চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১

৩০ ডিসেম্বর, ২০২০ | ২:৩২ অপরাহ্ণ

মরিয়ম জাহান মুন্নী

সমাজের বন্ধু জাহানারা বেগম

পায়ে হেঁটে রাত-দিন কিংবা ঝড়-বৃষ্টি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ পথে ছুটে চলেছেন মাইলের পরম মাইল। এ ছুটে- চলা নিজের জন্য নয়, বরং মানুষের জন্য। কেউ একজন খবর নিয়ে আসলো কোনো একটা গ্রামে কোনো নারীর উপর নির্যাতন হচ্ছে, তার পাশে দাঁড়ানো। কোনো নারী সন্তান জন্মদান অবস্থায় খুব কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু তাকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার মত অবস্থা বা সুযোগ নেই। তাকে নিজ উদ্যোগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কোনো কন্যা দায়গ্রস্ত বাবা আর্থিক অনটনের কারণে মেয়ে বিয়ে দিতে পারছে না তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। সমাজের মানুষদের সহযোগিতা নিয়ে সেই মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা। অভাবের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে নতুন করে তাদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষদের সন্তানরা ভরণপোষণ করতে অনীহা প্রকাশ করলে তাদের বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে সামাজিকভাবে বাধ্য করা এমন অনেক পরিবর্তন হয়েছে তাঁর হাত ধরে।

 

এভাবেই ফটিকছড়ি উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামের জাহানারা বেগম নামের এ মহীয়সী নারী প্রায় ২০ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের মানুষের জন্য। ১৪ বছর পূর্বে চার সন্তানকে ছোট রেখে স্বামী মারা যাওয়ায় পরও ভেঙে পড়েনি এ নারী। স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারে অভাব দেখা দিলেও নিজ উদ্যোগ ও পরিশ্রমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। পরবর্তীতে এলাকার মানুষের ইচ্ছায় হয়ে উঠেছেন ইউ পি সদস্য। পাশাপাশি চার সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি। তাঁর পরিশ্রমের মূল্যও পেয়েছেন তিনি। ২০২০ সালের মা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা পাঁচ জয়িতার একজন হয়েছেন তিনি। সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার কারণে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা থেকে সেরা জয়িতা নির্বাচিত হলেন জাহানারা বেগম।

 

সমাজে তাঁর এ অবদান রাখার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহানারা বেগম বলেন, আমাদের গ্রামীণ পরিবেশে অনেক কুসংস্কার রয়েছে। যেগুলোতে আমাদের জীবনব্যবস্থা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের সমাজকে এ কুসংস্কার থেকে বের করা খুবই দরকার। কিন্তু কে করবে সেই কাজ? কেউ না কেউ এ দায়িত্ব নিতে হবে। তাহলেই একদিন সমাজ আলোর পথে আসবে। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে আগে আমাদের সবাইকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে হবে। সমাজে নারী-পুরুষ সবাইকে যোগ্য সম্মান দিয়ে বাস করার সুযোগ দিতে হবে। আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। ছেলে-মেয়েদের ছোট রেখেই তাদের বাবা মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পরে এতিন ছেলে মেয়েদের নিয়ে আমি খুবই কষ্টে পড়ে যাই। তখনই এ ছেলে মেয়েদের নিয়ে জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ছেলে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে নিয়েছি। পাশাপাশি নানাবিধ সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে নিজেকে নিয়জিত করেছি। এসব কাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় এলাকার মানুষ ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গগণ আমাকে সকল কাজে ডাকতেন।

 

এসব কারণে জাহানপুর ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আমি ২০০৩ সাল থেকে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় সংরক্ষিত আসনে এখনো পর্যন্ত ইউ পি সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছি। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। দুই ছেলেই দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। একজন চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে বিএ পাশ করে বর্তমানে ফতেপুর জে বি নূরীয়া দাখিল ও মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক ও ২য় ছেলে চট্টগ্রাম সরকারি কর্মাস কলেজ থেকে এম বি এ শেষ করে বর্তমানে ইছাপুর বাদশা মিয়া চৌধুরী ডিগ্রি কলেজে কর্মরত আছেন।

 

পূর্বকোণ/মামুন

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 149 People

সম্পর্কিত পোস্ট