চট্টগ্রাম সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১

সর্বশেষ:

১২ জানুয়ারি, ২০২১ | ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

কবর থেকে ‘জীবিত’ উঠে আসেন শাহাবউদ্দিন শাহ!

কখনো টোকাই কখনো জমি দখল আবার কখনো রিকশা কিংবা ট্যাক্সি চালিয়েছে শাহাব উদ্দিন। ঘরের দেয়ালে লাগানো হয়েছে আওয়ামীলীগ নেতার সাথে ছবি। নগরীর আরেফিন নগরে এক ব্যক্তির জমি পাহারায় ছিলেন বেশ কিছুদিন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে চুরির অভিযোগও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি এখন ‘মস্তবড় পীর’।

স্বপ্নাদেশ পেয়ে জীবিত অবস্থায় কবর থেকে কাফনের কাপড় পরে উঠে আসেন। মাঝে মাঝে ফের কবরে ঢুকে যান। কবরে থাকা অবস্থায় দুধ ছাড়া আর কিছুই পান করেন না। শাহাব উদ্দিনের দাবি তিনি কিছুই জানেন না। সবই বাবার লীলা। গত ৩ ডিসেম্বর কবর থেকে উঠে আসে সাহাব উদ্দিন।

বায়েজিদ থানার পরিদর্শক (ওসি) প্রিটন সরকার বলেন, কবর থেকে উঠে এসে কেউ আস্তানা করেছে এমন খবর আমি জানি না। বিষয়টি আমি খোঁজ নিচ্ছি।

শাহাব উদ্দিন যেভাবে শাহাবউদ্দিন বাবা:

কথাসহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ লালসালু উপন্যাসের মজিদ চরিত্রে গ্রামের মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে ধর্মকে ব্যবসার উপাদানরূপে ব্যবহারের একটি নগ্নচিত্র তুলে ধরেছিলেন। ১৯৪৮ সালে রচিত লালসালুর পটভূমি ১৯৪০ কিংবা ১৯৫০ দশকের বাংলাদেশের গ্রাম সমাজ হলেও এর প্রভাব বা বিস্তার কালোত্তীর্ণ।

একুশ শতকের আধুনিক এ সময়ে বায়েজিদের আরেফিন নগরের শাহাবউদ্দিনের মাঝে মজিদ চরিত্রের মিল পাওয়া যায় হুবহু। মজিদ মোহাব্বত নগর গ্রামের বাঁশঝাড় থেকে মোদাচ্ছের পীরের কবর আবিষ্কার করে সেখানে আস্তানা গেড়েছিল। আর আরেফিন নগরের শাহাবউদ্দিন নিজে কাফনের কাপড় পরে নিজের খনন করা কবর থেকে উঠে আসে।

গতকাল (সোমবার) সরেজমিন গেলে দেখা যায় কথিত ভণ্ড পীর শাহাবউদ্দিনে কবর থেকে উঠে আসার চিত্র। বায়েজিদ আরেফিন নগর বাজার থেকে হাতের বামে পাহাড়ি টিলার সরু গলি উঠতেই টিনের ঘেরা একসারি ঘর। টিন দিয়ে ঘেরা ঘরগুলোর প্রতিটিতে ভাড়াটিয়া থাকলেও একটি ঘরে দেখা মিললো একটি কবরের। সেখানে কিন্তু শাহাবউদ্দিন থাকেন না।

আঁকাবাঁকা সরু পথ দিয়ে টিলার উপরে উঠতে টিনের তৈরি আর একটি ঘরে পাওয়া গেলো শাহাবুদ্দিনকে । সাদা কাপড় পরে সোফায় বসে সিগারেট ফুঁকছিলেন কথিত পীর শাহাব উদ্দিন। সিগারেটে আগুন দিয়েছেন হয়তো কিছুক্ষণ আগে। তখনো সামনের ছোট টেবিলে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট শোভা পাচ্ছিলো। কথা বলতে বলতে আরো একটি সিগারেট নিলেন ঠোঁটের কোণায়।

যা বললেন শাহাবউদ্দিন:

স্মৃতি হাতড়িয়ে সাহাবুদ্দিন বলেন- ‘আমাদের নিজ বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে। ছোটবেলায় গ্রাম ছেড়ে চট্টগ্রামে আসি । তখন থেকেই বনে-বাদারে ঘুরতাম। বুঝতে পারতাম আমার ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। একা একা বসে থাকতাম নির্জন পাহাড়ের চূড়ায়। মনে মনে খাজা গরীবে নেওয়াজকে স্মরণ করতাম। পরে বিয়েশাদি করে সংসারি হলাম। রিকশা চালানোসহ নানা ব্যবসা বাণিজ্যও করেছি।

