চট্টগ্রাম বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

১ অক্টোবর, ২০২০ | ৫:১৭ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

‘কমিশন’ চেক উড়ে এলএ শাখায়

ওয়াসার ভাণ্ডালজুড়ি প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত ‘কমিশন’ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। অধিগ্রহণের চেক গ্রহণের আগেই কমিশনের চেক প্রদান করতে হয়। দালালের মাধ্যমে সার্ভেয়ার ও কানুনগো থেকে শুরু করে অফিস সহকারী এবং অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি করা হয়। একাধিক ভূমি মালিকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

শুধু একটি প্রকল্প নিয়ে নয়, অন্যান্য প্রকল্পেও একই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে ১৩১টি প্রকল্প রয়েছে এলএ শাখায়। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকা থেকে ৫৮ লাখ টাকাসহ জনৈক মো. ইলিয়াছকে আটক করেছিল পুলিশ। তা এলএ শাখার নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ৫৮ লাখ টাকা উদ্ধারের পর থেকে তা জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। দুর্নীতি ও অনিয়মরোধে তখন এলএ শাখায় ব্যাপক রদবদল করা হয়েছিল। সিসি ক্যামেরায় আওতায় আনা হয়েছিল। তারপরও কমিশন বাণিজ্য ও দালালের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। গত বছর চেইনম্যান নজরুলকে গ্রেপ্তারের পর কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতি সুস্পষ্ট হয়ে যায়। দুদক অভিযান চালিয়ে নগদ সাড়ে সাত লাখ টাকা ও কোটি টাকার চেকসহ গ্রেপ্তার করেছিল নজরুল ইসলামকে।

বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নে ‘ওয়াসা ভা-ালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় পানি শোধানাগার নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয়। ২০১৬ সালের মে মাসে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়।

এলএ শাখা সূত্র জানায়, বোয়ালখালী ভান্ডালজুড়ি এলাকায় নির্মিত হচ্ছে পানি শোধানাগার প্রকল্প। পটিয়া ও পটিয়ার দৌলতপুর, আনোয়ারার বন্দর মৌজায় হচ্ছে প্রকল্পের পানি রিজার্ভার নির্মাণ।

প্রকল্পের সার্ভেয়ারের দায়িত্বে ছিলেন এ কে আজাদ খান, মো. আনিছুর রহমান। কানুনগো হচ্ছেন জয় প্রকাশ চাকমা, অফিস সহকারী এম এইচ এম আলী আযম খান। অতিরিক্ত ভূমি কর্মকর্তা মো. হামিদুল হক। ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ছিলেন সুরাইয়া আক্তার সুইটি।

ক্ষতিপূরণ পাওয়া একাধিক লোকের সঙ্গে কথা হয় পূর্বকোণের। তারা জানান, অধিগ্রহণে সার্ভেয়ার ও কানুনগোদের হাতে জিম্মি ভূমি মালিকেরা। অধিগ্রহণের নোটিশের পর থেকেই তাদের সঙ্গে অলিখিত চুক্তি করতে হয়। ঘাটে ঘাটে টাকা গুনতে হয় ভূমি মালিকদের। অন্যথায় নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। জমির কাগজপত্র থেকে শুরু করে জমির পরিমাণ নিয়ে খুঁত খুঁজতে থাকেন সার্ভেয়ার ও কানুনগোরা। সেজন্য দালালের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হয়।

ভূমি মালিকেরা জানান, ভূমি অধিগ্রহণে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিয়েছে এলএ শাখা। রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে ৮-১০ শতাংশ কমিশন নিয়েছে। অধিগ্রহণের চেক প্রদানের আগেই ‘কমিশন’ হিসাব করে চেক দিতে হয়।

পূর্বকোণের কাছে এই ধরনের ৫টি চেক সংরক্ষণে রয়েছে। তাতে দেখা যায়, চেকগুলোতে টাকার অঙ্ক ও প্রদানকারীর স্বাক্ষর রয়েছে। টাকা উত্তোলনকারী ও তারিখ লিখা নেই।

একাধিক ভূমি মালিক জানান, অধিগ্রহণের চেক প্রস্তুত করার আগেই একই ব্যাংক হিসাব থেকে কমিশনের চেক দিতে হয়। সার্ভেয়ারের মাধ্যমে দালালদের হাতে চেক প্রদান করতে হয়। দালালের সেই চেক ব্যাংক ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে পাস করিয়ে আনেন। এজন্য আলাদা বকশিস দিতে হয়। লাখে ৩-৫শ টাকা পর্যন্ত বকশিস গুনতে হয় ভূমি মালিকদের।

