চট্টগ্রাম বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

২৬ ডিসেম্বর, ২০২০ | ৬:৪১ অপরাহ্ণ

চবি সংবাদদাতা

করোনাভাইরাসের জিনের বিন্যাস উন্মোচন করলেন চবির গবেষকরা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল গবেষক করোনাভাইরাসের (SARS-CoV-2) নমুনা সংগ্রহ করে প্রথমবারের মত চট্টগ্রাম বিভাগের সকল জেলার করোনাভাইরাসের জিনের বিন্যাস উন্মোচন (জিনোম সিকোয়েন্সিং) করেছে।

শনিবার (২৬ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক ও ড. এইচ. এম. আবদুল্লাহ আল মাসুদ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মো. খন্দকার রাজিউর রহমান, ইমাম হোসেন, মো. আরিফ হোসাইন ও সজীব রুদ্র, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ছাত্রী শান্তা পাল, এবং বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ছাত্র মো. ওমর ফারুক এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে জানানো হয়। পুরো গবেষণা কর্মটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জীব বিজ্ঞান অনুষদ ও বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ল্যাবে সম্পন্ন হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে গবেষকরা জানান, এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস ডিজিস-১৯) এর উপর সার্বিক চিত্র তুলে ধরা, সে লক্ষ্যে আমরা প্রত্যেকটি (১১টি) জেলার প্রত্যেক উপজেলা/থানা থেকে কভিড পজিটিভ রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেছি। তারপর আরএনএ এর পরিমাণ (কনসেনট্রেশন) ও গুণের (কোয়ালিটি) উপর ভিওি করে ৪৬টি নমুনা জিনোম সিকোয়েনসিংয়ের জন্য নির্বাচন করি। যার মধ্যে ৩৩টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স ৯৯% এর উপরে উন্মোচিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২ টি নমুনার জিনের বিন্যাস গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা (GISAID) ডাটাবেইসে জমা দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রশ্নকে সামনে রেখে আমাদের এই গবেষণা কাজ সাজানো হয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো চট্টগ্রামে ভাইরাসটি সম্ভাব্য কোন পথে প্রবেশ করে থাকতে পারে এবং এর মিউটেশন সম্পর্কে জানা। প্রাথমিকভাবে ৩০টি জিনোম বিন্যাস (সিকোয়েন্স) বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন –NCBI, USA) গবেষকরা ধারণা পাচ্ছি যে, চট্টগ্রাম বিভাগের ভাইরাসটির সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, সৌদি আরব, তাইওয়ান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ভাইরাসের দারুন সাদৃশ্য রয়েছে। প্রত্যেক জেলার ডাটা পৃথকভাবে পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে এর মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা আছে।

যেমন- চট্টগ্রাম জেলায় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইটালি, চেক রিপাবলিক, সৌদিআরব ও তাইওয়ান; নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও ফেনী জেলায় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপান; কুমিল্লা ও চাঁদপুরে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, চেক রিপাবলিক, ভারত ও জাপান; ব্রাক্ষনবাড়ীয়াতে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সৌদিআরব ও ভারত; কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে যুক্তরাষ্ট্র, সিয়েরা লিওন, জার্মানি, ইটালি, তাইওয়ান ও চেক রিপাবলিক; এবং খাগড়াছড়িতে অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব ও তাইওয়ান এর নমুনার সাথে সাদৃশ্য বেশী লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের গবেষণায় প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে যে, সব সিকোয়েন্সের (বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনাকৃত ৩০টির) বিভিন্ন লোকেশনে সর্বমোট ১২৬টি ভিন্ন ভিন্ন মিউটেশন হয়েছে, যেমনঃ ORF1a জিনে ৪৬টি, ORF1b এ ২৮টি, ORF3a এ ১৪টি, ORF6 এ ১টি, ORF7a এ ১টি, ORF8 এ ৫টি, ORF9b এ ১টি, ORF10 এ ১টি, S এ ১৭টি, E এ ১টি, M এ ১টি এবং N এ ১০টি ।

এছাড়াও বিভিন্ন জিনের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় মোট ৮৬টি নিউক্লিওটাইড পরিবর্তন হলেও অ্যামিনো এসিডে কোন পরিবর্তন হয়নি। সবগুলো মিউটেশন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ৫টি মিউটেশন চট্টগ্রামে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। পরিবর্তনগুলো হলঃ ORF1a এ I1300F, S এ D614G, ORF1b এ P314L, N এ R203K ও G204R। উল্লেখ্য, স্পাইক প্রোটিনের (S) D614G (যা সম্প্রতি মানব দেহের প্রাইমারি কোষ/প্রাণীদেহে সংক্রমণ ও ট্রান্সমিশনকে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম বলে বিশ্ববিখ্যাত “সাইন্স” সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে; সূত্রঃ DOI: 10.1126/science.abe8499) মিউটেশনটি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত (সিভাসু/বিজেআরআই) ৭টি সিকোয়েন্সের মধ্যে ২টিতে (২৮.৫৭%)উপস্থিত থাকলেও আমাদের সম্প্রতি করা ৩০টিতেই (১০০%) উপস্থিত আছে। যেহেতু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে স্পাইক প্রোটিন টীকা আবিষ্কারের মূল টার্গেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সেহেতু আমরা এই প্রোটিনটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের ভাইরাসের সিকোয়েন্স গুলোর (বিশ্লেষণকৃত ৩০টির) স্পাইক প্রোটিনের বিন্যাসে অন্য মিউটেশনের সাথে ৫টি এমন মিউটেশন পাওয়া গেছে যেগুলো GISAID ডাটাবেইস অনুসারে অন্যান্য দেশে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ থেকে এই প্রথম শনাক্ত করা হয়।

মিউটেশনগুলো হলো- S155I (১টি নমুনায় প্রাপ্ত), N354S (১টি), S477N (১টি), P681H (১টি), এবং V1122L (১টি)। এদের মধ্যে P681H মিউটেশন গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে পাওয়া নতুন ভাইরাসে কয়েকটি মিউটেশনের একটি (সূত্র-https://edition.cnn.com/2020/12/24/opinions/ coronavirus-variant-what-weve-learne এ বিষয়ে বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রক্টর ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া বলেন, আমাদের একটি উদ্দেশ্য ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো কাজটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা এবং এটি সম্পন্ন করার জন্য সকল ধরনের লজিস্টিকস, টেকনিক্যাল সাপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ যেমন অত্যাবশ্যক ছিল তেমনিভাবে প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট, কেমিক্যাল এবং বিভিন্ন ধরনের কিটস এর সরবরাহ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এই বিষয়গুলোর উপর যথাযথভাবে নজর দিতে গিয়ে আমাদের কাজটি শেষ করতে প্রচুর সময় লেগেছে, যদিও প্রাথমিকভাবে আমরা কাজটি শুরু করেছিলাম গত জুলাই মাসে এবং যা আগস্টের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

তিনি আরও বলেন, আমাদের ভিসি ম্যাম অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার আমাদেরকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি করোনায় নিজের স্বামীকে হারিয়েছেন। আমাদের কাজকে এগিয়ে নিতে প্রথম থেকে আগ্রহ দেখিয়েছেন ম্যাম। অবশেষে আমরাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে সফলভাবে কাজটি সম্পন্ন করেছি।

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 274 People

মন্তব্য দিন :

সম্পর্কিত পোস্ট