২০১৯ সালে আরোফিন নগর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে উড়োজাহাজ মার্কায় নির্বাচনও করেছি, তবে জিততে পারিনি। এতকিছুর মাঝেও খাজাকে ছাড়তে পারলাম না। মাঝে মাঝে তাঁর নামে সিন্নিছালাদ করে গরিবদের দিতাম। এরপর নিয়ম করে প্রতি বৃহস্পতিবার খাজার নামে রান্না করা তবরুক দিয়ে এলাকার মিছকিন গরিবদের দিতাম। স্বপ্নে আদেশ পেয়ে কখনো দুই দিন আবার কখনো তিনদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে ধ্যানে বসতাম। আমার কাছে অনেক নারী পুরুষ আসে। ভাল করার মালিক আল্লা, খাজা গরীবে নেওয়াজ। আমি ত উছিলা মাত্র’।

এরপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, সোফায় হাঁটু গেড়ে বসলেন শাহাবউদ্দিন। উপরে তাকিয়ে আঙুলের কড় গুনে বিড়বিড় করে কি যেন বলছিলেন তিনি। এর মধ্যেই ডেরায় ভিড় করেছে বেশ কয়েকজন ভক্ত। তারা উঠে বসলেন আস্তানার রুমে থাকা খাটিয়ার উপর। তাদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেলো। ‘বাবা’ যখন কবরে ছিলেন লোকজন তাকে বিভিন্ন মাজারেও দেখেছেন।

কথার ফাঁকে জানতে চাই কবরের বিষয়ে, ঝিমধরে চোখবুজে এবার বলতে শুরু করলেন, ‘মাস ছয় আগের কথা। আমার নাতির একটা কঠিন রোগ হয়েছিল। কোন ডাক্তার-কবিরাজে কাজ হলো না। একদিন খালেক বাবার সন্ধান পাইলাম। তিনি নদীর ওপারে মইজ্জারটেকে থাকেন। তার কাছে নাতিকে নিয়ে গিয়ে সালাম দিলাম। দেখামাত্রই খালেক বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চিকিৎসায় আমার নাতির কঠিন রোগ ভাল হল। আমি তিন ডেক তবরুক গরিবদের বিলিয়ে দিলাম। এরপর থেকে খালেক বাবার প্রতি আমার ভক্তিশ্রদ্ধা বাড়তে থাকে।

একদিন খালেক বাবার সাথে আমার দেখা হলো ভিন্ন রূপে, গায়েবি রূপে। এরপর একরাতে স্বপ্নে চিল্লায় যাওয়ার আদেশ পাই। বিষয়টি খালেক বাবাকে বলার পর তিনি ব্যবস্থা করলেন। তার কথা মতো বায়েজিদ মার্কেট থেকে কাফনের কাপড় কিনে আনি। ঘরের পাশেই কবর খুঁড়ে, কাফনের কাপড়ে আমাকে ওই কবরে দিলেন। আল্লার দিদারে গেলাম। কথা ছিল ৪১ দিন অন্ধকার কবরে থাকার। ১৫ দিন পর আদেশ আসল উঠে আসার। খালেক বাবার হাত ধরে আবার কবর থেকে উঠে আসলাম। এসময় আমার হুঁশ ছিল না। হুঁশ ফিরলে দেখি আমার চারপাশে অনেক মানুষ।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে আরেফিন নগর বাজারের একজন মুদির দোকানদার বললেন, ‘আমার দোকানের চালের টিন খুলে কয়েক লাখ টাকার মালামাল চুরি করেছিল সে। খোঁজাখুঁজির পর মালামালসহ ধরা পরে। থানা পুলিশ করলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে মাফ চ চেয়েছে শাহাবুদ্দিন। এটা বেশি আগের ঘটনা না। দুই স্ত্রী, ৩ সন্তানের জনক শাহাবউদ্দিন অন্তত তিন জায়গায় এক কানি জমি দখল করে সেখানে ঘর নির্মাণ করে ভাড়ায় লাগিয়ত করেছেন। দুই স্ত্রী দুই জায়গায় থেকে দেখাশোনা করেন। শাহাবুদ্দিনের সাথে আরো একটা বড় ভণ্ড আছে তার নাম আবদুল খালেক প্রকাশ খালেক বাবা। তিনিই মূল নায়ক, খালেক বেশ কিছুদিন আরেফিন নগরেই ছিল। এখান থেকে পালিয়ে কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেকে আস্তানা গেড়েছে’।

 

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 7687 People

সম্পর্কিত পোস্ট