চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১

২ অক্টোবর, ২০২০ | ১:০৬ অপরাহ্ণ

সারোয়ার আহমদ

খালের মুখে জাল বসাবে কে!

প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টন বর্জ্য চট্টগ্রাম শহরের প্রাণখ্যাত নদী কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধান রিপোর্ট অনুযায়ী নগরীর ৬০ লাখ মানুষের বর্জ্যের মধ্যে ৪০ শতাংশ সংগ্রহ করে সিটি কর্পোরেশন। বাকি ৬০ শতাংশ বর্জ্য গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। নগরীর শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিকের এ বর্জ্য ১৬টি খালের মাধ্যমে নদীর পানিতে মিশে সৃষ্ট দূষণে ত্রাহি অবস্থা কর্ণফুলীর। এই কর্ণফুলী নদী রক্ষায় নগরীর ১৬টি খালের সাথে কর্ণফুলীর সংযোগস্থলে জাল বসানোর প্রস্তাব করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে এমন প্রস্তাব বারংবার করা হলেও এখন পর্যন্ত কোন পরিকল্পনা করেনি ওই দুই সরকারি সংস্থা।
এদিকে কর্ণফুলী নদীর উপর নির্ভর করেই টিকে আছে দেশের অর্থনীতির চাকা চট্টগ্রাম বন্দর। সেই বন্দরের জাহাজ চলাচলের জন্য কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ও দূষণ রক্ষার দায়িত্বও চট্টগ্রাম বন্দরের। তবে সেই দায়িত্ব পালন করতে প্রায় ২৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ করতে পারেনি। আর এই না পারার নেপথ্যে রয়েছে কর্ণফুলী নদীর মাত্রতিরিক্ত পচনশীল প্লাস্টিক জাতীয় পলিথিন বর্জ্য।
সর্বশেষ কাজের ফলাফল ও অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্ণফুলীর ড্রেজিং কাজটি শুরুর লক্ষ্যে আগামী ৪ অক্টোবর (রবিবার) চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠকে বসবেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী। তবে এতো বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে কর্ণফুলী নদী খনন করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না বলে মন্তব্য করেন ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান।
তিনি বলেন, কর্ণফুলী নদীর ৪২ লাখ ঘনমিটার খননের পরিকল্পনা ছিল সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং প্রকল্পে। খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু কাজ শুরুর পর ১২ লাখ ঘনমিটার খনন করে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এই কাজে নিয়োজিত সংস্থা। এর একটাই কারণ কর্ণফুলী নদীর তলদেশে রয়েছে ৩ থেকে সাড়ে ৫ মিটার পুরু পলিথিন ও অপচনশীল বর্জ্যের স্তর। চীন থেকে আনা ৩১ ইঞ্চি ব্যাসের সাকশন ড্রেজার দিয়ে কাজ করেও খনন কাজ শেষ করা যায়নি ওই বর্জ্যের কারণে। পুরো কর্ণফুলী নদীর তিন চতুর্থাংশ তলদেশেই এমন বর্জ্য ৩ থেকে ৫ মিটার পুরু স্তর রয়েছে। এগুলো তুলতে ‘গ্র্যাব শিপ’ ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সেই সাথে ৪২ লাখ ঘনমিটারের সাথে আরো ৯ লাখ ঘনমিটার বর্জ্যসহ পলি উত্তোলনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সেটি অনুমোদনের জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব রবিবার বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করবেন। তবে এতোসব করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না যদি কর্ণফুলীর সাথে যুক্ত ১৬টি খালের মুখে জাল বসানো না হয়। জাল বসালে সেখানে বর্জ্যগুলো আটকে যাবে। ফলে কর্ণফুলী দূষণ থেকে রক্ষা পাবে। তবে সেক্ষেত্রে নিয়মিত জালে আটকে যাওয়া ময়লাও পরিষ্কার করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে বার বার অনুরোধের পরেও কর্ণফুলী নদীর সাথে যুক্ত ১৬টি খালে মুখে জাল বসানোর কোন পরিকল্পনা করেনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এমনকি চলমান সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পেও খালের মুখে জাল বসানোর কোন পরিকল্পনা রাখা হয়নি।
এ বিষয়ে সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ শাহ আলী পূর্বকোণকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে কর্ণফুলী নদীর সাথে যুক্ত ১৬টি খালের মুখে জাল বসানোর কোন পরিকল্পনা নেই। কারণ জালে ময়লা আটকে গেলে খালের পানি যাওয়া বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করবে। অতীতে এমন জাল বসিয়ে সুফল মেলেনি। ময়লা পরিষ্কার না করায় পুরো জালে ময়লা আটকে পানি যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে সেই জাল তুলে ফেলতে হয়েছিল। তাই জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে খালের মুখে জাল বসানোর কোন পরিকল্পনা রাখা হয়নি।

