চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১

সম্মুখযুদ্ধে পাক আর্মির অনেকেই হতাহত, দুই মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন

৭ ডিসেম্বর, ২০২০ | ১২:০২ অপরাহ্ণ

সুকান্ত বিকাশ ধর

বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবুল কান্তি মজুমদার

সম্মুখযুদ্ধে পাক আর্মির অনেকেই হতাহত, দুই মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন

‘ভারত থেকে ট্রেনিং শেষে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমাদের উত্তর সাতকানিয়া গ্রুপের কমান্ডার জলিল বকসুর নেতৃত্বে পটিয়ার কাশিয়াইশ থেকে এক রাতে পায়ে হেঁটে চন্দনাইশের হাশিমপুর বড়ুয়া সম্প্রদায়ের বসবাস ক্যাতেঙ্গা পাড়ায় সকালে পৌঁছে দুপুরের খাবার সেেের নিই। একই দিন রাতে জঙ্গল হাশিমপুর খামার বাড়ি পৌঁছি। অবস্থান টের পেয়ে পাকিস্তানি আর্মিরা আমাদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ শুরু করে। আমরাও পাল্টা আক্রমণ করি।

সময়টা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। একইদিন পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে পটিয়া গ্রুপও আমাদের সহায়তায় ছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে এক নাগাড়ে চলতে থাকা তুমুল ও ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধে সহযোদ্ধা বিমল চৌধুরী কাঁধ ও মুখে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে পিছু হটেন। তার কাছাকাছি ছিলেন আমিরাবাদের সুভাষ মজুমদার। তিনিও গুলিতে মাথা ও গলা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। ৫ দিন পর পুরানগড়ের শীলঘাটায় আহত বিমল চৌধুরীও মারা যান। তাদের মধ্যে সুভাষকে ঘটনাস্থলে ও বিমলকে শীলঘাটায় মাটি চাপা দেয়া হয়’।

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসব কথা বলছিলেন, সাতকানিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবুল কান্তি মজুমদার। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পটিয়া হুলাইন ছালেহ্ নূর কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী, এ মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবুল মজুমদার বলেন, তখন পুরো চট্টগ্রাম পাক আর্মি দখলে নেয় এবং কালুরঘাট সেতু অতিক্রম করেই শাকপুরায় অনেক লোককে নির্বিচারে হত্যা করে। জুন মাসের দিকে আমি নিজ বাড়ি নলুয়ায় চলে আসি। পরে আমার ছোট ভাই ও মুক্তিযোদ্ধা অরুণ মজুমদারসহ আরো ১৮ জন ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্যে লোহাগাড়ার কলাউজানে পৌঁছি। সেখান থেকে প্রায় ২০০ শরণার্থীর একটি দল পাহাড়-ঝিরি উঁচুনিচু পথ ৫দিন পায়ে হেঁটে ভারতের পারবা বিএসএফ ক্যাম্পে পৌঁছি। পরে ৮টি বিএসএফ ক্যাম্প অতিক্রম করে দেমাগ্রি শরণার্থী ক্যাম্পে যাই।

ক্যাম্পে ১০দিন থাকার পর যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে সাবেক এমএনএ আবু ছালেহ সাহেব ক্যাম্পে প্রচারণা চালান। ডেল্টা কোম্পানির প্রধান মেজর বাজোয়া শিং এর অধীনে দেমাগ্রি আর্মি ট্রেনিং ক্যাম্পে দেড় মাসের মত ট্রেনিং গ্রহণ করি। ট্রেনিং চলাকালীন রাঙ্গামাটির ছোট হরিণায় ট্রেনিংরতরা গিয়ে আক্রমণ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী মিজো সম্প্রদায়ের অনেককে হত্যা করে। তখন মিজোদের সমর্থনে পাক আর্মি ঠেকামুখ খাল দিয়ে আসলে ভারতীয় আর্মিরা গ্রেনেড মেরে বোটটি ডুবিয়ে দেয়।

বাবুল মজুমদার আরো বলেন, ট্রেনিং শেষে লুং লে নামক এলাকায় আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের ১নং ব্যাটালিয়ন হেডকোয়াটার হরিণা ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম। সেখানে গঠন করা হয় গ্রুপ। আমাদের গ্রুপের নাম ছিল উত্তর সাতকানিয়া গ্রুপ। কমান্ডার জলিল বকসু ও ডেপুটি কমান্ডার আবুল হোসেন। গ্রুপ নং-১৫৩। সদস্য সংখ্যা ৩৩ জন। গ্রুপের মধ্যে ৩জন মুসলিম ছাড়া বাকিরা সবাই হিন্দু। সরবরাহকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ হলো এলএমজি, এসএমজি, এসএলআর, থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও গ্রেনেড। আমি ব্যবহার করতাম এসএলআর।

১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীনের পর এইচএসসি প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে পরীক্ষা দিই এবং পর্যায়ক্রমে বিএ পাশ করে ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে সোনালী ব্যাংকে যোগদান করে ২০১০ সালে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে অবসর গ্রহণ করি। মুক্তিযোদ্ধা বাবুলের লাল মুক্তিবার্তা নং-০২০২০৬০১১৩, গ্রেজেট নং-৪২৬৬ ও সনদ নং-৪৭০৫৫

তিনি সাতকানিয়ার পূর্ব নলুয়া ৩নং ওয়ার্ডের মজুমদার বাড়ির মৃত বিরাজ চন্দ্র মজুমদারের সন্তান।

 

 

 

 

 

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 93 People

সম্পর্কিত পোস্ট