চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৯ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

৩১ জানুয়ারি, ২০২১ | ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

তাসনীম হাসান

আজ বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

তিন কারণে কুষ্ঠ রোগী কমছে চট্টগ্রামে

চট্টগ্রামে কমছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগ হিসেবে পরিচিত- কুষ্ঠ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। পরিসংখ্যান দিলে সেটি আরও স্পষ্ট হবে। ২০১০-২০১৫ এই ৫ বছরে চট্টগ্রামে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৪৩। সেখানে পরের পাঁচ বছরে (২০১৬-২০) রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তারও অর্ধেকের কম ৩৬৮।

মূলত তিন কারণে কমছে এই রোগীর সংখ্যা। অন্যতম কারণ হলো মানুষদের মধ্যে কুষ্ঠ রোগ নিয়ে সচেতনতা অনেকগুণ বেড়েছে। এ রোগের চিকিৎসা সেবার সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মীরাও দক্ষ হয়ে উঠেছেন। অবশ্য সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) এ রোগ নির্মূলে নিরন্তর লেগে থাকাও বড় কারণ। অবশ্য এই কমার হারের মধ্যেও কিছু আশঙ্কা রয়ে যায়।

তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হলো শিশুদের সংক্রমণের হার শূন্যের কোটায় না আসা। বিকলাঙ্গ না কমাও বড় ভয়। রোগ নিয়ে অহেতুক কুণ্ঠার কারণে অনেক আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হন না। কেউ কেউ ঝাড়ফুঁক ও কুসংস্কারাচ্ছন্না নানা সনাতন চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে নিজেকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলেন। আবার পারিবারিক ও সামাজিক বাধা এবং অবজ্ঞার শিকার হন বলে অনেকে রোগের কথা প্রকাশও করতে চান না। তাই সরকারি ও এনজিও সংস্থাগুলোর চাওয়া রোগের লক্ষণ দেখা গেলেই না লুকিয়ে দ্রুত যেন রোগের কথা জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে যেন সব খুলে বলেন। কারণ, প্রাথমিক অবস্থায় কুষ্ঠরোগ ধরা পড়লে তা নির্মূল করা সম্ভব। দেরি হয়ে গেলে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

কমছে রোগীর সংখ্যা
কুষ্ঠ রোগ নির্মূলে দেশে সরকারের পাশাপাশি ৮টি এনজিও কাজ করছে। এর মধ্যে বেসরকারি সংস্থা দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১৯৯৪ সাল থেকে কাজ করছে। এই সংস্থাটির হিসেবে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৭৪৩ জন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ৯৮৩ জন রোগী পাওয়া যায়। এই রোগের কারণে তখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৮ শতাংশের বেশি রোগী বিকলাঙ্গ হয়ে যান।

গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে-এই বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে রোগীর সংখ্যা কমছে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে এই রোগে আক্রান্ত ৯৫ জনকে পাওয়া যায়। এর মধ্যে নগরে ছিলে ৭২ জন আর ১৪ উপজেলায় ছিলেন ২৩ জন। ২০১৭ সালে নগর ও উপজেলা মিলিয়ে রোগী পাওয়া যায় ৮১ জন।

তবে ২০১৮ সালে রোগী পাওয়ার সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। ওই বছর নগরে ৮৩ এবং উপজেলায় ১০ জন রোগী পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে ৬৬ জন রোগী পাওয়া যায়। তবে ২০২০ সালে রোগীর হার একেবারেই কমে আসে। ওই বছরে মাত্র ৩৩ জন রোগী পাওয়া গেছে এই অঞ্চলে। এই সময়ে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ২১ শতাংশের বেশি বিকলাঙ্গ হয়ে গেছেন। আবার আক্রান্তদের মধ্যে ৯ জন ছিল শিশু।

শূন্যতে আনতে চায় সরকার
১৯৯৪ সালে সারাদেশে ১০ হাজার মানুষের মধ্যে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ জন। সরকার তখন এই হার ১ অথবা তারও কমে আনার জন্য উদ্যোগ নেয়। চারবছর পর ১৯৯৮ সালে এসে সেই লক্ষ্যমাত্রা জাতীয় পর্যায়ে পূরণ হলেও জেলাভিত্তিক হয়নি। এরপর থেকে সরকার ও এনজিও সংস্থাগুলো যৌথ উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়। ২০০৩ সালে এসে জেলা পর্যায়েও ১ অথবা ১ এর নিচে নেমে আসে। বর্তমানে সরকার তিনটি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। সেগুলো হলো রোগীর সংখ্যা, বিকলাঙ্গ ও বৈষম্য শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা।

সচেতনতা বাড়ায় রোগীর সংখ্যা কমছে বলে জানান দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রকল্প পরিচালক সুলতান মো. ইলিয়াছ উদ্দিন। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কুষ্ঠ রোগ নির্মুলে কাজ করে যাচ্ছি। এর সফলতা আসছে। এই সমন্বয় ধরে রাখতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা শূন্যেতে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। অবশ্য এ কাজে গণমাধ্যমকে ভালোভাবে অন্তর্ভূক্ত করা গেলে মানুষদের সচেতনতা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে আরও আগে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।

আর চিকিৎসকেরা বলছেন- কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে হলেও রোগীকে একঘরে করে রাখার কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে সচেতনতা বেশি জরুরি। লক্ষণ দেখা গেলেই দ্রুত রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার।

কর্মসূচি
আজ রবিবার (৩১ জানুয়ারি) বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘কুষ্ঠকে করি জয়’। দিবসটি উপলক্ষে আজ সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ছোট্ট পরিসরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল। সেখানে সংস্থাটির নানা কার্যক্রম তুলে ধরা হবে।

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 758 People

সম্পর্কিত পোস্ট