এই প্রকল্পের একাধিক ভূমি মালিক জানান, ‘এলএ শাখা মাফিয়াদের দখলে। কমিশন ছাড়া অধিগ্রহণের চেক পাওয়া যায় না। সার্ভেয়ার, কানুনগো, চেইনম্যান ও অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের কাছে জিম্মি ভূমি মালিকেরা। প্রতিটি প্রকল্প থেকে কমিশন নেয়া হয়।

এক ভূমি মালিক বলেন, ‘১২-১৫ শতাংশ কমিশনের চুক্তি হয়। কিন্তু জমির ওপর আপত্তি রয়েছে বলে দাবি করে শেষপর্যন্ত ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিয়েছে সার্ভেয়াররা।

তাদের দাবি, দালালচক্রের সঙ্গে ব্যাংক ও হিসাবরক্ষণ শাখার কর্মকর্তারা জড়িত। না হলে অধিগ্রহণের চেক পাস হওয়ার আগেই কমিশনের চেক থেকে টাকা উত্তোলন হয় কীভাবে।

গত বছর চেইনম্যান নজরুল ইসলামকে ষোলশহর শপিং কমপ্লেক্সে দোকান থেকে গ্রেপ্তার করেছিল দুদক। নজরুলের কাছ থেকে কোটি টাকা চেক উদ্ধার করা হয়েছিল। ভূমি অধিগ্রহণ শাখার বিভিন্ন নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। নজরুলের ঘনিষ্টজন আবদুল্লাহ এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) আবু হাসান সিদ্দিক গতকাল সন্ধ্যায় পূর্বকোণকে বলেন, ‘ডিসি স্যারের নির্দেশে মানুষ যাতে উপকার পায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়। তারপরও নিজেদের অজান্তে নিচের কর্মচারীরা করতে পারে। এই ধরনের অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে বদলি করে দেব।’

থামছে না দালাল দৌরাত্ম্য : ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে ৫৮ লাখ টাকা উদ্ধার হয়েছিল। ওই টাকা এলএ শাখার কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওঠে এসেছিল। সেই ঘটনার পর এল এ শাখার এডিসি, কানুনগো ও সার্ভেয়ারসহ অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় বদবদল করা হয়েছিল। ভূমি অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য থামানোর জন্য সিসি ক্যামরার আওতায় আনা হয়েছিল। তারপরও দালালের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। দিন দিন দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ভূমি মালিকেরা।

একাধিক সূত্র জানায়, এলএ শাখার নিয়ন্ত্রণ ছিল চেইনম্যান নজরুল ইসলাম ও করিমের হাতে। গত বছরের ৭ নভেম্বর দুদকের হাতে গ্রেপ্তারের পর সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন দালালচক্র। নজরুল ও তার স্ত্রীর পাঁচটি ব্যাংক একাউন্টে কয়েক বছরে ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৩৫ হাজার ৯৭৬ টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছিল দুদক। এখনো জেলে রয়েছে নজরুল। এলএ শাখার এখন করিমের হাতে। চেইনম্যান করিমকে সন্দ্বীপ বদলি করা হলেও নিউ মার্কেটে বসে নিয়ন্ত্রণ করেন এলএ শাখার কমিশন বাণিজ্য। নজরুলের মতো করিমও অঢেল সম্পদের মালিক।

বর্তমানে এলএ শাখাকে ঘিরে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক দালালচক্র রয়েছে। আবদুস সালাম ও তার মেয়ে জামাই আবদুল্লাহ, রফিক, বাঁশখালীর ইদ্রিচ, মানিক ও বাদশার মেম্বারের নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে এলএ শাখায়। এছাড়াও সাংবাদিক পরিচয়ে রয়েছে ডজনখানেক দালাল।

দালালচক্রের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবু হাসান সিদ্দিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘অনেক লোক আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আসেন। আবার অনেকেই আমমোক্তারনামা দিয়ে থাকেন। তখন তদন্ত করে দেখা যায়, অন্য কাহিনী। ক্ষতিগ্রস্তদের বলে দিয়েছি, আমাকে আবেদন দাও, আমি চেক পৌঁছে দেব।’

১৩১ প্রকল্প : গত বছরের আগস্ট মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ১৩১টি প্রকল্প রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, গ্যাসের পাইপ লাইন স্থাপন প্রকল্প, আনোয়ারা অর্থনৈতিক জোন, বন্দর সম্প্রসারণ, নেভাল একাডেমি সম্প্রসারণ, আউটার রিং রোড, সিটি রিং রোড, টানেল, দোহাজারী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ, মডেল মসজিদ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্প নিয়েও কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রেলওয়ের ঘুমধুম প্রকল্প নিয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মো. কায়সার খসরু ও মো. সোহেল রানার বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ রয়েছে।

 

 

 

 

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 298 People

মন্তব্য দিন :

সম্পর্কিত পোস্ট