চট্টগ্রাম বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

সর্বশেষ:

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ

ডেইজী মউদুদ

বসন্ত বাতাসে ওড়ে ভালোবাসার আঁচল

সিআরবির শিরীষতলায় গত ক’দিন ধরে অবিরাম কুহু কুহু রবে ডেকে যাচ্ছিল দুষ্টু কোকিলটি। কত আগে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসে যেদিন রোহিনী -বারুণী পুষ্করিণীতে কলসী কাঁখে জল আনতে যাচ্ছিল সেদিন এমনই একটি কোকিল একই কুহু কুহু সুরে ডেকেছিল । এই ডাকে রোহিনীর চিত্তে তখন বেজে উঠেছিল গোবিন্দলালের প্রণয়বীণা। বঙ্কিমের ভাষায় ‘ মুর্খ পাখি আবার ডাকিল ‘কুহু ! কুহু ! কুহু! রোহিনী চাহিয়া দেখিল -সুনীল, নির্ম্মল অনন্ত গগন- নিঃশব্দ, অথচ সেই কুহু রবের সঙ্গে সুর বাঁধা। দেখিল -নব প্রস্ফুটিত আ¤্রমুকুল -কাঞ্চন গৌর, স্তরে স্তরে শ্যামলপত্রে বিমিশ্রিত, শীতল সুগন্ধপরিপূর্ণ, কেবল মধূমক্ষিকা বা ভ্রমরের গুণগুণে শব্দিত, অথচ সেই কুহুরবের সঙ্গে সুর বাঁধা’। বসন্তের আগমনে কোকিলের কুহু রবে মানবমনে ভালোবাসার সঞ্চার সাহিত্যে অভিষিক্ত হয়ে এসেছে আদিকাল থেকে।

আজ পহেলা ফাল্গন, বসন্তের প্রথম দিন । এবারের বসন্তে বাড়তি পাওনা ভালোবাসা দিবস। বসন্তকালের এবার প্রথমদিনের সূর্য উদিত হবে ভালোবাসার বর্ণিল উৎসবে। বসন্তের রঙিন ফানুসগুলো আজ ভালোবাসার বার্তা নিয়ে জ¦লজ¦ল করে উড়বে আকাশে, বাতাসে ছড়াবে সেই মোহন বাঁশীর মূর্চ্ছণা। একই দিনে আজ দুটি বিশেষ দিন বসন্ত আবাহন আবার বিশ^ ভালোবাসা দিবস। তাই আজ প্রকৃতিতে বসন্ত আসবে ভালোবাসার আঁচল উড়িয়ে।
বসন্ত প্রকৃতিতে এখন বইছে দখিনা হাওয়া. দূর নির্জন থেকে কোকিলের তান ভেসে আসছে, এক কথায় প্রকৃতি আজ দখিনা দুয়ার খুলে দিয়েছে। সে দুয়ারে বইছে ফাগুনের হাওয়া। কবির কথায় ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক ,আজ বসন্ত। ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির আজ এতো বর্ণিল সাজ। সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে, বিভেদ ভুলে, নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে প্রকৃতিতে বসন্ত আসে। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালির মনেও লাগবে দোলা। হৃদয় হবে উচাটন। পাতার আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকা কোকিলের মধুর কুহু কুহু ডাক শুনে কবি মন অজান্তেই গেয়ে উঠবেঃ
‘ ও মঞ্জরী ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’
বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে হাঁটা। মিলনের এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, মানুষকে করে আনমনা।

বসন্তের এই আনন্দযজ্ঞ থেকে বাদ যায় না গ্রাম্যজীবনও। বাংলার গ্রামীণ জনপদেও আজ ঝিরিঝিরি বাতাসে ধরা দেবে বসন্ত। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে গ্রামে বসন্তের আমেজ একটু বেশিই ধরা পড়ে। বসন্তকে তারা আরও নিবিড়ভাবে বরণ করে। তারাও আনমনে গেয়ে উঠে‘ ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল, লাগলো যে দোল। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের এ উৎসব এখন গোটা বাঙালির কাছে ব্যাপক সমাদৃত । বাংলায় বসন্ত উৎসব প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা অনেকের অজানা।
মোগল স¤্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব।

ফাল্গ–নের আরেক পরিচয় ভাষা শহীদদের মাস অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, ৮ই ফাল্গ–ন মাতৃভাষা ‘বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য রফিক, সালাম, জব্বার বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। বারবার ফিরে আসে ফাল্গুন, বারবার ফিরে আসে বসন্ত আমাদের জীবনে শোষণ, বঞ্চনা আর আধিপত্য মোকাবিলার দুর্বিনীত সাহস ও অপরিমেয় শক্তি নিয়ে। তাই যেকোনো বিচারে এ এক অনন্য মাস, ঋতু নৈসর্গিক ক্যানভাসে রক্তাক্ত বর্ণমালা যেন এঁকে দেয় অনির্বচনীয় সুন্দর এক আল্পনা। বসন্তের আগমনী গানে পুরো বাংলাদেশ যেন আটপৌরের আগল ভেঙে বসন্তের আহ্বানে জেগে ওঠে। তরুণীদের পরনে শোভা পায় বাসন্তী রঙের শাড়ি, খোঁপায় বাসন্তী ফুল। গালে বসন্তের মনকাড়া আল্পনা। তরুণদের বসনেও থাকে বাসন্তী ছোঁয়া। বাদ যায় না শিশু কিংবা বয়স্করাও। সবার মন তাই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে ‘বসন্ত ফুল গাঁথলো , আমার জয়ের মালা , বইলো প্রাণে দখিন হাওয়া, আগুল জ¦ালা . .. ’
আজ দিনভর চলবে বসন্তের উচ্ছ্বাস। ফোন, ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলবে বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময়। আজ নানা আয়োজনে বসন্তকে বরণ করবে বাঙালি। গুণ গুণ করে গান করতে তরুণ তরুণীর দল ছুটবে সিআরবির শিরীষ তলায় অথবা ডিসি হিলে। তারা বসন্তের গান শুনবে, কবিতা পাঠ করবে। পাহাড়ের খাঁজ ভেঙ্গে হয়তো কোন এক শিমুল গাছে একটি কোকিল কুহু কুহু রবে ডানা ঝাপটাবে, তার ডানার ছোঁয়ায় এক থোকা শিমুলগুচ্ছ তরুণীর হাতের মুঠায় পড়বে। মনের অজান্তেই তারা গেয়ে উঠবে ‘আহা , আজি এ বসন্তে/ এত ফুল ফুটে / এত বাঁশী বাজে/ এত পাখি গায় ……’

The Post Viewed By: 60 People

সম্পর্কিত পোস্ট