চট্টগ্রাম বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

সর্বশেষ:

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

নাগরিক সুবিধার বদলে পদে পদে ভোগান্তি

শহরের মাঝে গ্রামীণ আবহ

নাগরিক সুযোগ সুবিধার কারণেই গ্রাম থেকে মানুষ শহরমুখী হয়। তাদের চোখে মুখে ভর করে আধুনিক জীবন-যাপনের হাতছানি। চট্টগ্রাম শহরের ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডের অবস্থান শহরে হলেও বিদ্রুপ করে অনেকে বলেন পূর্ব বাকলিয়া হচ্ছে শহুরে গ্রাম। অনুন্নত ও সরু রাস্তাঘাট, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর জায়গায় জায়গায় ময়লার স্তূপসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই ওয়ার্ড। এই সমস্যার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভূমিদস্যুদের উপদ্রব।

কালা মিয়া বাজার থেকে আব্দুল লতিফ হাট সড়কটি পরিচিত মিয়া খান রোড নামে। সরু রাস্তায় ফুটপাত না থাকায় পথচারীদের হাঁটতে হয় রাস্তার উপর দিয়ে। তবে এই সরু রাস্তার ওপর টমটম স্ট্যান্ড, ভ্রাম্যমাণ দোকান ও অস্থায়ী বাজার বসার কারণে রাস্তাটির হয়েছে বেহাল দশা। আর এর কারণে রাস্তাটিতে প্রায় সবসময়ই লেগে থাকে যানজট। এলাকাবাসীর এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে সরেজমিন পরিদর্শনে।
শুধু তাই নয় কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে কাক্সিক্ষত ও প্রাপ্য সেবাটুকু পেতে স্থানীয়রা চরকির মত ঘুরপাক খাচ্ছেন কার্যালয়ের সামনে। কিন্তু তবুও সেবা পাচ্ছেন না বলে পূর্বকোণকে নিজেদের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।

আবুল হাসেম অত্র ওয়ার্ডেরই একজন বাসিন্দা। তার নিজের না পাওয়ার গল্পের কাছে ওয়ার্ডের অন্যান্য সমস্যাগুলোকে নিতান্তই তুচ্ছ মনে করেন তিনি। পূর্বকোণকে জানিয়েছেন তার ভোগান্তির কথা। তিনি বলেন, দীর্ঘ ২ বছর ধরে এই ওয়ার্ডের কার্যালয়ে আসছি বয়স্কভাতার জন্য। বয়স্কভাতা পাবো পাবো করে ২ বছর তো পার করলাম। আর কতদিন ওয়ার্ড কার্যালয়ে হাজিরা দিতে হবে তা ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে তিনি চান ভবিষ্যৎ কাউন্সিলর যেই আসবেন তিনি যাতে এই ভোগান্তির অবসান ঘটান। কথা হয়েছিল একই ওয়ার্ডের আরেজন ভুক্তভোগী মোছা. জুলাহার সাথে। তার অভিযোগের পুরোটাই ওয়ার্ড কার্যালয়ে শিকার হওয়া ভোগান্তিকে নিয়ে। তিনি বলেন, আমি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই ওয়ার্ড কার্যালয়ে আসছি। আমার প্রাপ্য অন্যান্য সুবিধার কথা বাদই দিলাম, আমার বসতভিটা জোর করে কেড়ে নিয়েছে এই এলাকার ভূমিদস্যুরা। এই সমস্যার সমাধান চাইতে যতবারই কাউন্সিলরের কাছে এসেছি, আমাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এই রকম অবস্থা হলে আমাদের মত অসহায় লোকেরা যাবে কোথায়। তবে এই বিষয়ে ভবিষ্যৎ কাউন্সিলরের হস্তক্ষেপ চান তিনি।
এসব সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন এই ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. হারুনুর রশিদ। সরু রাস্তায় অবৈধ টমটম স্ট্যান্ডসহ স্থানীয়দের বয়স্ক ভাতা না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ৫ বছরে ৬৩ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার বরাদ্দ পেয়েছি। যার মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে ৪৩ কোটি ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাজ। বাকি কাজগুলো চলমান রয়েছে। আর এই বরাদ্দে ৫২টি প্রকল্পের মধ্যে কয়েকটি ড্রেন নির্মাণ এবং প্রায় ৬৫টি রাস্তার নির্মাণ ও সংস্কার কাজ হয়েছে বলে জানান তিনি।

