চট্টগ্রাম সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

২৬ জানুয়ারী, ২০২০ | ৩:৪২ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চ্যালেঞ্জের মুখে স্মার্ট সিটির স্বপ্ন

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, চট্টগ্রামের গুরুত্ব আগেও ছিল এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু প্রতিযোগিতায় যদি টিকে থাকতে হয় তাহলে চট্টগ্রাম সিটিকে তার নিজ গুরুত্ব আরো বাড়াতে হবে। পোর্ট কানেকটিং রোড চার বছরেও শেষ হয়নি। সে ব্যাপারে আমিও উদ্বিগ্ন। আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করতে পারি কিন্তু সমাধান দিতে পারি না। কারণ আমাদের সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান নেই। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী সব সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করে একত্রে কাজ করা প্রয়োজন। এক সংস্থাকে পেছনে ফেলে অন্য সংস্থা স্মার্ট হতে পারে না।

গতকাল (শনিবার) সকালে নগরীর আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বঙ্গবন্ধু কনফারেন্স হলে চট্টগ্রাম চেম্বার আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি চট্টগ্রাম’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরো বলেন, কথায় কথায় আমাদের খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে কথা উঠে। সেবা সংস্থাগুলোকে তো তাদের কাজ করতে হবে। কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। সমস্যা হওয়ার মূল কারণ হলো মাস্টার প্ল্যান নেই। আর বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি ও জাইকা যে সময় প্রকল্পের অর্থ দেয় সেই সময় কাজ শুরু করতে হয়। অন্য প্রকল্পের জন্য অপেক্ষা করলে একটি কাজও সময়মতো শেষ করা যাবে না।

চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলমের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও সংসদ সদস্য এম এ লতিফ। বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ, মিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মিয়া মোহাম্মদ আবদুর রহিম, চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি এডভোকেট শেখ ইফতিখার সায়মুল চৌধুরী, চুয়েটের ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম, এফবিসিসিআই ও চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ, ব্যবসায়ী ও চেম্বার পরিচালক এ কিউ চৌধুরী, বিএসআরএম’র পিআর এন্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা রুহি মুর্শেদ আহমেদ এবং চেম্বারের পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ তানভির প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার আলী আশরাফ। তিনি মূল প্রবন্ধে জানান, স্মার্টসিটি বিনির্মাণে কতগুলো নির্দেশক রয়েছে। স্মার্ট জনগণ ও তাদের স্মার্ট জীবনধারণ পদ্ধতি, স্মার্ট ইকোনোমি, স্মার্ট গভর্নেন্স, স্মার্ট পরিবেশ, স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থা এসব নির্দেশকের অন্যতম। এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের বাজেটের আকার এবং বৈদেশিক রেমিটেন্স ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও দক্ষ পেশাজীবী যেমন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার তেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এ হার মাত্র ২ শতাংশ। এ হার আরো বাড়াতে হবে। অদক্ষ শতকরা ৫১ ভাগ জনশক্তিকেও দক্ষ করে তোলতে হবে। স্মার্টসিটি ও ডিজিটাল সোসাইটি ডিজিটাল বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
প্রকল্পের কাজ প্রসঙ্গে মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, সমস্যা হলো প্রকল্পের আগে ভালভাবে স্টাডি করা হয় না। এটি প্রকল্প শেষ হলে এর পারফরমেন্স কেমন হবে সে ব্যাপারে আগে না জেনেই প্রকল্প নিয়ে আসে। আর সেটি অনুমোদন হয়ে গেলে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা দেখা যায়।
তিনি আরো বলেন, ‘আইনগতভাবে দায়িত্ব দেওয়া না হলেও জনপ্রতিনিধিরা এর দায় এড়াতে পারে না। উন্নয়ন কর্মকা-ের তদারকি তাদের জনস্বার্থেই করতে হবে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে জনপ্রতিনিধিদের সবসময় পাশে দাঁড়াতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। গোটা জাতির জন্য ভিশন ২০২১ ও ডেল্টা প্লানসহ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে সরকার জাতিকে অবশ্যই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দেবে’।
শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, এলোমেলো কাজ করলে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বে। তাই সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিকল্প নেই।
সংসদ সদস্য এম এ লতিফ বলেন, দুঃজনক হলেও সত্য চট্টগ্রাম শহরের যে তিনজন সংসদ সদস্য আছেন তাদের সাথে কোন সেবা সংস্থা চট্টগ্রামের উন্নয়ন কাজের ব্যাপারে আলোচনায় বসেননি। এছাড়া নগরবাসীর সাথে বৈঠক হয়েছে এমন নজিরও নেই। তারা তাদের নিজ গতিতে ইচ্ছেমত কাজ করবেন, আর সেভাবে আমাদেরও চলতে হবে। যাদের ট্যাক্স দিয়ে এই শহর স্মার্টসিটিতে রূপ নেবে তাদের সাথেও আলোচনা করতে সেবা সংস্থাগুলো নারাজ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও জনগণের মুখোমুখি না হওয়ার কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না।

