চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০২ জুন, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৫ জুন, ২০১৯ | ২:০৬ পূর্বাহ্ণ

ডেইজী মউদুদ

তাপদাহ আর নিদাঘে আজ আষাঢ়স্য দিবস

আজ পহেলা আষাঢ়, কবিগুরুর ভাষায় আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে প্রকৃতিতে চলছে প্রচ- গরম আর তাপদাহ। ঋতুচক্রের আবর্তে গতকাল জ্যৈষ্ঠ মাস শেষে গ্রীষ্মকালের পরিসমাপ্তি হলেও প্রকৃতিতে এখনও চলছে খরার তীব্র রাজত্ব, প্রচ- নিদাঘ আর অস্বাভাবিক গরমের খা-বদাহন। নিদাঘের নীল মেঘমালারা প্রকৃতির স্বচ্ছ আকাশে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে, মেঘেরা খ- খ-ভাবে জমছে, কিন্তু টুকরো টুকরো সেই মেঘপুঞ্জ জলকণাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারছে না, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে এই অবস্থা, তা বুঝতে আর কারো বাকি নেই। বৈশাখ আর জৈষ্ঠ্য এই দুই মাস ধরে গ্রীষ্মের দাপটে মানুষ আর প্রকৃতি যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। নিয়মমাফিক বৈশাখ আর জ্যৈষ্ঠ দুই মাসের খরতাপে জর্জরিত মানুষ , মাটি ও গাছপালা যখন গরমে হাঁসফাঁস করে , রুক্ষ প্রকৃতি যখন এক বিন্দু বৃষ্টি ধারার জন্য আকাশপানে চেয়ে থাকে, তখনই আষাঢ়ের প্রথম দিবসে মেঘের ডমরু বাজিয়ে প্রকৃতিতে বর্ষা নামে। কিন্তু, এবারে আমরা প্রকৃতির অন্য এক রূপ প্রত্যক্ষ করছি। এবার বর্ষার সুর লহরীর চিহ্ন নেই, কালো মেঘের আনাগোনা নেই, নেই কদম্ব কেতকী, নেই মেঘের ডমরু, বিজলির চমক, ঝমঝম বৃষ্টি ! ঠা-া শীতল হাওয়া, বারি সুখ! কিছুই যে নেই!
এই অবস্থাকে বলতে হবে প্রকৃতির মধুর প্রতিশোধ। কেননা, প্রকৃতি হলো বিধাতার দান। প্রকৃতির উপর আমরা যদি অবিরাম অবিচার করি তাহলে সে এক পর্যায়ে বৈরি আচরণ শুরু করতে বাধ্য। আমরা প্রকৃতি নিধন করছি অনেকদিন ধরে। নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় নিধন, পশু পাখি ধ্বংস,নদী দূষণ, মাঠ , পুকুর জলাভূমি ভরাট , শিল্পবর্জ্য, বায়ুদূষণ সব মিলিয়ে প্রকৃতি এখন তার সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তাই এখন আমরা প্রকৃতির এমন বিদ্রোহী রূপ প্রত্যক্ষ করছি। প্রকৃতির এমন বিদ্রোহের কারণে গত কয়েক দিন ধরে আমাদের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে চলছে তাপপ্রবাহ। এরই মাঝে বর্ষপঞ্জী অনুসারে আজ রূপময় ঋতু বর্ষার প্রথম দিন । অথচ, প্রকৃতিতে রুদ্র পরিবর্তনের খড়গ। ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগণে তিল ঠাঁই আর নাহিরে’ কবির বর্ণনার সে আষাঢ় আজ কোথায় ? ‘ এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে, এসো করো স্নান নবধারাজলে…। গ্রীষ্মের দাবদাহের মধ্যে এমনই হওয়ার কথা ছিল আজ। কিন্তু আজকের চিত্র একবারেই ভিন্ন, পরিবেশ, প্রতিবেশ আর ও ভিন্ন, এক কথায় অস্বাভাবিক।
আনুষ্ঠানিক ঋতু বর্ষার শুরু আজ । বর্ষাকাল চলবে শ্রাবণের শেষ দিনটি পর্যন্ত । আবহাওয়াবিদরা বলেন, এ সময় জলীয় বাষ্পবাহী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয় বর্ষায়। তাই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। কি গ্রাম, কি নগর সর্বত্রই বর্ষার আগমনী বার্তা জানান দেয় কদমফুল । যেন একই কথার জানান দিতে পেখম মেলে ময়ূর। বৃষ্টির জল গায়ে নিয়ে নৃত্য করে। বর্ষায় প্রকৃতির এমন পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে নজরুল লিখেছেন :
‘রিম্ঝিম্ রিম্ঝিম্ ঘন দেয়া বরষে
কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে’
বর্ষায় নিজের চিত্তচাঞ্চল্যের কথা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
‘মন মোর মেঘের সঙ্গী,
উড়ে চলে দিগ্ দিগন্তের পানে. . .