এদিকে সিডিএ ছাড়া চট্টগ্রামের অন্যতম সেবা সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিকল্পনাতেও খালের মুখে জাল বসানোর পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন পূর্বকোণকে বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলছে। সেই কাজে খাল খনন বিষয়েও কাজ আছে এবং তারা সেনাবাহিনী নিয়ে সেই কাজ ভালভাবেই করছেন। তাই আপাতত সিটি কর্পোরেশনের খালের মুখে জাল বসানোর মত কোন কাজের পরিকল্পনা নেই। তবে কর্ণফুলী নদী রক্ষার জন্য ময়লা আটকাতে জাল বসানোর চিন্তাটি ভাল একটি উদ্যোগ। এটি করা সম্ভব হলে কর্ণফুলী নদী বাঁচবে। এর সাথে আমাদের জনগণের সচেতন থাকতে হবে। মানুষ যত্রতত্র পলিথিন বা অপচনশীল বর্জ্য না ফেললেতো নালা বা খালে করে নদীতে বর্জ্য পড়ার কথা না। তাই জনগণকে আগে সচেতন হতে হবে। জনগণ সচেতন হলে খালের মুখে জালেরও প্রয়োজন হবে না।

মাত্রাতিরিক্ত দূষণে অস্তিত্ব সংকটের দিকে এগুচ্ছে কর্ণফুলী নদী। সঙ্গে জলজ জীব, নাগরিক স্বাস্থ্য, সামাজিক জনজীবন ও দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। কর্ণফুলী নদী রক্ষায় প্রণীত ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায়ও এসব বিষয় উঠে এসেছে। ২৭৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৬৬৭ মিটার গড় প্রস্থের কর্ণফুলী নদীর এখন মাত্রাতিরিক্ত দখল ও দূষণে ত্রাহি অবস্থা।

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান পূর্বকোণকে বলেন, কর্ণফুলীতে পলিথিনসহ শিল্প কারখানার বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। খালে ও নালায় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে চসিক ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখে দূষণ বন্ধ করতে হবে। সিডিএ, চসিক, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর একসাথে কাজ না করলে কর্ণফুলী দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের আওতায় সদরঘাট থেকে উজানের দিকে বাকলিয়ার হামিদচর পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা চার মিটার গভীরতায় খনন করে ৪২ লাখ ঘনমিটার পলি ও মাটি তোলার কথা ছিল। ই-ইঞ্জিনিয়ারিং ও চায়না হারবার নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০-২৬ ইঞ্চি ব্যাসের তিনটি ড্রেজার দিয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কর্ণফুলীর তলদেশে জমে থাকা পলিথিন, ময়লা ও প্লাস্টিক জাতীয় বিভিন্ন পদার্থের কারণে বারবার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় ড্রেজারগুলোর। পরে খননকাজের জন্য গত বছরের মার্চ মাসে চীন থেকে আনা হয় সাকশন ড্রেজার। পাইপ স্থাপনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ১৬ মে থেকে সাকশন ড্রেজার দিয়ে খননকাজ শুরু হয়। আশা ছিলো এ ড্রেজারে খননকাজ শেষ করা যাবে। কিন্তু নদীর তলদেশে কয়েক স্তরে জমাট হয়ে থাকা পলিথিনের কারণে বারবার বন্ধ হয়ে যেতে থাকে ড্রেজারের কাজ। একবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পলিথিন পরিষ্কার করে আবারও শুরু করতে হয় কাজ। এভাবে আর না পেরে শেষ পর্যন্ত সাকশন ড্রেজার দিয়ে খননকাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে চীন থেকে আনা সাকশন ড্রেজারটিও পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরীকল্পনা হয় ‘গ্র্যাব ড্রেজার’ দিয়ে খনন কাজ করার।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 203 People

সম্পর্কিত পোস্ট