আলোচনায় এফবিসিসিআই ও চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘দশ বছর আগেও আমরা চট্টগ্রামবাসী একটা বাস চাইতাম সরকারে কাছে। আর এখন বাজেটের এক তৃতীয়াংশ চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এতোদিনেও আমরা পোর্ট কানেক্টিং রোডটি ঠিক করতে পারিনি। বন্দর চেয়ারম্যান মাতারবাড়ি করেন, বে-টার্মিনাল করেন কিন্তু তিন বছরেও পোর্ট কানেকটিং রোড সংস্কার করতে পারেন নি। আমরা আসলে ঘুমিয়ে আছি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ বলেন, ‘১শ ৬৮বর্গ কিলোমিটারের শহরে ৬০ লাখ মানুষের জন্য আগে শহরটাকে বাসযোগ্য করতে হবে। রাস্তার মাঝখানে বাস দাঁড়ানো কোন রকেট সায়েন্স নয়। সড়কের সিগনাল বাতি অকেজো ফেলে রাখা রকেট সায়েন্স নয়। ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হলো রকেট সায়েন্স। আমাদের আগে এগুলো ভাবতে হবে।

বৈঠকে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এই নগরীতে একটি স্মার্ট গণপরিবহন নেই। শহরের মধ্যে ফ্লাইওভারের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে। এই শহরের মত আহাম্মক শহর পুরো বাংলাদেশে নেই। চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারের বন্যায় ভাসিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে হত্যা করা হয়েছে। নগরবাসী জানে চট্টগ্রাম হলো খালের শহর। সেই জলের ধারা গণপরিবহনের একটা পথ হতে পারতো। স্মার্টসিটির গল্প বলে ফ্লাইওভারে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে’।

তিনি আরো বলেন, অনেক প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে কিন্তু একটা প্রকল্পও স্মার্ট প্রকল্প নয়। কোন প্রকল্প ডিজিটাল তথ্য নির্ভরতায় তার অগ্রগতি জনবান্ধব কিনা, জনসম্পৃক্ত কিনা সেটি দেখা হয়েছে! বলা হয় উন্নয়নের এক তৃতীয়াংশ বরাদ্দ চট্টগ্রামের জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীদের ট্রাক যদি মালামাল নিয়ে বন্দর থেকে রাস্তা দিয়ে যেতেই না পারে তাহলে ওই বন্দর আমার না। আমারা জনগণকে সম্পৃক্ততায় না এনে প্রকল্পের পর প্রকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এভাবে কাজ করলে অনেক ব্রিফকেস নির্ভর প্রকল্প হবে ঠিক। কিন্তু তাতে জনগণ স্মার্ট হবে না। রাস্তা পরিচালনা স্মার্ট হবে না, গভর্মেন্ট ও দেশ স্মার্ট হবে না।

চুয়েট ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন, ‘স্মার্টসিটি বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটি হলো আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণের জন্য কোয়ালিটিফুল লাইফ নিশ্চিত করা। এজন্য শুধু স্মার্টসিটির মধ্যে সীমাবন্ধ না থেকে সারা দেশের কথা ভাবতে হবে। গ্রামের মানুষ এখনো শহরমুখী হচ্ছে। তাই গ্রামীণ উন্নয়নের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। একটা সময় আমরা কৃষি নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু দিন দিন আমরা কৃষি থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি।

The Post Viewed By: 170 People

সম্পর্কিত পোস্ট