চট্টগ্রাম সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

১৩ ডিসেম্বর, ২০২০ | ৫:৪৯ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশ মাতৃকার ডাকে ২১ জুন যুদ্ধে যাই : মুক্তিযোদ্ধা মো. জাকির হোসেন

১৯৭১ সালের ২১ জুন দুপুর আড়াইটায় কর্নেলহাটের উত্তরে বাদামতলী থেকে শুভপুর যাওয়ার বাসে উঠলাম আমরা আমরা ১২ জন যুবক। মিরসরাই বড়তাকিয়া বাস স্টেশনে বাস থেকে নেমে সোজা পশ্চিম দিকে কিছুদুর গিয়ে আবার আবার উত্তর দিকে রওনা দিলাম। মধ্যম মায়ানী ও উত্তর মায়ানী অতিক্রম করার পর মিরসরাই দারোগাহাটের কাছাকাছি যখন পৌঁছি তখন বিকাল সাড়ে ৫টা। দারোগাহাট পার হতে একদল মুক্তিযোদ্ধা আমাদেরকে চত্বর ভূঁইয়াহাটে নিয়ে গিয়ে একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরদিন ২২ জুন একজন গাইড আমাদের নিয়ে রওনা দিল। শ্রীনগর সীমান্তে এলাম ভোর ৫ টায়। ২৩ জুন ভোর সাড়ে ৫টায় সীমান্তবর্তী শুভপুর খাল নৌকায় পার হলাম। সন্ধ্যা ৭ টার পর হরিনাক্যাম্পে পৌঁছলাম। আমার শারীরিক অবস্থা খুব বেদনাদায়ক। পা ফুলে গেছে। প্রচন্ড যন্ত্রণা। হরিনাক্যাম্পের পরিচালকরা আমাদের শরণার্থীর তাবুতে নিল।

২৭ জুন ভোর ৫টার দিকে আমাদেরকে বড় একটি পাহাড়ে নিয়ে গেল। এ পাহাড়ে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা ভর্তি এবং যাচাই বাছাই ইত্যাদি কাজ চলতো। বাছাইশেষে যাদেরকে নিয়োগ দিত তাদেরকে এই পাহাড়ে বা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। ঐদিন হরিনাক্যাম্প থেকে আমাদের মনু নামক জায়গায় নেওয়া হয়। ২৮ জুন লায়লাপুর ক্যাম্পের দিকে রওনা দিয়ে পরদিন সকালে আসামের শিলচর টাউনের কাছাকাছি পৌঁছলাম।

২৯ জুন রাত ৮ টা ১০ মিনিটে ক্যাম্পের মাঠে নিয়ে গেল। মাঠের তিন দিকে উচু পাহাড়। প্রথম পাহাড়টিতে ব্যারাক ছিল। ব্যারাকে ইঠলে সবাইকে এক মগ চা, একটা হাফপ্যান্ট ও একটা গেঞ্জি দিল। ব্যারাকের সামনে লেখা আছে মুজিব উইং। মুজিব উইংয়ে রাত সাড়ে ৯টায় ভাত খাওয়ার পর মাঠে নিয়ে গেল। মাঠের ভিতর সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করালো। তিন জন আর্মি অফিসার এল। তারা আমাদের তিনভাগে ভাগ করল। অপর দুই পাহাড়ে আরও দুইটি ব্যারাক আছে। একটার নাম তাজউদ্দিন উইং অপরটার নাম ছিল নজরুল উইং। আমি যেই ব্যারাকে উঠলাম ব্যারাকটির নাম ছিল তাজউদ্দিন উইং। ১ জুলাই থেকে অস্ত্রের ট্রেনিং আরম্ভ হল। ২১ জুলাই অস্ত্র গোলাবারুদ ট্রেনিং সমাপ্ত হয়। ২৩ জুলাই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেদিন ভোরে চট্টগ্রাম জেলার ভিতর গেরিলা বাহিনী হিসাবে পাঠানোর জন্য রাস্তায় সবাইকে এনে দাঁড় করালো।

২৪ জুলাই সন্ধ্যায় সাড়ে ৭টায় বাংলাদেশে প্রবেশ করি। রামগড় রোড দিয়ে আমরা আসার পথে পাকিস্তানি একটা সেনা জিপে আক্রমণ করে তছনছ করে দিই। ২৫ জুলাই সন্ধ্যায় রামগড় ত্যাগ করে ফটিকছড়ি আসি। হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাদের গাড়ির আওয়াজ ও গোলাগুলির শব্দ শুনি। সামনে এগোতে ২০০ গজ দূরত্বে পাকিস্তানী সেনাদের পজিসন দেখা যায়। এর ১০ মিনিটের মধ্যে শুরু গোলাগুলি প্রায় দুই ঘণ্টা পর শান্ত হয়। পরে ঘটনাস্থলে দেখলাম ৫ পাকিস্তানি সৈন্য মারা গেছে।

পরদিন সকালে হাটহাজারীতে এলাম। ২৭ জুলাই শহরে এসে পাহাড়ের ভিতর ক্যাম্প তৈরি করি। কর্নেলহাটের কোয়ার্টার মাইল উত্তরে রেললাইনের নিছে কালিরছড়া ছড়ার উপর যে ব্রিজ ছিল তা উড়িয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিলাম আমরা।

উত্তর দিক থেকে যাত্রীবাহী ট্রেনে করে পাকিস্তানি সৈন্যরা আসার খবর জেনে ব্রিজের নিচে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইন(বিস্ফোরক) বসিয়ে রাতে ট্রেন এলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় অনেক পাকিস্তানি সৈন্য মারা যায়। এই ঘটনার ৬ দিন পর পাকিস্তানি দালালেরা আমার বাড়িতে রেইড করে। দুইদিন পর আমি যখন বাড়িতে এলাম তখন তারা আমাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ডবলমুরিং থানা পুলিশ এসে আমাকে থানায় নিয়ে গেল। অমানুষিক নির্যাতন করে। এরপর আমাকে জিআরপি থানায় নিয়ে গেল। এরপর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আরো চারদিন নির্যাতন করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে পাকিস্তানি সৈন্যরা ১৫ দিন ধরে নির্যাতন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরপর জেলেই থাকি।

 

পূর্বকোণ/পি-এন.এইচ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 109 People

সম্পর্কিত পোস্ট