বয়স্কভাতা দেয়া নিয়ে গাফিলতি ও ভূমিদস্যুদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বয়স্কভাতার বিষয়টি পরিচালিত হয় প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী। ৬৫ বছরের আগে কেউ বয়স্ক ভাতা পাবে না এটা সরকারি নিয়ম, এখন কেউ যদি ৬৪ বছর বয়সে আমাদের কাছে বয়স্ক ভাতা দাবি করেন সেই দাবি মেটানো তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমি আপনাদের অনুরোধ করবো এই বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে। আর ভূমিদস্যুদের হয়রানির অভিযোগ যে মহিলা করেছেন তিনি তার ভাইয়ের কাছে নিজ জমি আট বছর আগে বিক্রি করেছিলেন। আর এখন যদি সেই বিক্রি করা জমির মালিকানা তিনি দাবি করেন তাহলে আমাদের কি বা করার থাকে?

জরাজীর্ণ কাউন্সিলর কার্যালয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই ওয়ার্ডটি খুবই অনুন্নত। তার মধ্যে আমাদের এই কাউন্সিলর কার্যালয়ের জায়গার মালিকানা নিয়ে এখনও প্রশ্ন উঠেছে। আমি মেয়র মহোদয়ের সাথেও এই বিষয়ে কথা বলেছি। বর্তমান কার্যালয় পুর্ননির্মাণ করে এর সাথে আরবান প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র করার পরিকল্পনা আমার আছে। এবার নির্বাচনে জয়যুক্ত হলে আমার প্রথম কাজ হবে একটি আধুনিক কাউন্সিলর কার্যালয় নির্মাণ করা।’
বর্তমান কাউন্সিলর মো. হারুনুর রশিদের মত আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বাকলিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. ইছহাক, ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. কামরুল হাসান, বাকলিয়া থানা আওয়ামীলীগের সদস্য মো. সোলায়মান, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মো. সেকেন্দার আলম বাদশা।
অন্যদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তৈয়ব ও ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দীন।

সম্ভাব্য প্রার্থীরা কে, কি বললেন
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তৈয়ব নাগরিকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডের হাফেজ নগর ও তক্তার পুল এলাকা থেকে মাদক-সন্ত্রাস নির্মূল, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি বন্ধে কাজ করার আশা ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া নির্বাচিত হলে অত্র ওয়ার্ডে একটি ক্রীড়া একাডেমি নির্মাণ করার বিষয়েও জানিয়েছেন পূর্বকোণকে।

ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দীন নির্বাচনে জয়লাভ করলে এলাকার সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি দুটি বিষয়কে প্রধান্য দেয়ার কথা জানিয়েছেন। যেগুলো হলো- সম্পূর্ণ ওয়ার্ড থেকে মাদক চিরতরে নির্মূল ও ভূমিদস্যুদের উৎখাতে কাজ করা।
বাকলিয়া থানা আওয়ামীলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. ইছহাক নির্বাচিত হলে মাদক-সন্ত্রাস ও ভূমিদস্যুদের দমন, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান, ওয়ারিশ ও জাতীয় সনদপত্র সহজ প্রাপ্যতার বিষয়ে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি তার ইচ্ছা আছে নিজ উদ্যোগে এলাকায় মহিলা কলেজ নির্মাণ এবং সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে বলির হাটে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করার। যাতে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা করতে পারে।
ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মো. সেকেন্দার আলম বাদশা নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতি এলাকা থেকে নির্মূল, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান, শিক্ষার মানোন্নয়ন, চাঁদাবাজি বন্ধ করার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রসারে নিজ উদ্যোগে খেলার মাঠ নির্মাণের আশার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. কামরুল হাসান নির্বাচিত হলে এলাকা থেকে মাদক, জুয়া ও ভূমিদস্যু দমনে কাজ করার কথা জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি বেকারত্ব হ্রাস করতে নিজ উদ্যোগে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, শিক্ষার মানোন্নয়নে কলেজ নির্মাণ, বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করার কথাও জানান তিনি। এছাড়া পূর্ব বাকলিয়াকে মডেল ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করতে এলাকার সকল উন্নয়নমূলক কর্মকা- দুর্নীতিমুক্তভাবে করার আশাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বাকলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সদস্য মো. সোলায়মান নির্বাচনে জয়লাভ করলে এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন।

The Post Viewed By: 117 People

সম্পর্কিত পোস্ট