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বরিষণ সঙ্গীতে
রিমঝিম রিমঝিম রিমঝিম..’
রিমঝিম এ বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দে কাটে বাঙালির শৈশব। স্কুলে যেতে যেতে কিংবা ফেরার পথে দুরন্ত কিশোরী আনন্দে গায়ে মাখে বৃষ্টির ফোটা। তুমুল বৃষ্টিতে গাঁয়ের ছেলেরা নেমে পড়ে ফুটবল নিয়ে। বর্ষার এই রূপ কখনো কি ভোলা যায়?
বর্ষার সবই উপভোগ্য। আবার ভারি বর্ষণে, পাহাড়ি ঢলে গ্রামের পর গ্রাম যে ভাসিয়ে নেয় সেও বর্ষা! বন্যাকবলিত নিচু এলাকার মানুষ তাই আতঙ্কে পার করে বর্ষা। একই কারণে সারা বছরের অর্জন ফসল তলিয়ে যায়। শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়।
সুখ স্মৃতিগুলো মনে রেখেই প্রতিবছর বর্ষাকে বরণ করে নেয় বাঙালি। বিশেষ করে শহরে নগরে হরেক আয়োজনে চলে বর্ষা বন্দনা।
বর্ষাবিহীন বাংলাদেশ ভাবাই যায় না। বর্ষা ঋতু তার বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বতন্ত্র। বর্ষা ঋতু কাব্যময়, প্রেমময়। বর্ষার প্রবল বর্ষণে নির্জনে ভালোবাসার সাধ জাগে, চিত্তচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। শত অনাকাঙ্খিত ঘটনার ভিড়েও কোথায় যেন মেলে এক চিলতে বিশুদ্ধ সুখ। কদমফুলের মতো তুলতুলে নরম, রঙিন স্বপ্ন দুই চোখের কোণে ভেসে ওঠে, ঠিক যেমন করে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়।
বর্ষা ফুল ফোটায়। বর্ষার এই শীতল আবহাওয়ায় গাছে গাছে কদম ফুলের সমারোহ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বর্ষার আগেই গাছে গাছে কদমফুল ফুঠেছে।
বর্ষা কবিদের ঋতু। বর্ষা নিয়ে কবিরা লিখেছেন অসংখ্য কবিতা-গল্প-গান। বর্ষা মানেই সময়-অসময়ে ঝমাঝম বৃষ্টি, কদমাক্ত পথঘাট, খাল-বিলে থইথই পানি, নদীতে বয়ে চলা ছবির মতো পালতোলা নৌকার সারি। ফুলে ফুলে শোভিত হয় প্রকৃতি। তাল তমাল শাল পিয়াল আর মরাল কপোতের বন বীথিকায় চোখে পড়ে বকুল, কদম, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও রজনীগন্ধা।
রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষামঙ্গল’ আর কালীদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের কথা উল্লেখ না করলে বর্ষা ঋতুর স্বাদই অপূর্ণ থেকে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’ এর পাতায় পাতায় ভরে আছে বর্ষার ঘনঘটা, গুরুগম্ভীর বৃষ্টির কথা।
জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি’। আষাঢ়ে জলভারানত ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনো বা ‘প্রাণনাথ’ এর মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা।
বর্ষা মানব মনে বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দিলেও হতদরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবনে মহাদুর্যোগ ও দুর্বিপাক বয়ে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন বর্ষা আর গ্রীষ্মকে আলাদা করে চিহ্নিত করা দিনে দিনে দুরূহ হচ্ছে। আষাঢ়-শ্রাবণ দু’মাস বর্ষাকাল। তবুও কর্মহীন দিবস রজনী, উদাস মনের তোলপাড়, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস আর দু’জনে মুখোমুখি গভীর দুঃখে-দুঃখী .. ‘বর্ষা কে দেয় এক ভিন্নমাত্রা।
তবে হঠাৎ বর্ষা যেমন আনন্দের, বর্ষার নির্মম নৃত্য তেমনি হঠাৎ বিষাদে ভরিয়ে তোলে জনপদ। তবুও বর্ষা বাঙালি জীবনে নতুনের আবাহন। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পলির আস্তরণে আনে জীবনেরই বারতা। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা বাঙলা মায়ের নবজন্ম এই বর্ষাতেই। সারা বছরের খাদ্য-শস্য-বীজের উন্মেষতো ঘটবে বর্ষার ফেলে যাওয়া অফুরন্ত সম্ভাবনার পলিমাটি থেকে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট