চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

৩ জানুয়ারি, ২০২১ | ২:০৮ অপরাহ্ণ

তাসনীম হাসান 

বিশ্বস্বীকৃত একটি গ্রিন শিপইয়ার্ডের গল্প

চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের ভাটিয়ারি থেকে পশ্চিমে সরু সড়ক ধরে কিছুদূর এগিয়ে গাড়ি থামালেই হাতের বাম পাশে চোখে পড়বে দেশের প্রথম গ্রিন শিপইয়ার্ড। নাম তার পিএইচপি শিপব্রেকিং এন্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এটি কেন গ্রিন শিপইয়ার্ড? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অবশ্য কারও কাছে ধর্ণা না দিলেও চলবে। ইয়ার্ডজুড়ে থাকা নানা আধুনিক প্রযুক্তি আর পরিবেশ সুরক্ষার উদ্যোগই বলে দেবে সব। পিএইচপি ফ্যামিলির মালিকানাধীন এই শিপইয়ার্ড ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে আন্তর্জাতিক গ্রিন সার্টিফিকেট পায়। ইতালিভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশে জাহাজ কাটার জন্য এ সার্টিফিকেট দেয়। শুধু তাই নয়, হংকং কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম সুরক্ষামূলক শিপইয়ার্ডও এটি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিলেছে শিপইয়ার্ড জগতে সর্বোচ্চ সনদ হিসেবে বিবেচিত জাপানি স্বীকৃতিও, যে সনদের দাবিদার বিশ্বের মাত্র ৩৫টি শিপইয়ার্ড।

 

বিজ্ঞাপন

গ্রিন শিপইয়ার্ডের এই স্বীকৃতি কিন্তু এমনিতেই আসেনি। এজন্য ঢেলে সাজাতে হয়েছে পুরো ইয়ার্ডকেই। দুই বছর ধরে চলে কর্মযজ্ঞ। এর পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। প্রথম দিকে ‘এত টাকা’ খরচ করতে দেখে অনেক শিপইয়ার্ডের কর্মকর্তারা ‘শুধু শুধু খরচ করছে’ বলে ভ্রু কুঁচকেছিলেন। কিন্তু এখন তারাই রোল মডেল মানছেন এই শিপইয়ার্ডকে। এই শিপইয়ার্ডের মতো করে গড়ে তুলতে চান নিজেদের শিপইয়ার্ডকেও।

 

অতীতে শিপইয়ার্ড মানেই ছিল ক্লান্তিহীনভাবে বাতাসে ভেসে আসা চারটি শব্দ ‘হেইয়া হো, হেইয়া হো।’ পিঠের ওপর কাটা লোহার বড় বড় টুকরো নিয়ে সমুদ্র থেকে উঠে কূলে আসতেন শ্রমিকেরা। সেই অসাধ্য সাধন করতে গিয়ে প্রায়ই প্রাণহানি ঘটতো। কেউ বা হতেন পঙ্গু। আর কাটাছেঁড়া তো ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। গ্রিন শিপইয়ার্ডে উন্নীত হওয়ার পর এই শিপইয়ার্ডে প্রায় শূন্যতে নেমে এসেছে এসব দুর্ঘটনা।

 

এই পরিবর্তনের নেপথ্যনায়ক শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রিংকু। ২০০৮ সালে এই শিপইয়ার্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পর জাহাজশিল্পে নানা পরিবর্তন আনতে শুরু করেন তিনি। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে বিশে^ তিনিই প্রথম এই শিল্পে টাওয়ার ক্রেনের ব্যবহার শুরু করেন। এমনভাবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললেন যাতে বর্জ্য মাটি ও পানিতে একটুও না মেশে। কর্মীদের সারাবছর নানা প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য শ্রমিকদের হাতে তুলে দিয়েছেন অত্যাধুনিক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামও (পিপিই)। তাই ‘ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশে’ মনের আনন্দে কাজ করে যান শ্রমিকেরা।

 

