেকারি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও আছে। এসব রেস্তোরাঁ আর খাবারের ওপর নির্ভরশীল নগরীর বেশিরভাগ মানুষ। সেই রেস্তোরাঁগুলোতে খাদ্য উৎপাদনে বেশিরভাগ সময় ডালডা ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ নিরাপদ খাদ্যের অন্যতম প্রধান শর্ত ট্রান্সফ্যাট (পুষ্টিগুণ বিবর্জিত খাদ্য উপাদান) মুক্ত খাবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে ট্রান্সফ্যাটঘটিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ডব্লিউএইচও’র ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে ৫ হাজার ৭৭৬ জন মানুষ মারা যায়। খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল যা ডালডা বা বন¯পতি ঘি নামে সুপরিচিত।

এবার নজরটা কাঁচাবাজারের দিকে ঘোরানো যাক। সেখানেও পরিবর্তন নেই। বাসী সবজিকে ক্ষতিকারক রংয়ের পানিতে ডুবিয়ে ব্যবসায়ীরা এমনভাবে চকচকে করে ফেলছেন যেন একটু আগেই গাছ থেকে ছিড়ে এনেছেন। ফলের দোকানে ফরমালিনের ব্যবহার কমলেও আছে অন্য আতঙ্ক। ক্ষতিকারক রাসায়নিকের এতই দাপট কাঁচা কলার গায়ে পরদিনই হলুদ রং উঠে যাচ্ছে।

তাঁদের কথা

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত রেস্তোরাঁ-দোকানে জরিমানা করা স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করেন ক্যাবের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান বারবার একই অপরাধ করছে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া দরকার। আর মানুষকেও সচেতন হতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান বয়কট করা শুরু করলে সবাই পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে। তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান পূর্বকোণকে বলেন, আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। রংয়ের ব্যবহার অনেকাংশ কমে গেছে রেস্তোরাঁগুলোতে। কিন্তু ঘরে ঘরে জর্দা ভাতে এই রং ব্যবহার হচ্ছে। তাই মুদি দোকানগুলোতে আমরা তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কাঁচাবাজারে অন্য সমস্যা থাকলেও ভেজাল কিংবা ফরমালিনের বিষয়টি আগের মতো নেই।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন নিরাপদ খাদ্য অফিসার চট্টগ্রাম নাজমুস সুলতানা সীমা। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, রাতারাতি কোনো পরিবর্তন আসবে না। তাই আমরা জরিমানার চেয়ে জনসচেতনা সৃষ্টিতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এ জন্য নানা সেমিনার-পোস্টারিংয়ের পাশাপাশি রেস্তোরাঁর মালিকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 247 People

সম্পর্কিত পোস্ট