চট্টগ্রাম শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১

১ জানুয়ারি, ২০২১ | ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

সাইফুল আলম

করোনাজয়ী বছরের প্রত্যাশা

মহামারীর তান্ডব, মৃত্যুর মিছিল, কর্মহীন জীবন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চলমান পরিস্থিতির মধ্যেই ভোরের রক্তিম সূর্য নিয়ে এসেছে আরেকটি নতুন বছর। শেষ সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে বিদায় নিল ২০২০ সাল। মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের আরও একটি বছর। বর্ষ পরিক্রমায় যুক্ত হল আরেকটি পালক। তবে ২০২১ সাল এমন একটা বছরের দীর্ঘ উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত হতে যাচ্ছে, যা ইতিহাসে গত একশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘অভিশাপ’ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার অপার বার্তার নিয়ে শুরু হল নতুন বছর। স্বাগত খ্রিস্টীয় নববর্ষ ২০২১। পুরনো বছরের সংশয়, সংকট উদ্বেগ কাটিয়ে নতুন আশায় দিন শুরু হল আজ। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পূর্ণ করে বাংলাদেশ পা রাখল ৫০তম বর্ষে। চলতি বছরেই শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। চীনের উহানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ক্রমেই মহামারি আকারে সংক্রমণ বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের কথা জানায় সরকার। মহামারিতে লাখ লাখ মানুষ এরই মধ্যে মারা গেছেন। সেই সঙ্গে কয়েক কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং অর্থনৈতিক খাতে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। ১০০ কোটির বেশি শিশু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৫ লাখ ১২ হাজার ৪৯৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৭ হাজার ৫৩১ জন।

করোনার শুরুর দিকে বাংলাদেশেও লকডাউন ছিল। মার্চের ২৬ তারিখ থেকে মে এর ৩০ তারিখ পর্যন্ত দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে পৃথিবীর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো বাংলাদেশের মানুষও ‘নিউ নরমাল’ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এখন মৃত্যুকে সঙ্গী করেই চলছেন তারা।

২০২০ সাল, সারা পৃথিবীতেই বিষাদের বছর হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে। এ বছর মহামারি হয়ে বেশ কয়েকজন বিশিষ্টজনকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন যোগ হচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। চলে গেছেন প্রথিতযশা শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা।

২০২০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির চমকপ্রদ সাফল্যের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) এর একটি রিপোর্টে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন যে ধরণের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। সিইবিআর’র সর্বশেষ এক রিপোর্টে এই পূর্বাভাস দেয়। এই রিপোর্ট অনুযায়ী আর মাত্র ৭ বছর পর পরেই চীন হবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। ২০৩০ সালে ভারত হবে তৃতীয়। আর ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বহু ধাপ উপরে উঠে পৌঁছে যাবে ২৫ নম্বরে। অন্যদিকে ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

করোনার প্রভাব পড়েছে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ সকল ক্ষেত্রে। বেকার হয়ে পড়েছেন দেশের অনেক মানুষ। বড় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। পুরোটা বছরজুড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হয়নি নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও। পরীক্ষা ছাড়াই অটো প্রমোশনের সিদ্ধান্ত হয়েছে মাধ্যমিকে।

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান বসানোটি ছিল বিদায়ী বছরে দেশের মানুষের জন্য বড় রকমের সুসংবাদ। ১০ ডিসেম্বর ৪১তম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু।

২০২০ সালের ১০ মার্চ ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রায় প্রদান করেন হাইকোর্ট। সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ১৩ অক্টোবর ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

বছরটিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার বিষয় ছিল মার্কিন নির্বাচন। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দেশটির ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নানা নাটকীয়তার মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন জয়ী হন।

করোনা মহামারীর দুশ্চিন্তার মধ্যেই আশার আলো হয়ে ৯ নভেম্বর আমেরিকান কোম্পানি ফাইজার ও জার্মানির বায়োএনটেক যৌথভাবে প্রথমবারের মতো টিকা উদ্ভাবনের কথা জানায়। যা বিশ^বাসীর মনে স্বস্তি নিয়ে এসেছে। এরপর একে একে আসছে আরও টিকার আসার খবর।

নববর্ষ মানেই নতুন স্পন্দন, নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা। বিগত বছরের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা পেছনে ফেলে নতুন বছরে অমিত সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া। স্বভাবতই নতুন বছর নিয়ে এবার মানুষের প্রত্যাশা একটি করোনামুক্ত বিশ্ব। তবে, করোনার টিকা ছাড়াও অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনাসহ মানবসম্পদ তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হচ্ছে আগামী বছরের মোটা দাগের চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে, এটাই ইংরেজি নতুন বছরে সবার প্রত্যাশা।

 

পূর্বকোণ/পি-মামুন

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 172 People

সম্পর্কিত পোস্ট