সম্প্রতি এক দুপুরে পুরো ইয়ার্ড ঘুরে দেখান ইয়ার্ডের হেলথ সেফটি এনভায়রনমেন্ট বিভাগের প্রধান লিটন মজুমদার। শিপইয়ার্ডের সদর দরজা পেরোলেই হতে হবে স্বাস্থ্যপরীক্ষার মুখোমুখি। তারপর এগোলেই চোখে পড়বে বিশাল নোটিশবোর্ড। সেটি ঠাসা নানা নির্দেশনা আর সতর্কবার্তায়। নোটিশবোর্ডের পেছনেই হাসপাতাল আর কর্মকর্তাদের ডরমেটরি। উল্টো পাশে শ্রমিকদের থাকার জায়গা-ক্যানটিন। হাসপাতালে ঢুঁ মারতেই দেখা গেল সবসময় প্রস্তুত আছেন চিকিৎসক। সাজানো গোছানো তিনটা বেড। আহত শ্রমিককে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সবকিছু আছে এখানে। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক দেখালেন, প্রতিটি শ্রমিকের নামে এখানে আলাদা আলাদা ফাইল। এর কারণ বোঝাতে গিয়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক বলেন, প্রথমে এখানে কোনো শ্রমিক যোগ দিলেই তাঁর পুরো শরীর পরীক্ষা করে সেই ডাটা সংরক্ষণ করা হয়। এরপর একবছর পর আবারও একইভাবে শরীর পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত ইয়ার্ডে কাজ করার পর কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা সেটি যাচাই করা হয়। সে অনুযায়ী পথ্য দেওয়া হয় শ্রমিককে।

 

 

৩০০ শ্রমিকের কাজ করে একটি ক্রেন

জাহাজভাঙা শিল্পে একটি কথা প্রচলিত আছে-শ্রমিক যত কম, ঝুঁকিও তত কম। তাই ঝুঁকি কমাতে মানুষের বদলে প্রযুক্তির পথেই হেঁটেছে এই শিপইয়ার্ড। পুরো ইয়ার্ডজুড়ে নানা ছোট-বড় ক্রেনের সমাহার। তার কোনোটির নাম বার্জ, কোনোটার নাম বোম কিংবা মোবাইল ক্রেন। আছে ম্যাগনেট ক্রেন আর উয়িন্সও। শক্তিশালী এসব যন্ত্র শ্রমিকের কাজ একেবারে কমিয়ে দিয়েছে।

 

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

জাহাজে যে থাকে নানা ক্ষতিকর বর্জ্য। সেগুলো যদি ছড়িয়ে পড়ে তবে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি ঘটতে পারে প্রাণহানিও। তাই সেদিকেই বেশি মনোনিবেশ করা হয়েছে এই ইয়ার্ডে। সেজন্য পৃথকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে তেল আর বর্জ্য সংরক্ষণাগার। বর্জ্যগুলো নিশ্চিদ্রভাবে কয়েকদফায় পরিশোধনের পরেই ‘মুক্তি’ পায় ইয়ার্ড থেকে। তার আগে অবশ্য পরীক্ষা করা দেখা হয় কোনো ক্ষতিকর কিছু রয়ে গেছে কিনা। আর বৃষ্টি হলে ইয়ার্ড ধুয়ে-মুছে যাওয়া সেই পানি কিন্তু কোনোভাবেই সমুদ্রে পড়ার সুযোগ নেই।

 

নিজের দপ্তরে বসে পিএইচপি শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম রিংকু শিপইয়ার্ড নিয়ে পূর্বকোণের সামনে খুলে দিলেন স্মৃতির জানালা। বললেন, শিপইয়ার্ডকে এই পর্যায়ে আনার পেছনের সেই অসাধারণ উদ্যোগের গল্প। কৃতজ্ঞভরা কণ্ঠে জানালেন সরকারের সহযোগিতার কথাও।

 

জহিরুল ইসলাম রিংকু বলেন, গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা শুরু করি অনেক আগেই। এর মধ্যে পুরো ইয়ার্ড ঢেলে সাজানো তো ছিলই। সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে প্রশিক্ষক এনে কর্মকর্তা আর শ্রমিকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করি। সারাবছরই প্রশিক্ষণের শিডিউল থাকে।

পূর্বকোণ/পি-মামুন

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 348 People

মন্তব্য দিন :

সম্পর্কিত পোস্ট