চট্টগ্রাম রবিবার, ০৭ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ | ১:২৬ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

প্রবাস জীবন ছেড়ে ‘শীর্ষ দালাল’

কক্সবাজারের উখিয়ার ফরিদ আহমদের ছেলে মুহিবুল্লাহ। টানাপোড়ন সংসারের হাল ধরতে পাড়ি দিয়েছেন বিদেশে। কিন্তু হঠাৎ লোভে পড়ে প্রবাস জীবনকে দেন সমাপ্ত। ফিরে আসেন নীড়ে। কারণ, তখনই নিজ জন্মস্থানে চলছে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। জড়িয়ে পড়েন শতাধিক প্রকল্পের সাড়ে ১৪ হাজার একরের ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দালালিতে। গড়ে তোলেন ভূমি অধিগ্রহণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ার এবং কানুনগোদের সিন্ডিকেট। যাদের ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ কমিশন ছাড়াই ক্ষতিপূরণ পাওয়া ছিল অসম্ভব। আর কমিশন বাণিজ্য করেই নাম লিখেয়েছেন কক্সবাজারের ‘শীর্ষ দালাল’ হিসেবে। হয়েছেন কোটিপতিদের একজনও। যদিও শেষ পর্যন্ত দালাল মুহিবুল্লাহকে হার মানতে হয়েছে দুদকের কাছে।
গতকাল শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানাধীন এমইএস কলেজ মোড় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। একই সাথে গ্রেপ্তার হয় সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব। যারা ওই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা বলে মত দুদক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
দুদক সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারের শুধুমাত্র মাতারবাড়িতেই ভূমি অধিগ্রহণ হয় ১২শ ১২ একর। এসব জমির মালিক উদাসীন হওয়ায় তা কাজে লাগিয়েছেন মুহিবুল্লাহসহ গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট। যারা ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে একজনের টাকা দিয়েছেন অন্যজনকে। যা দুদকের বিশদ তদন্তে ওঠে আসে।
দুদকের দালিলিক তদন্তের সূত্র বলছে, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেওয়ান মওদুদ আহমদের অধীনে যে সকল ক্ষতিপূরণের মামলা ছিল সব কয়টি ক্ষতিপূরণ নিয়ন্ত্রণ করতো সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব। দালাল মুহিবুল্লাহ ও ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেওয়ান মওদুদ নিজেই এখানে অন্য হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দিতেন না। এমন করেই বনে গেছেন কোটিপতি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গেল পাঁচ বছরে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মুহিবুল্লাহ। এরমধ্যে কক্সবাজারের ইনানীতে গড়ে তুলেছেন রিসোর্ট। শহরের মধ্যে কিনেছেন ফ্ল্যাটও। আর এসব অবৈধ অর্থ জায়েজ করতে সখ্যতা ছিল ভূমি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের কর্তাদের সাথেও। ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে সন্ধান পাওয়া গেছে। শীঘ্রই এসব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
দুই ব্যাংকেই লেনদেন ২৫ কোটি টাকা : কক্সবাজার এলএ শাখার শীর্ষ দালাল হিসেবে পরিচিত মুহিব উল্লাহ দুই একাউন্টেই প্রায় ২৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাও আবার মাত্র দেড় বছরের মধ্যে। নিজের ও প্রতিষ্ঠানের নামে একাউন্ট খুলে এলএ শাখার কমিশনের টাকা জমা দিয়েছেন তাতে। আবার এসব একাউন্ট থেকেই টাকা পাঠিয়েছেন স্বয়ং জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সার্ভেয়ার ও ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাউন্টে। এরমধ্যে ওয়ান ব্যাংক শাখায় মাত্র এক বছর সাত মাসে লেনদেন করেছেন ১১ কোটি ৯৯ লাখ ১০ হাজার ৯০ টাকা। এছাড়া নিজ প্রতিষ্ঠান ইনানী এফ টি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নামে ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর আরেকটি একাউন্ট খুলে সে। যাতে লেনদেন করেছেন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। একই ব্যাংকের আরেকটি একাউন্ট থেকে লেনদেন হয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৬ হাজার ৭৭৭ টাকা। একই ব্যাংকের অন্য একাউন্টে ৫ কোটি ৫১ লাখ ৮১ হাজার ৭৫০ টাকা লেনদেন হয়েছে তার। যার সবগুলো অর্থই এলএ শাখার ভূমি অধিগ্রহণের বলে জানিয়েছেন দুদক।
জায়েজ করতেন স্কুল-কলেজও : দালালি করে অবৈধভাবে অর্থ সঞ্চয় করলেও, তা হালাল করতে দান করতেন স্কুল কলেজেও। শুধু তাই নয়, কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিতেও দান করেছেন মুহিবুল্লাহ। বিচ ম্যানেজমেন্টের সভাপতি আবার জেলা প্রশাসক নিজেই।
দুদক থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘খুশি’ করার জন্য ২০১৯ সালের জুলাইতে বিচ ম্যানেজমেন্টকে চেকের মাধ্যমে ৬ লাখ টাকা দিয়েছেন মুহিবুল্লাহ। এছাড়া একই মাসে অরুনদল স্কুলকে পাঁচ লাখ টাকা করে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দিয়েছেন ১০ লাখ টাকা। এর বাইরে কক্সবাজার ডিসি কলেজেকেও একই সময়ে ১০ লাখ টাকা দেন মুহিবুল্লাহ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে মুহিবুল্লাহ এসব টাকা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন। এর বাইরে আর কাকে কত টাকা দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করে বের করা হবে।’

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 2020 People

সম্পর্কিত পোস্ট